Published : 22 Aug 2025, 07:30 PM
আইবিএম ও নাসা একসঙ্গে মিলে এক ওপেন-সোর্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল তৈরি করেছে, যা সৌর আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারে বলে দাবি তাদের।
সৌর আবহাওয়া বলতে বোঝায় সূর্যের থেকে নির্গত বিকিরণ, প্লাজমা বা চৌম্বকীয় তরঙ্গ, যা পৃথিবীর প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ও বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন এআই মডেলটি সময়মতো সেই রকম ঝড় বা ঘটনা শনাক্ত করতে সাহায্য করবে, যাতে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট এনগ্যাজেট।
গত ২০ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী ভূচৌম্বকীয় ঝড় পৃথিবীতে আঘাত হানে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কিছু অংশেও অরোরা দেখা মেলে, যা সাধারণত পৃথিবীর এত দক্ষিণে দেখা যাওয়ার কোনো কথায় ছিল না।
এ ধরনের ঝড় সাধারণত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বিভিন্ন কোম্পানির জন্য সমস্যা তৈরি করে। যেমন ১৯৮৯ সালে সূর্য থেকে একাধিক প্লাজমা নির্গমনের ফলে কানাডার কুইবেক প্রদেশে নয় ঘণ্টার ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেছিল।
তবে এবার বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানি আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পরিষেবার বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি। এর থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, ভূচৌম্বকীয় ঝড়ের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার গুরুত্ব কতটা বেশি।
গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও মার্কিন কম্পিউটার হার্ডওয়্যার নির্মাতা কোম্পানি ‘ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন’ বা আইবিএম একসঙ্গে কাজ করছে, যাতে বিজ্ঞানী ও অন্যান্যরা সৌর আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও ভালোভাবে দিতে পারে।
মঙ্গলবার তাদের সেই কাজের ফল প্রকাশ করেছে তারা, যেটি ‘সুরিয়া’ নামের এক ওপেন-সোর্স এআই মডেল। সূর্যের সংস্কৃত নাম অনুসারে মডেলটির এমন নাম রাখা হয়েছে।
এ সিস্টেমটিকে ‘সূর্যের জন্য এক এআই টেলিস্কোপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন আইবিএম রিসার্চ ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের পরিচালক হুয়ান বার্নাবে-মোরেনো।
এ মডেলটিকে ‘সোলার ডায়নামিক্স অবজারভেটরি’ বা এসডিও স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত নয় বছরের উচ্চ-রেজোলুশনের ছবি ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দিয়েছে আইবিএম। ২০১০ সাল থেকে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করতে এ স্যাটেলাইটটি ব্যবহার করে আসছে নাসা।
‘সুরিয়া’ মূলত সূর্যের ছবি বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাসে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কাজ করে। এখন পর্যন্ত এর ফলাফল আশাব্যঞ্জক বলে দাবি গবেষকদের।
বার্নাবে-মোরেনো বলেছেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় আইবিএম দেখেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সূর্যে কোনো সোলার ফ্লেয়ার বা সৌরচ্ছ্বটা বিচ্ছুরিত হবে কি না সেই প্রশ্নে আগের বিভিন্ন সিস্টেমের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি নির্ভুল উত্তর দিতে পেরেছে নতুন এআই টুলটি।
এ ছাড়াও, ভবিষ্যতে এসডিও কী দেখতে পারে তার দৃশ্যভিত্তিক পূর্বাভাসও তৈরি করতে পারে মডেলটি। এখন পর্যন্ত শেষ হওয়া সৌর চক্রের তথ্য ব্যবহার করে আইবিএম দেখেছে, প্রায় দুই ঘণ্টা আগেই সূর্যের ভবিষ্যৎ চেহারার সঠিক পূর্বাভাস দিতে পারে সুরিয়া।
বার্নাবে-মোরেনো বলেন, “আমরা এখন আরও বেশি সময় মডেলটির আগাম পূর্বাভাসের নির্ভুলতা নিয়েও গবেষণা করছি।”

