Published : 11 Oct 2025, 10:36 AM
প্রথমবারের মতো বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি বাজারে আনতে চলেছে ফেরারি। দারুণ গতি, জোরালো শব্দ, আর খ্যাতনামা ডিজাইনার জনি আইভের ডিজাইনে আগামী বছর ইভি বাজারে আনছে ইতালীয় স্পোর্টস কার নির্মাতা কোম্পানিটি।
গাড়ির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের শব্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু গাড়ি ভালো লাগার কারণ, সেগুলোর বিশেষ ধরনের আওয়াজ, আবার কিছু গাড়ির ক্ষেত্রে ভালো লাগার কারণ হচ্ছে আওয়াজ কম থাকা। তবে খুব অল্প কিছু গাড়িই রয়েছে, যেগুলোকে দুই দিক থেকেই ভালো বলা যায়, এমন মূল্যায়ন উঠে এসেছে ফেরারির নতুন গাড়ি নিয়ে প্রযুক্তি সাইট এনগ্যাজেটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
এখন পর্যন্ত মূলত হুন্দাইয়ের ‘আয়োনিক ৫ এন’ই একমাত্র গাড়ি, যা এই দুই মানদণ্ডেই সফল হয়েছে। তবে ফেরারি যেহেতু নিজেদের প্রথম ইভি বাজারে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফলে খুব শিগগিরই আমাদের আরেকটি এমন গাড়ি দেখতে পারার সুযোগ মিলতে পারে, উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।
ইতালির মারানেলোতে কোম্পানিটির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক ইভেন্টে নিজেদের প্রথম ‘ইলেট্রিকা’ নামের ইভি সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে ফেরারি। আগামী বছর পুরোপুরিভাবে গাড়িটি উন্মোচন করবে কোম্পানিটি।
শক্তি বা পাওয়ার সবসময়ই ফেরারির অন্যতম প্রধান পরিচয়, আর ‘ইলেট্রিকা’ সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাড়িটিতে থাকবে প্রতিটি চাকার জন্য একটি করে চারটি বিদ্যুচ্চালিত মোটর, যেগুলো মিলে তৈরি করবে এক হাজার হর্সপাওয়ারেরও বেশি শক্তি।
এ পরিমাণ শক্তি ফেরারির নতুন ‘এফ৮০ ’ সুপারকারের কাছাকাছি হলেও বর্তমান সময়ে যেখানে কিছু ইভি দুই হাজার হর্সপাওয়ার পর্যন্ত শক্তি দিতে পারে সেখানে ইলেট্রিকা’র সক্ষমতাকে বড় মুখ করে বলার মতো কিছু বলা যাচ্ছে না।
এ কথা স্বীকার করে ফেরারির প্রধান পণ্য উন্নয়ন কর্মকর্তা জিয়ানমারিয়া ফুলজেনজি বলেছেন, “বিদ্যুচ্চালিত মোটরে শক্তি তৈরি করা খুবই সহজ, বিষয়টি তেমন কঠিন কিছু নয়।”
তার মতে, আসল বিষয় হচ্ছে মোড় ঘুরতে পারা ও সে সময় গাড়ির নিয়ন্ত্রণসক্ষমতা। বর্তমানে বাজারে থাকা বিভিন্ন উচ্চসক্ষমতার ইভিরকে ‘হাতির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। মানে হচ্ছে, এগুলো সরল পথে খুব দ্রুত গেলেও চালানোর সময় প্রকৃত আনন্দ বা সক্ষমতার অনুভূতি দিতে পারে না।
এ কারণে আংশিকভাবে ইলেট্রিকা’তে চারটি মোটর ব্যবহার করেছে ফেরারি। ফলে গাড়ির ট্র্যাকশন ও স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিটি চাকার জন্য আলাদাভাবে শক্তি সামঞ্জস্য করবে, যাতে এক বা দুটি মোটরের ওপর নির্ভর করে ডিফারেনশিয়ালের মাধ্যমে চাকা নিয়ন্ত্রণের বদলে গাড়ি চালাতে সর্বোচ্চ গ্রিপ মেলে।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। ইলেট্রিকার আরও এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, পেছনের প্রতিটি চাকা আলাদাভাবে ঘোরাতে পরে এটি। গাড়িটি মোড় নেওয়ার সময় ভেতরের বা বাইরের চাকাটি প্রয়োজন অনুসারে ভিন্নভাবে ঘুরিয়ে ওভারস্টিয়ার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে, এমনকি ওভারস্টিয়ার তৈরিও করতে পারবে, যা চালকদের চালানোর অভিজ্ঞতাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে এনগ্যাজেট।
