Published : 30 Apr 2026, 10:21 AM
২০০২ সালে পেপাল আইপিওর সাফল্য লাস ভেগাসের এক ক্যাসিনোতে উদযাপনের জন্য জড়ো হয়েছিলেন মাস্ক ও কোম্পানির অন্যান্য নির্বাহীরা। তবে অন্যরা যখন পুলের ধারে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন মাস্ক তখন বুঁদ হয়েছিলেন পুরানো সোভিয়েত রকেট ম্যানুয়ালের ওপর।
ওই সময় নিজের পরবর্তী উদ্যোগ স্পেসএক্সের পরিকল্পনা করছিলেন মাস্ক। আর, সব কিছু ধারণা অনুসারে এগোলে, সেই স্পেসএক্স ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও ঘোষণা করতে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, রকেট নির্মাণ থেকে শুরু করে মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়ার লক্ষ্যে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এখন স্রেফ একটি কোম্পানি নয়, বরং ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য এক মহাকাশ সাম্রাজ্য।
তবে, ইতিহাসের বৃহত্তম আইপিওর মহাকাশচুম্বী স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অসম এক লড়াইয়ের গল্প।
পেপালের সেই পার্টিতে উপস্থিত থাকা পেপালের প্রথম দিককার একজন বিনিয়োগকারী কেভিন হার্টজ বলেছেন, “মাস্ক তখন নিশ্চিতভাবেই বড় জয় পেয়েছেন। কারণ তিনি ছিলেন অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার। তবুও তিনি তার পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে মনোযোগী ছিলেন। আর আজ তা ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে।”
মাস্ক স্পেসএক্সের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই দশকে কোম্পানিটি বিশ্বের বৃহত্তম মহাকাশ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তারা হাজার হাজার স্টারলিংক ইন্টারনেট স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট উদ্ভাবন করেছে।
স্পেসএক্সের রকেটের এ পুনরায় ব্যবহারের বিষয়টি মহাকাশ ভ্রমণের খরচ ও অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। মাস্ক এর তুলনা করেন এমন এক উড়োজাহাজ উদ্ভাবনের সঙ্গে, যা প্রতিটি ফ্লাইটের পর আর ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই।

মহাকাশ গবেষণায় দুঃসাহসিক ঝুঁকি নিয়ে প্রচলিত যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার যে দীর্ঘ প্রচেষ্টা মাস্ক চালিয়েছেন তার প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে এ বছরই।
এ বছর স্পেসএক্স শেয়ার বাজারে আসার পরিকল্পনা করছে, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার। সে ক্ষেত্রে এটি হবে ইতিহাসের বৃহত্তম পাবলিক লিস্টিং, যা মাস্ককে বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নেয়ার’ বা লাখ কোটিপতি হওয়ার পথেও অনেকখানি এগিয়ে দেবে।
তবে রয়টার্সের পর্যালোচনা অনুসারে, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরি বা প্রথম গণমুখী বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি তৈরির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ত তার সামনে অপেক্ষা করছে।
স্পেসএক্সের আইপিও-পূর্ব গোপন প্রসপেক্টাসের ১০০ পৃষ্ঠারও বেশি নথি বিশ্লেষণ করে রয়টার্স কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে। গত সপ্তাহে এসব নথিপত্রের ওপর ভিত্তি করেই একগুচ্ছ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
মাস্কের জীবনীকার ও টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক সম্পাদক ওয়াল্টার আইজ্যাকসন এ বিলিয়নেয়ারের সঙ্গে টানা দুই বছর কাটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমি সবসময় ভাবতাম সে পাগল। কিন্তু তার বিপক্ষে বাজি ধরার ঝুঁকি হল, সে শেষ পর্যন্ত অসম্ভবকে সম্ভব করে ছাড়ে এবং নিজের কাজ ঠিকই হাসিল করে নেয়।”
