Published : 15 Nov 2025, 11:37 AM
প্রথমবারের মতো সুপারনোভার একদম শুরুর পর্যায় বা ‘জন্মমুহূর্ত’ দেখেছেন বিজ্ঞানীরা।
তারার বিস্ফোরণকে সুপারনোভা বলা হয়, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে তীব্র ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলোর একটি। আর এ মহাবিপর্যয় বা ভয়ংকর বিস্ফোরণটি ঠিক কীভাবে ঘটে তা এতদিন রহস্যই ছিল।
এবার বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সুপারনোভার একদম শুরুর মুহূর্ত দেখেছেন, যেখানে বিশাল এক তারা জলপাইয়ের মতো আকৃতি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
‘ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি’র চিলিভিত্তিক ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ বা ভিএলটি ব্যবহার করে এই সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এমনটি ঘটেছে আমাদের সূর্যের ভরের প্রায় ১৫ গুণ এক তারায়, যার অবস্থান ‘এনজিসি ৩৬২১’ নামের এক ছায়াপথে।
পৃথিবী থেকে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ আলোকবর্ষ দূরে ‘হাইড্রা’ তারামণ্ডল বরাবর এই ছায়াপথ। আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে, যা প্রায় ৯.৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার।”
এ ধরনের বিস্ফোরণের আকৃতি বোঝা এতদিন খুব কঠিন ছিল। কারণ এসব বিস্ফোরণ খুব দ্রুত ঘটে। ফলে সুপারনোভাটি দেখার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয় বিজ্ঞানীদের।
এ বিস্ফোরণটি ধরা পড়েছে ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল। ওই সময়ই ‘সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি’র জ্যোতির্পদার্থবিদ ই ইয়াং দীর্ঘ ফ্লাইট শেষে সান ফ্রান্সিসকোতে নামছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই সুপারনোভার দিকে ‘ভিএলটি’ টেলিস্কোপ তাক করার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠান তিনি এবং তার সেই অনুরোধ অনুমোদিত হয়।
এভাবে প্রথম শনাক্ত হওয়ার কেবল ২৬ ঘণ্টা পর এবং তারার অভ্যন্তরের উপাদান প্রথমবার পৃষ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসার ২৯ ঘণ্টা পরই সুপারনোভা বিস্ফোরণটি পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন গবেষকেরা।”
তারা দেখলেন, ‘মৃত্যুপথযাত্রী’ সেই তারাটি নিজের বিষুবরেখা বা মধ্যরেখা ঘিরে আগে থেকেই থাকা গ্যাস ও ধুলার এক চাকতির মাধ্যমে পরিবেষ্টিত। বিস্ফোরণের ধাক্কায় তারার কেন্দ্রে থাকা উপাদান বাইরে ছিটকে বের হতে থাকে এবং তারার আকৃতি বিকৃত হয়ে উল্লম্বভাবে থাকা জলপাইয়ের মতো হয়ে যায়। বিস্ফোরণটি গোল বা বলের মতো করে তারাটিকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং তারার দু’পাশে বিপরীত দিকে প্রচণ্ড শক্তিতে উপাদানগুলোকে বাইরের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ইয়াং বলেছেন, “তারার বিবর্তন ও কী ধরনের ভৌত প্রক্রিয়ায় এই মহাজাগতিক আতশবাজির মতো বিস্ফোরণ ঘটে তা আমাদের বলে দিয়েছে এই সুপারনোভা বিস্ফোরণের আকৃতি।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
ইয়াং বলেছেন, “সূর্যের চেয়ে আট গুণ বা তার বেশি ভরওয়ালা এসব বিশাল তারা কীভাবে সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হয় তার সঠিক প্রক্রিয়া এখনও বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কের বিষয়। এটি এমন এক মৌলিক প্রশ্ন, যার উত্তর বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেতে চান।”
এ ধরনের বিশালাকার তারার আয়ু তুলনামূলকভাবে খুবই ছোট। তারাটি ‘রেড সুপারজায়ান্ট’ প্রকৃতির। মৃত্যুর সময় এর বয়স হয়েছিল প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ বছর। এর তুলনায় আমাদের সূর্যের বয়স সাড়ে চারশ কোটি বছরের বেশি এবং আরও কয়েক শত কোটি বছর টিকে থাকবে।
বিস্ফোরণের সময় এই তারার ব্যাস সূর্যের চেয়ে প্রায় ছয়শ গুণ বড় ছিল। বিস্ফোরণে তারার কিছু ভর মহাকাশে ছিটকে যায়। এ গবেষণার সহ-লেখক ও জার্মানির ‘ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি’র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডাইটরিখ বাড বলেছেন, বাকি অংশটি সম্ভবত একটি নিউট্রন তারা হয়েছে, যা একটি তারার অসম্ভব সঙ্কুচিত অবশিষ্টাংশ।
একটি তারা যখন নিজের কেন্দ্রে ঘটতে থাকা পারমাণবিক সংযোজনের জন্য হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ করে ফেলে তখন এর কেন্দ্র বা কোর ভেঙে পড়ে। এরপর সেই শক্তি বিভিন্ন উপাদানকে বাইরে ধাক্কা দিয়ে তারার পৃষ্ঠ ভেদ করে মহাকাশে পাঠায়।
ইয়াং বলেছেন, “বিস্ফোরণের সময় তারার কেন্দ্রের উপাদান খুব দ্রুত গতি পায় ও তারার পৃষ্ঠ বা ফটোস্ফিয়ার ভেদ করে বাইরে আসে। আমরা ভিএলটি টেলিস্কোপ দিয়ে প্রথমবার সেই মুহূর্তটিই পর্যবেক্ষণ করেছি।”