Published : 29 Aug 2025, 02:57 PM
মরক্কোতে সবচেয়ে পুরানো কাঁটাওয়ালা ডাইনোসরের জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অ্যানকিলোসর নামের ডাইনোসরের সবচেয়ে প্রাচীন প্রজাতি ‘স্পাইকোমেলাস আফের’ অন্তর্ভুক্ত এই ডাইনোসর।
ট্যাংকের মতো শক্ত ও মজবুত গঠন, পুরো শরীর কাঁটা দিয়ে ঢাকা আর গলফ ক্লাবের মতো লম্বা কাঁটার সাজে ঘেরা গলার এই ‘স্পাইকোমেলাস আফের’কে দেখতে কোনো জীবন্ত প্রাণীর মতো লাগে না, বরং পোকেমন চরিত্রের মতোই লাগে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে গার্ডিয়ান।
জীবাশ্মবিদরা বলছেন, ১৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে বর্তমান পৃথিবীর উত্তর আফ্রিকার প্লাবনভূমিতে ঘুরে বেড়াত অদ্ভুত দেখতে এ ডাইনোসরটি।
এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরানো অ্যানকিলোসর ডাইনোসরের নমুনা এ জীবাশ্মটি, যেটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছে মরক্কোর কেন্দ্রীয় বুলেমেন শহরের কাছে। এরা এক ধরনের বড় আকারের তৃণভোজী ডাইনোসর। এই জীবাশ্মে থাকা বিশেষ ধরনের গা ঢাকার কাঁটা ও বর্ম দেখে বিজ্ঞানীরা তাদের আগের বিভিন্ন ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন যে, এরা কীভাবে এ ধরনের বর্মপোশাক নিয়ে বিবর্তিত হয়েছে।
এ প্রকল্পের সহ-প্রধান ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম’-এর অধ্যাপক রিচার্ড বাটলার বলেছেন, “এর পুরো দেহ জুড়ে একেবারে কাঁটা দিয়ে ভরা। গলার আশপাশে রয়েছে বিস্ময়কর ধরনের কাঁটা, বর্মের মতো কলার, যা দেহের অন্য অংশের চেয়ে অনেক বড়। এদের দেহের পাঁজরের কাছ থেকে ছোট ছোট কাঁটাও বেরিয়ে রয়েছে। আর এদের লেজের শেষদিকে কোনও বিশেষ ধরনের অস্ত্র থাকতে পারে।”
এ ডাইনোসরের শরীরের গঠন এতই অদ্ভুত যে, জীবাশ্মের অসম্পূর্ণ ও এলোমেলো বিভিন্ন হাড় থেকে এর পুরো দেহের গঠন বানানো সহজ ছিল না।
বাটলার বলেছেন, “আমরা ডাইনোসরটির দেহের এসব বর্ম টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখেছিলাম এবং সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত জায়গায় এগুলো কোথায় বসে তা বোঝার চেষ্টা করেছিলাম।”
অ্যানকিলোসররা মধ্য-জুরাসিক যুগ থেকে শেষ ক্রেটাসিয়াস যুগ পর্যন্ত পৃথিবীতে বাস করত। ওই সময় এক গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার কারণে অধিকাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এদের দেহের আকার ছোট, এরা ধীরগতির ও বেশ ভারী বর্মে ঢাকা।
“এদের মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় সম্ভবত এরা একটু বোকাসোকা ধরনের। তবে এরা খুব সফল ছিল। প্রায় ১০ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে ছিল এরা।”
ডাইনোসরটি প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ও এর ওজন ছিল প্রায় দুই টন। তবে সন্ধান মেলা জীবাশ্মে ডাইনোসরটির লেজের শেষাংশ নেই। এর লেজের সঙ্গে যুক্ত মেরুদণ্ড থেকে ধারণা মেলে, লেজের শেষাংশ একটি গলাবার মতো কাঠামোয় শেষ হত, যা সম্ভবত শত্রু বা শিকারিদের মারার জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত এরা।
গবেষকরা বলছেন, এর থেকে ইঙ্গিত মেলে লেজকে অস্ত্র হিসেবে বিবর্তিত করার বিষয়টি আগের ধারণার চেয়ে প্রায় তিন কোটি বছর আগে শুরু হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ের অ্যানকিলোসরদের অপেক্ষাকৃত সরল বর্ম সাধারণত এদের শারীরিক রক্ষার জন্য বিবর্তিত হয়েছে বলে ধরা হয়। তবে স্পাইকোমেলাসের অতিরিক্ত কাঁটা, যা শক্ত চামড়ার বাইরে বেরিয়ে থাকত তা বেশি করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা মিলনের সময় আকর্ষণ দেখানোর জন্য ব্যবহার হত বলে অনুমান গবেষকদের।
বাটলার বলেছেন, “এই ডাইনোসরের গলার কলার দেখলে মনে হয় এটি একদম অতিরঞ্জিত কিছু, যা এর জীবনকে অনেক জটিল করে তুলত।”
তবে সমস্যা হচ্ছে, স্পাইকোমেলাসের জীবাশ্ম যেখানে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে সেখানে অনেক জীবাশ্ম শিকারি ঢুকে গিয়েছেন। ফলে ডাইনোসরের পুরো কংকাল পাওয়া যায়নি, কেবল অর্ধেক অংশ নিয়ে গবেষণা চালানো সম্ভব হয়েছে, যা এখন ফেজ শহরের একটি বিজ্ঞান কলেজে রাখা আছে।
বাটলার বলেছেন, জীবাশ্ম শিকারিরা ওই জীবাশ্মের কিছু হাড় অনলাইনে ১০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন, যা গবেষকদের জন্য খুবই হতাশাজনক ব্যাপার।
“মরক্কোতে জীবাশ্ম চুরি বা কালোবাজারি বড় এক সমস্যা। এ জীবাশ্মের কিছু অংশ ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে বিক্রির জন্য চলে এসেছে। সম্ভবত ডাইনোসরের অনেক বড় অংশই বাজারে চলে গিয়েছে, যেগুলো প্রায়শই ধনী ব্যক্তিরা কিনে নেন, যেটি এ গল্পের খুবই দুঃখজনক দিক।”