মাস্কের প্রিয় বইগুলোর একটি ডগলাস অ্যাডামসের ‘দ্য হিচহাইকার্স গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি’। স্পেসএক্সের নথিপত্রটি পড়লে মনে হয়, এ যেন সেই বইয়ের পাতা থেকেই উঠে এসেছে, যেখানে কোম্পানিটিকে কেবল রকেট বা স্যাটেলাইট নির্মাতা হিসেবে নয়, বরং এআইয়ের ভবিষ্যতের এক মহাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যার পরিধি মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার থেকে শুরু করে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহের শিল্পকারখানা পর্যন্ত বিস্তৃত।
এ নথিতে সূর্যকে কাজে লাগিয়ে প্রায় অসীম শক্তি উৎপাদনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা এআইয়ের এ নতুন যুগকে গতিশীল করবে। এতে আরও ঘোষণা করা হয়েছে, কোম্পানিটি ‘জীবনকে বহু-গ্রহের উপযোগী করে তুলবে, মহাবিশ্বের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করবে এবং চেতনার আলোকে তারাপুঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে দেবে’।
কোম্পানিটির এ নথির শুরুতে মাস্কের একটি উক্তি রয়েছে, যেখানে উল্লেখ আছে, “আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে এমনটা ভাবতে চাইবেন যে, ভবিষ্যৎ চমৎকার হতে যাচ্ছে, যা নভোচারী সভ্যতা হওয়ারই মূল উদ্দেশ্য।”
এ নথির বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি স্পেসএক্স।
‘বড় ঝুঁকি নিয়ে সফল হওয়ার স্বপ্ন’
মহাকাশ নিয়ে এমন সব অকল্পনীয় দাবি বাজার পর্যবেক্ষক ও সমালোচকদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তবে ‘ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস’, ‘ফাউন্ডার্স ফান্ড’ ও ‘ভ্যালর ইক্যুইটি পার্টনার্স’-এর মতো বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারী কোম্পানি এবং মাস্কের একনিষ্ঠ সমর্থকরা দীর্ঘ সময় ধরে স্পেসএক্সের ওপর আস্থা রেখেছেন।
বছরের পর বছর রকেটের ব্যর্থতা, আর্থিক লোকসান, মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার মুখেও তারা পিছু হটেননি।
বিনিয়োগকারীদের কাছে মাস্কের গ্রহণযোগ্যতার মূল ভিত্তি তার অসম্ভব সব আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা। এর বড় প্রমাণ, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ‘ফ্যালকন ৯’ রকেট ও এর মাধ্যমে গড়ে তোলা ‘স্টারলিংক’ ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক।
স্পেসএক্সের শুরুর দিকের অন্যতম কর্মী জিম ক্যান্ট্রেল পরে নিজের ব্যবসা শুরু করেছেন। তিনি বলেছেন, “পঁচিশ বছর আগে আমি নিজেও ভাবতাম আমরা পাগল হয়ে গেছি। তবে এখন মঙ্গল গ্রহে পণ্য তৈরি করে পৃথিবীতে বিক্রির পরিকল্পনা মোটেও আর পাগলামি বলে মনে হয় না।”
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, স্পেসএক্সের এ নথিতে কিছু কঠিন বাস্তবতার চিত্রও ফুটে উঠেছে। গেল বছর কোম্পানিটি লোকসানের মুখ দেখেছে এবং বড় বড় প্রযুক্তি জায়ান্টদের তুলনায় এআই গবেষণায় তাদের খরচ অনেক কম।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, চাঁদ বা মঙ্গলে বসতি স্থাপন বা কক্ষপথে ডেটা সেন্টার তৈরির মতো বিভিন্ন প্রকল্প এখনও অপ্রমাণিত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, যা হয়ত বাণিজ্যিকভাবে সফল নাও হতে পারে।
এমন বাস্তব পরিসংখ্যান দেখে অনেক বিশ্লেষক মাস্কের এই ভিশনকে কেবল কোম্পানির বাজারমূল্য বাড়ানোর কৌশল বা ‘হাইপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট বা ইভির শুরুর সময়ের মতো এআই ক্ষেত্রটি এখন আর ফাঁকা নেই। এখানে স্পেসএক্সকে ওপেনএআই, মাইক্রোসফট ও গুগলের মালিকানাধীন অ্যালফাবেটের মতো বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
