Published : 23 Nov 2025, 04:37 PM
ভূমিকম্প আমাদের ভয় দেখায়, আবার বিস্মিতও করে, যা প্রকৃতির সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলোর একটি। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে এই ভূমিকম্প। ছুটির দিনের সকালে ভূমিকম্পের সেই শক্ত ঝাঁকুনি আমাদের আবারও তা মনে করিয়ে দিল, কেঁপে উঠল ঢাকাসহ সারা দেশ। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৫.৭।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে, কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। স্থায়ীত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস অবশ্য ভূমিকম্পের মাত্রা দেখাচ্ছে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৫। উপকেন্দ্র বলছে নরসিংদী থেকে ১৪ কিলোমিটার পশ্চিম দক্ষিণ-পশ্চিমে।
ভূমিকম্প
পৃথিবীর ভূত্বকে ধীরে ধীরে জমে থাকা টেকটোনিক প্লেটের আকস্মিক চাপে সেখানে তৈরি হয় ফল্ট বা ফাটলের, যার কারণে ভূমিকম্প হয়, যেগুলো খুব জটিল এক ব্যবস্থার অংশ, যার অনেক তথ্যই অজানা বা জানা সম্ভব নয়।
ভূগর্ভে ছোট কোনো পরিবর্তনই কখনও কখনও বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। এসব ফল্ট প্রাকৃতিকভাবেই অপ্রত্যাশিত আচরণ করে, ল্যাবরেটরিতেও এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট ফিজিক্সঅর্গ।
পূর্বাভাস সম্ভব?
সঠিকভাবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া মানুষের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি। অনেকের ধারণা, কোনো কোনো প্রাণীর অদ্ভুত আচরণ ভূমিকম্পের আগাম সংকেত হতে পারে। তবে বিজ্ঞান সেই ধারণাকে সমর্থন করে না। কারণ এসব ঘটনা অনেক সময় ভূমিকম্প ছাড়াই ঘটে, আবার ভূমিকম্পও অনেক সময় এসব লক্ষণ ছাড়াই হয়।
ভূমিকম্পবিদদের অনুমান, ভূমিকম্প সাধারণত কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই ঘটে। ভূমিকম্প-তৈরিকারী বিভিন্ন অঞ্চল পৃথিবীর ভূত্বকের গভীরে অবস্থিত, যেগুলো সরাসরি দেখতে বা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন না বিজ্ঞানীরা।
প্রচলিত পূর্বাভাস পদ্ধতি
অনেক আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করে আসছেন, বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঠিক আগে ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটলে কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন ঘটে। যেমন– ‘মাইক্রো-ফ্র্যাকচারিং’ বা খুব ছোট ফাটল তৈরি হওয়া ও ‘স্লো স্লিপ’ বা ফাটলের দুই পাশ খুব ধীরে সরে যাওয়া।
ভূমিকম্পের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে বলে মনে হলেও এসব প্রক্রিয়া ঠিক কীভাবে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করতে পারে সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ছোট ও বড় ভূমিকম্প উভয়েরই শুরুর দিকের লক্ষণ প্রায় একই রকম দেখা যায়। ফলে শুরুর মুহূর্ত দেখে বোঝা যায় না কোন ভূমিকম্প কম মাত্রার ও কোনটি বড় মাত্রার ভূমিকম্পে পরিণত হবে। ফলে ভূমিকম্প আগে থেকে জানার জন্য খুব স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন লক্ষণ কতটা কাজে লাগবে তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
এসব জটিলতার কারণে এখন মেশিন লার্নিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভূমিকম্পের আগে ফল্টে ঘটে যাওয়া সম্ভাব্য সংকেত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। ছোট আকারের বা সেন্টিমিটার-স্কেলের ল্যাব পরীক্ষায় বিভিন্ন মেশিন লার্নিং মডেল ‘স্টিক-স্লিপ’ ধরনের ক্ষুদ্র ভূমিকম্প বেশ ভালোভাবে পূর্বাভাস দিতে পেরেছে। তবে এখনও এই পদ্ধতি বড় ও জটিল সিস্টেমে প্রয়োগ করা হয়নি, বিশেষ করে যেগুলো বাস্তব পৃথিবীর ভূকম্পতৈরিকারী ফল্টের মতো আচরণ করে।
মেশিন লার্নিং বা এআই
