Published : 17 Nov 2025, 12:45 PM
দ্বিতীয়বারের মতো সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছেছে জেফ বেজোসের মহাকাশ কোম্পানি ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেট। দ্বিতীয়বারের এ উৎক্ষেপণ প্রথমটির মতো আলোড়ন তৈরি না করলেও মিশনটি বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবারের এ মিশনে নিউ গ্লেন রকেটে করে ‘এসকেপেড’ নামের এক জোড়া মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, যেগুলো মঙ্গলের কক্ষপথে গিয়ে গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র ও বায়ুমণ্ডল গবেষণা করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে কনভারসেশন।
এ জোড়া মহাকাশযান প্রথমে যাবে কক্ষপথের ‘ল্যাগ্রেঞ্জ’ বিন্দুতে, যেখানে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য– এই তিনের মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ ভারসাম্য বজায় থাকে। মঙ্গল ভ্রমণের জন্য উপযোগী অবস্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত সেখানেই কিছুদিন অবস্থান করবে ‘এসকেপেড’।
ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেটের প্রথম ধাপের যে বড় বুস্টার অংশটি রয়েছে তা সাধারণত উৎক্ষেপণের পর সমুদ্রে পড়ে নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু এবার সেই বুস্টারটি নিজে থেকেই নিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীতে ফিরে এসে সমুদ্রে থাকা এক ভাসমান প্ল্যাটফর্ম বা বার্জে নিরাপদে নেমেছে। ফলে বুস্টারটি এখন আবার ব্যবহার করা যাবে। এতে রকেট বানানোর খরচ কমেছে।
এ উৎক্ষেপণকে বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্পের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন অনেকেই। এ ধরনের উৎক্ষেপণ ও পুনরায় ব্যবহারের পথিকৃৎ কেবলমাত্র স্পেসএক্স হলেও এ রকেট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নিউ গ্লেনের সক্ষমতাও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
স্পেসএক্সের সঙ্গে ব্লু অরিজিনের পার্থক্য
অনেকের ধারণা, নিউ গ্লেন দিয়ে ব্লু অরিজিন যেন স্পেসএক্সের পথই অনুসরণ করছে। তবে বাস্তবে এই দুই কোম্পানি ও তাদের রকেটের মধ্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
বর্তমানে আধুনিক উৎক্ষেপণে বেশিরভাগ রকেটই কয়েকটি অংশ নিয়ে তৈরি। প্রথম ধাপ বা ফার্স্ট স্টেজ রকেটকে মহাকাশের দিকে নিয়ে যায় এবং রকেটের জ্বালানি শেষ হলে তা আলাদা হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ধাপ বা সেকেন্ড স্টেজের কাজ শুরু হয়। এ সময় পেলোড বা মহাকাশযানটিকে সম্পূর্ণভাবে কক্ষপথে পৌঁছে দেয়।
বর্তমানে নিউ গ্লেন ও স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন হেভি’ এ দুটিই আংশিকভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য। তবে নিউ গ্লেন আকারে বড়, শক্তিশালী ও কক্ষপথে আরও বেশি পরিমাণ পেলোড বহন করতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের মিশনের জন্য, বিশেষ করে নাসা, মার্কিন ই কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন ও অন্যান্য গ্রাহকদের জন্য ‘নিউ গ্লেন’কে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ব্লু অরিজিন। এসব মিশনে অন্তর্ভুক্ত থাকবে পৃথিবীর কক্ষপথ অভিযান ও ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষ পাঠানোর মতো মিশন, যা ব্লু অরিজিনের নিজস্ব লুনার ও মহাকাশ গবেষণার লক্ষ্যসমূহের পাশাপাশি নাসার বিভিন্ন লক্ষ্যকেও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
নাসার আর্টেমিস প্রোগ্রাম, যেখানে চাঁদে আবার মানুষকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে সংস্থাটি, সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে নিউ গ্লেন।

নিউ গ্লেন রকেটের তাৎপর্য
নিউ গ্লেনের বুস্টার অবতরণ এই সর্বশেষ উৎক্ষেপণকে কোম্পানির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। স্পেসএক্সের প্রথম বুস্টারটি অবতরণ করতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা চালাতে হয়েছিল ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানিটিকে। তবে কেবল দ্বিতীয় চেষ্টায় সফল হয়েছে ব্লু অরিজিন।
এসব বুস্টারকে অবতরণ করানো ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলার বিষয়টি মহাকাশে পৌঁছাতে খরচ কমানোর মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করছে, যা স্পেসএক্সের পাশাপাশি ‘রকেট ল্যাব’-এর মতো অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
নিজেদের সাবঅরবিটাল রকেট ‘নিউ শেফার্ড’-এর আগের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয়বারের মতো এই রকেট উৎক্ষেপণে সফলতা পেয়েছে ব্লু অরিজিন।
২০১৫ সাল থেকে টেক্সাসে উৎক্ষেপিত ‘নিউ শেফার্ড’ রকেট মানুষ ও পণ্যকে মহাকাশের প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। এরপর নিজস্ব শক্তি ব্যবহার করে আবার উৎক্ষেপণ স্থলেই ফিরে এসেছে রকেটটি।
নিউ গ্লেন কেবল ব্লু অরিজিনের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর বাণিজ্যিক মহাকাশ শিল্প ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটের জন্য বাস্তব প্রতিযোগী হিসেবে কাজ করছে নিউ গ্লেন।
রকেটটি নাসা, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য আরও বেশি উৎক্ষেপণ বিকল্প দিয়েছে। ফলে স্পেসএক্স বা অন্য কোনো একক কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমে আসবে।
তবে স্পেসএক্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে নিজেদের উৎক্ষেপণের সংখ্যা বাড়াতে ও দুটি উৎক্ষেপণের মধ্যে সময় কমিয়ে আনতে হবে ব্লু অরিজিনকে। কারণ, ২০২৫ সালেই ১৬৫ থেকে ১৭০টি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে স্পেসএক্সের। তবে এত দ্রুত সময়ে উৎক্ষেপণ করতে না-ও পারে ব্লু অরিজিন।