নথিতে করা সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি হচ্ছে, স্পেসএক্স ২৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বড় বাজারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যা আমেরিকার মোট জিডিপি’র চেয়েও বেশি।
‘কলাম্বিয়া ল’ স্কুলের কর্পোরেট গভর্ন্যান্স’ বিষয়ক অধ্যাপক এরিক ট্যালি এ সংখ্যাটিকে ‘বিস্ময়কর রকমের বড় লক্ষ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, মাস্কের বিশেষত্বই হচ্ছে ‘বড় কোনো ঝুঁকি নেওয়া এবং তা থেকে বড় মুনাফা পাওয়ার আশা করা’।
বিনিয়োগ ফার্ম ‘গারবার কাওয়াসাকি’ স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারের মালিক। ফার্মটির সিইও রস গারবার বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা এই যাত্রায় “পিছিয়ে না পড়ার ভয়ে অনেক সময় সাধারণ গাণিতিক বিশ্লেষণ বা যুক্তি সরিয়ে রাখতেও রাজি থাকেন।
“সবার মধ্যে এমন ধারণা কাজ করে, মাস্ক একবার টেসলার মাধ্যমে ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি তৈরি করে দেখিয়েছেন। ফলে তিনি এমনটি বারবার করতে পারবেন।”
মাস্কের ওপর স্পেসএক্সের নির্ভরতা
মহাকাশ নিয়ে মাস্কের সব ভবিষ্যদ্বাণী সব সময় সফল হয়নি। স্পেসএক্সের ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি ‘স্টারশিপ’, যা সম্পূর্ণ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট। তবে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে বিস্ফোরণ, সরকারি নীতিমালার জটিলতা ও কারিগরি বাধার কারণে এই প্রকল্পের সময়সীমা বারবার পিছিয়েছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, স্টারশিপের ওপরই স্পেসএক্সের অনেক বড় প্রতিশ্রুতি নির্ভর করছে। স্টারলিংক ইন্টারনেটকে নতুন বাজারে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে কক্ষপথে এআই পরিকাঠামো স্থাপন এবং নাসার মিশনে নভোচারীদের পৃথিবীর বাইরে নিয়ে যাওয়া সবই এ রকেটের সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে।
নথিতে এ ঝুঁকির কথাটি সরাসরি স্বীকারও করেছে কোম্পানিটি- “বড় পরিসরে স্টারশিপ তৈরির ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের ব্যর্থতা বা বিলম্ব... আমাদের ব্যবসার প্রসারের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত বা সীমিত করতে পারে।”
স্পেসএক্সের আইপিও-পূর্ব নথিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে স্বয়ং মাস্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কথা উল্লেখ রয়েছে। তিনি একাই চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে আছেন, পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তার বেতন কাঠামোও ব্যতিক্রমী।
এ কাঠামোটি কোম্পানির বাজারমূল্য ৭.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া এবং মঙ্গল গ্রহে ১০ লাখ মানুষের বসতি স্থাপনের মতো বিস্ময়কর সব লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত।
নথিতে মাস্ককে ‘আমাদের প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, তাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ পথচলা কোম্পানির অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়া সময়মতো সম্ভব নাও হতে পারে।
মাস্কের জীবনীকার ওয়াল্টার আইজ্যাকসন বলেছেন, “তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি নির্ভরযোগ্যভাবে কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছেন এবং স্পেস স্টেশন থেকে নভোচারীদের ফিরিয়ে আনছেন।
“তিনি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীকে স্রেফ বিজ্ঞানে পরিণত করতে পেরেছেন”, বলেন স্টিভ জবস ও আইনস্টাইনের জীবনী লেখা এ সাবেক সাংবাদিক।