ইলেট্রিকাতে আরও থাকবে ‘অ্যাকটিভ সাসপেনশন’ সিস্টেম, যা প্রথম দেখা গিয়েছিল ফেরারির ‘পুরোসাংগুয়ে এসইউভি’ এবং এখন ‘এফ৮০’ সুপারকারেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ সাসপেনশন সিস্টেমে প্রচলিত ভালভ ও তেলের বদলে ব্যবহৃত হয়েছে একটি বিদুচ্চালিত মোটর, যা গাড়ির চলাচলের সময় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ বা স্থিতি দেবে। ফলে গাড়ির ড্যাম্পিং বা কম্পন শোষণ সক্ষমতা এবং রাইড হাইট বা গাড়ির উচ্চতা উভয়ই প্রতিটি চাকায় আলাদাভাবে, প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
ফেরারির সিইও বেনেদেত্তো ভিগনা বলেছেন, এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি ইলেট্রিকা হবে এমন এক ইভি, যা রাস্তায় থাকা অন্য কোনো গাড়ি প্রযুক্তির মতো চলবে না।
“আমরা দেখাতে চাই যে, কোনো প্রযুক্তিকে আমরা আমাদের নিজস্ব অনন্য উপায়ে কাজে লাগাতে পারি।”

যেখানে অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়িকে একঘেয়ে বা একইরকম বলে সমালোচনা করেন, সেখানে এমন এক আকর্ষণীয় ও স্বতন্ত্র ইভি তৈরি করা নিঃসন্দেহে এক সাহসী পদক্ষেপ বলে ধারণা অনেকের।
ফেরারির ইভি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে গাড়িটির অনন্য শব্দ বা সাউন্ড। ফেরারির প্রকৌশলীরা জানেন যে, ইলেট্রিকার জন্য কোনো ধরনের শব্দ তৈরি করা দরকার। তবে তা যেন আবার কৃত্রিম না শোনায়।
ফুলজেনজি বলেছেন, “আমরা কোনো বানানো বা কৃত্রিম শব্দ তৈরি করিনি। আমরা চেয়েছি ঠিক সেই আসল শব্দই রাখতে, যা বিদ্যুচ্চালিত মোটর স্বাভাবিকভাবে তৈরি করে।”
এখনও পর্যন্ত গাড়িটির চেহারা প্রকাশ করেনি ফেরারি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইলেট্রিকার ডিজাইন ও গঠন আগের যে কোনো ফেরারির চেয়ে একেবারে আলাদা হবে। কারণ হচ্ছে, প্রথমবারের মতো ‘লাভফ্রম’ নামের ডিজাইন কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছে ফেরারি, যা অ্যাপল থেকে ২০১৯ সালে বিদায় নেওয়ার পর জনি আইভ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের কাছে সাড়ে ছয়শ কোটি ডলারে কোম্পানিটি বিক্রি করেন তিনি।
এনগ্যাজেট লিখেছে, ইলেট্রিকাতে থাকবে চারটি দরজা ও চারটি আসন। এটি দেখতে স্পোর্টস কারের মতো নয়, বরং গ্র্যান্ড টুরার ও এসইউভি-এর মাঝামাাঝ ধরনের গাড়ি হবে। এ গাড়িটিকে একটু বেশি ব্যবহারযোগ্য ও আরামদায়ক হিসেবে ডিজাইন করেছে ফেরারি।
চালকরা চাইলে গাড়িটিতে শান্তিপূর্ণ ভ্রমণ করতে পারবেন, আবার স্টিয়ারিং হুইলের কয়েকটি নব ঘুরিয়ে একটু স্পোর্টস মোডে নিয়ে গেলে তা শক্তিশালী হয়ে উঠবে ও গরম মেজাজে শোরগোল করতে পারবে।
পাঁচশ ৩০ কিলোমিটারের বেশি রেঞ্জের কারণে ইলেট্রিকা ভালো ট্যুরিং গাড়ি হিসেবেও কাজ করবে। গাড়িটি চালিত হবে ১২২ কিলোওয়াট-ঘণ্টার (গ্রস) ব্যাটারি প্যাক থেকে, যা ভাগ করা হয়েছে ১৫টি মডিউলে, প্রতিটি মডিউলে রয়েছে ১৪টি এনএমসি পাউচ সেল।
প্রাথমিকভাবে এসব সেল সরবরাহ করছে ‘এসকে অন’ কোম্পানি। তবে ফেরারি স্পষ্ট করে বলেছে, ওই সরবরাহের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয় তারা এবং অন্য কোথাও থেকেও সেল নিতে পারে কোম্পানিটি।