দুই ঘণ্টা আগাম পূর্বাভাসের বিষয়টি খুব বেশি কার্যকর মনে না হলেও বার্নাবে-মোরেনো বলেছেন, অবকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবস্থাপকদের জন্য বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে এ এআই মডেল। গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানি আরও দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো পাওয়ার গ্রিড তৈরিতে কাজ করেছে। ফলে এমন অল্প সময়ের সঠিক পূর্বাভাসও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সুরিয়া ৩৬ কোটি ৬০ লাখ প্যারামিটারের এক এআই মডেল। ফলে এটি তুলনামূলকভাবে হালকা ও কম শক্তিশালী হার্ডওয়ারেও চালানো সম্ভব। এতে করে আরও বেশি কোম্পানির পক্ষে মডেলটি ব্যবহার করা সহজ হবে।
আইবিএম ও নাসার এ ঘোষণার সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ দিক হচ্ছে নাসার বিজ্ঞান দলের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে এই যৌথ উদ্যেগ। আর ঠিক এমন এক সময় যখন নাসার সেই বিজ্ঞান দলটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে রয়েছে।
সম্প্রতি নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে নাসা। সংস্থাটির বিজ্ঞান বিভাগের বাজেট প্রায় অর্ধেকে কমানোর পরিকল্পনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটের প্রভাব পড়বে নাসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিশনের ওপর, যার মধ্যে রয়েছে ‘সোলার ডায়নামিক্স অবজারভেটরি’ও।
‘নিউ হরাইজনস’ ও ‘ওএসআইআরআইএস-এপেক্স’ মিশনের মতো একেবারে বাতিল না হলেও ‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র বিশ্লেষণ বলছে, এসডিও-এর বার্ষিক পরিচালনা বাজেট এক কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে কমিয়ে ৮০ লাখ ডলারে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মার্কিন উভয় রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরাই নাসার এ বাজেট কাটছাঁটের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। তবে এখনও নাসার ২০২৬ সালের বাজেট নিয়ে একমত হতে পারেনি সিনেট ও হোয়াইট হাউস। এদিকে, বাজেট অনুমোদনের শেষ সময়সীমা দ্রুতই ঘনিয়ে আসছে। ফলে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে নাসার ভবিষ্যৎ।
এ বাজেট কাটছাঁট যদি শেষ পর্যন্ত না-ও হয় তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি কর্মীসংখ্যা কমিয়ে আনার বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় চার হাজার কর্মী হারাতে পারে নাসা, যা তাদের মোট জনবলের প্রায় ২০ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট এনগ্যাজেট।
এমন পরিস্থিতি নাসার মতো বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন নাসা জলবায়ু, মহাকাশ ও সৌরঝড়ের মতো বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে।
বার্নাবে-মোরেনো বলেছেন, নাসার সহায়তা ছাড়া সুরিয়া তৈরি করা সম্ভব হত না।
“একদম শুরু থেকেই নাসার গবেষণা দলটি আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, মডেলটি কী কী কাজ করবে, কীভাবে সেটিকে যাচাই-বাছাই করতে হবে ও কীভাবে এটি শক্তপোক্ত ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।”
এ তহবিল সংকটের মধ্যেও যদি কোনও আশার খবর থাকে তা হচ্ছে, নাসার বিজ্ঞানী দলের এ কাজ চিরকাল টিকে থাকবে, এমনকি সংস্থাটির বাজেট কমে গেলেও।
বার্নাবে-মোরেনো বলেছেন, “এ মডেলটির সবচেয়ে দারুণ দিক হল আমরা এমন এক সক্ষমতা তৈরি করেছি, যেটিকে আপনি চাইলে এআই প্ল্যাটফর্মও বলতে পারেন। এ সক্ষমতা কেবল নাসা নয়, সংস্থাটির বাইরেও অনেক জায়গায় ব্যবহার করা যাবে।”
সুরিয়া মডেলটি ব্যবহার করতে চাইলে ‘হাগিং ফেইস’-এর ওয়েবসাইট থেকে তা ডাউনলোড করতে পারেন ব্যবহারকারীরা। হাগিং ফেইস জনপ্রিয় এক ওপেন-সোর্স এআই প্ল্যাটফর্ম, যেখানে গবেষক ও ডেভেলপাররা নিজেদের মডেল শেয়ার ও ব্যবহার করে থাকেন।