Published : 15 Jun 2026, 07:24 PM
চ্যাটবট বা কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়, এবার জেট ইঞ্জিন ও রোবটের মতো জটিল ফিজিক্যাল পণ্যের নকশা তৈরিতে আসছে এআই। চ্যাটবটের দুনিয়া ছাড়িয়ে বাস্তব জগতের জটিল প্রকৌশলকে সহজ করতে বাজারে নতুন এআই স্টার্টআপ নিয়ে এসেছেন জেফ বেজোস।
অ্যামাজনের সহপ্রতিষ্ঠাতা বেজোস ও গুগলের সাবেক নির্বাহী ভিক বাজাজের নেতৃত্বাধীন ইন্ডাস্ট্রিয়াল এআই স্টার্টআপ ‘প্রমিথিউস’ তাদের সিরিজ বি ফান্ডিং রাউন্ডে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে।
এ নতুন বিনিয়োগের পর স্টার্টআপটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলারে। জে পি মরগান চেজ, গোল্ডম্যান স্যাকস, ব্ল্যাকরক, ডিএসটি গ্লোবাল, আর্চ ভেঞ্চার পার্টনার্স ও বেজোসের মতো বড় বিনিয়োগকারীরা এ নতুন অর্থায়নে অংশ নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
স্টার্টআপটি বলেছে, তারা এমন এক সিস্টেম তৈরি করছে, যেটিকে তাদের ভাষায় ‘আর্টিফিসিয়াল জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার’ নামে ডাকা হচ্ছে। এর মূল কাজ জেট ইঞ্জিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রোবট ও কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সের মতো জটিল সব ভৌত কাঠামোর নকশা তৈরির প্রক্রিয়াটিকে স্বয়ংক্রিয় ও দ্রুত করা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এক্সিওসকে বেজোস বলেছেন, “একটি স্বপ্ন থেকে শুরু করে তা উৎপাদনের ধাপে নিয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার এ পুরো চক্রটি অনেক দীর্ঘ হতে পারে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি আধুনিক জেট ইঞ্জিনের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়ার কারণে প্রচলিত ইঞ্জিনের কার্যসক্ষমতা কেবল ১০ শতাংশ উন্নত করতেই প্রায় এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।
প্রমিথিউস দাবি করছে, তাদের তৈরি প্রযুক্তি এ দীর্ঘ প্রক্রিয়াটিকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে এবং কোনো কিছুর ‘কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার’ পুরো চক্রটিকে সম্ভাব্য ১০ গুণ দ্রুততর করে তুলবে।
ভিন্নধর্মী এআই স্টার্টআপ ‘প্রমিথিউস’
চ্যাটবট, কোডিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা কারখানার রোবোটিক্স নিয়ে কাজ করা প্রচলিত বিভিন্ন এআই কোম্পানির চেয়ে ‘প্রমিথিউস’-এর লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। তারা উৎপাদনের আগের ধাপ অর্থাৎ ‘প্রি-প্রডাকশন’ পর্যায়টিকে টার্গেট করছে।
স্টার্টআপটি বলেছে, কোনো পণ্য মূল অ্যাসেম্বলি লাইনে বা চূড়ান্ত উৎপাদনে যাওয়ার আগেই প্রকৌশলীদের সিমুলেশন, প্রোটোটাইপিং, অপটিমাইজেশন ও সিস্টেম ডিজাইনের মতো জটিল কাজগুলোতে সাহায্য করাই এ সফটওয়্যারের মূল উদ্দেশ্য।
বেজোস ও বাজাজ বলেছেন, প্রমিথিউসের লক্ষ্য কারখানার শ্রমিকদের সরিয়ে সেখানে রোবট বসানো নয়, বরং তারা বিষয়টিকে জটিল ভৌত পণ্য নিয়ে কাজ করা প্রকৌশলীদের জন্য শক্তিশালী এক ‘টুলসেট’ বা সহায়তাকারী মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের এ প্রযুক্তি পরবর্তীতে উন্নত রোবট ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার নকশা তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।
ভিক বাজাজ বলেছেন, “বাস্তব জগতে আমাদের নতুন কিছু তৈরির গতি এখন মানুষের কল্পনাশক্তির গতির ধারেকাছেও নেই। আমরা যদি এসব আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ করে তুলতে পারি তবে পৃথিবীতে আবিষ্কারের পরিধি আরও বাড়বে এবং এর সঙ্গে আরও বহু মানুষ যোগ হতে পারবেন।”
স্টার্টআপটিতে বর্তমানে স্যান ফ্রান্সিসকো, লন্ডন ও জুরিখের বিভিন্ন অফিস মিলিয়ে প্রায় দেড়শ জন কর্মী কাজে রয়েছেন।
প্রমিথিউস নিয়ে কম তথ্যই প্রকাশ পেয়েছে
প্রমিথিউস তাদের সিস্টেমটি কীভাবে প্রশিক্ষিত করছে ও তাদের প্রথম বাণিজ্যিক পণ্যগুলো দেখতে কেমন হবে সে বিষয়ে এখনও বেশ গোপনীয়তা ধরে রেখেছে।
স্টার্টআপটির কর্মীরা স্বীকার করেছেন, উৎপাদন ও প্রকৌশলবিদ্যার জ্ঞানের জন্য ইন্টারনেটে সহজলভ্য কোনো ‘ইন্টারনেট-স্কেল’ ডেটাসেট নেই। ফলে সাধারণ টেক্সটের ওপর ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম ট্রেনিং দেওয়ার চেয়ে এ সমস্যাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জটিল।
স্টার্টআপটি বেজোসের অন্যান্য কোম্পানি অ্যামাজন বা ব্লু অরিজিনেরর সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেছে। তবে বেজোস ব্লু অরিজিনকে এ প্রযুক্তির সম্ভাব্য গ্রাহক ও ‘কেইস স্টাডি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে, বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ফিজিকাল বা ভৌত জগতের এআই পরবর্তী অন্যতম বড় বিষয় হতে যাচ্ছে। কেবল সফটওয়্যারভিত্তিক এআই পণ্যের তুলনায় যেসব সিস্টেম ম্যানুফ্যাকচারিং, অ্যারোস্পেস, হেলথকেয়ার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনের মতো খাতের সঙ্গে জড়িয়ে সেগুলো বাস্তব জগতের অবকাঠামো এবং অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিযোগিতায় বেশি সুরক্ষিত ও সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
এ নতুন তহবিল সংগ্রহের আগে স্টার্টআপটি ৬২০ কোটি ডলারের এক সিরিজ এ রাউন্ড সম্পন্ন করেছিল। যার ফলে দুই বছরেরও কম সময়ে প্রমিথিউসের মোট ঘোষিত তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি, যা প্রমিথিউসকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থায়ন পাওয়া এআই স্টার্টআপে পরিণত করেছে।
তবে প্রযুক্তিটি ঠিক কখন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাবে, বাস্তব প্রকৌশল পরিবেশে তা কতটা নিখুঁতভাবে কাজ করবে এবং সুরক্ষার দিক থেকে সংবেদনশীল ডিজাইনের কাজগুলোতে বিভিন্ন কোম্পানি এ এআই সিস্টেমের ওপর কতটা ভরসা করতে পারবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।