এ কারণেই এ পদ্ধতিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাপানের ‘ইউনিভার্সিটি অফ কিয়োটো’র একদল গবেষক। মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে মিটার-স্কেলের ল্যাবরেটরি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা, যেখানে ভূমিকম্প তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া ও সময়সীমা পৃথিবীর ভূগর্ভে ঘটে যাওয়া বাস্তব প্রক্রিয়ার সঙ্গে অনেক বেশি মিলেছে।
তাদের এ গবেষণাটপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।
এ গবেষণার লেখক রেইজু নরিসুগি বলেছেন, “আমরা উন্নত এক মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। এ পদ্ধতিতে ল্যাবরেটরিতে পাথর ঘষার পরীক্ষা করেছি আমরা, যেখানে ছোট ছোট ‘স্টিক-স্লিপ’ ধরনের ভূমিকম্প তৈরি হয়। পরীক্ষার সময় ছোট ছোট শব্দ কম্পনও হয়, যা ভূমিকম্পের আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করে। এসব সূক্ষ্ম সংকেত ধরতে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করেছি আমরা।”
এআই যেভাবে কাজ করে
গবেষণায় উঠে এসেছে, মেশিন লার্নিং কেবল ছোট ছোট আগাম কম্পনের তথ্য দিয়ে সেসব ক্ষুদ্র সংকেতগুলো ধরতে পারে, যা ল্যাবরেটরিতে ভূমিকম্প হওয়ার ঠিক আগে ঘটে। সহজভাবে বললে, আগে থেকে ভূমিকম্পের ‘লুকানো সংকেত’ চিনে নিতে পারে মেশিন লার্নিং।
কীভাবে মেশিন লার্নিং ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে তা বোঝার জন্য তাদের গবেষণার ফলাফল পদার্থবিদ্যার সংখ্যাভিত্তিক সিমুলেশনের সঙ্গে তুলনা করেছে গবেষক দলটি, যেখানে পরীক্ষার বিভিন্ন তথ্য পুনরায় তৈরি করেছেন তারা।
গবেষকরা বলছেন, মেশিন লার্নিং ঠিকভাবে পূর্বাভাস দিতে পারছে কারণ ফল্টের ‘ক্রিপিং’ অংশকে শনাক্ত করছে এটি, যা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। এই অংশে চাপ কীভাবে বাড়ছে বা কমছে তা বোঝা গেলে, ল্যাবরেটরি ভূমিকম্প কখন শুরু হবে তা আগে থেকে জানা সম্ভব।
গবেষণা দলের নেতৃত্বে থাকা ইয়োশিহিরো কানোকো বলেছেন, “ফল্টের নির্দিষ্ট ছোট ছোট অংশে যে চাপের পরিবর্তন হয়, তা ফল্টের গড় চাপের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য দেয়। যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, ফল্টের বিভিন্ন অংশ কীভাবে আলাদা আলাদা ভাবে সরছে বা আচরণ করছে তা নজরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
গবেষকরা বলছেন, মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে বড় ল্যাবরেটরি ফল্টে ভূমিকম্পের আগে ঘটে যাওয়া সূক্ষ্ম বিভিন্ন পরিবর্তন শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে ল্যাবরেটরিতে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যকে বাস্তব পৃথিবীর ফল্ট বা ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যেতে পারে।
এআই যা পারে না
প্রচলিত ভূমিকম্প পূর্বাভাসের জন্য কম্পণের মাত্রা পরীক্ষার পদ্ধতি রয়েছে। তবে পরীক্ষার অভাবের কারণে এআই-ফলাফলের বৈধতা ও বৈজ্ঞানিক মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া, এআই সব ধরনের টেকটোনিক অঞ্চলে উপযোগী নাও হতে পারে।
আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে হলে বিভিন্ন এআই মডেকে সব ধরনের পরীক্ষার যোগ্য হতে হবে, স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত প্যারামিটার থাকতে হবে এবং উন্নত ও মানসম্পন্ন ভিত্তির সঙ্গে তুলনা করে তা যাচাই করাও প্রয়োজন। এজন্য দীর্ঘ সময় ধরে ও একাধিক অঞ্চলে পরীক্ষা করা জরুরি।
ভূমিকম্প পূর্বাভাস, বিশেষ করে সম্ভাব্যতাভিত্তিক পূর্বাভাস সাধারণ মানুষের কাছে এমনভাবে পৌঁছািনো উচিত যাতে তারা তা বুঝতে ও সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন, যা একটি বড় নৈতিক চ্যালেঞ্জ। এআই এখনই তা পারবে না।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার বিষয়টি স্বভাবতই অনিশ্চিত। ফলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, উদ্বেগ এবং কখনও কখনও বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এআই ব্যবহারে সতর্ক থাকা জরুরি।