Published : 24 Jul 2026, 12:12 AM
পানি কমে, ফের বৃদ্ধি পেয়ে নীলফামারীর ডিমলার তিস্তা পাড়ের শত শত পরিবার পানিবন্দি কবলিত হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার বৃষ্টিপাত না হলেও দুপুরের দিকে উজানের ঢলে তিস্তায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
বানভাসিরা জানিয়েছেন, সকাল, দুপুর, বিকাল ও রাতে একেক সময় একেক রূপ নেয়। নদী প্রবাহ ঘুরে গিয়ে ডানতীরে এসে আঘাত, ফসলি জমিসহ বসতভিটা প্লাবিত ও ভাঙন সৃষ্টি করেছে। এতে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের কপাল পুড়ছে।
তারা বলছেন, দুই দিন ধরে তিস্তায় ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে ৬০টি পরিবার বসতঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
এদিন দুপুরে নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার বানভাসিদের খোঁজখবর নেন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন।
এদিন সরকারের ত্রাণ ভাণ্ডার থেকে ১৩ টন চাল ও ২০টি শুকনো খাবারের প্যাকেজ বিতরণের কথা জানিয়েছেন ঝুনাগাছ চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী।
তবে নদী পাড়ের গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, ‘ত্রাণ চাই না। বন্যা ঠেকাও, ভাঙন ঠেকাও।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশন থেকে জানা গেছে, উজানের ঢলে ও টানা বর্ষণে ডিমলায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি ওঠা-নামা করছে।
এদিন সন্ধ্যা ৬টায় এ পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ০৮; যা বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচে। এ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার। একইদিন সকাল ৯টায় এই পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ও বেলা ৩টায় ১৫ সেন্টিমিটার নিচে।
বুধবার ভোর ৬টায় এই পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার (৫২ দশমিক ১৪) নিচ দিয়ে পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করে প্রবাহিত হয়ে সকাল ৯টা পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে। পরে তা কমতে থাকে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। দুই দিন ধরে উজানে বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানি বাড়া-কমার মধ্যে প্রবাহ হচ্ছে।
সমতলে নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ভেণ্ডাবাড়ি এলাকার ডানতীরে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা ভাঙন রোধে কাজ করছি।”
তিস্তায় বন্যার কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ভেণ্ডাবাড়ি এলাকার পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
তাদের ভাষ্য, এলাকায় নদীর পানি প্রবেশ করে ঘরের ভিতরে হাটু পর্যন্ত পানি উঠেছে। অনেকেই ঘর-বাড়ি ভেঙে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। হুমকিতে রয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ আরও দুই শতাধিক পরিবার। এ ছাড়া ভাঙনের কবলে পড়েছেন মসজিদ, মাদ্রাসা, ফসলি জমিসহ শতাধিক পরিবার।
এর মধ্যে ৬০টি পরিবার তাদের বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে বলে জানান ওই এলাকার আল-আমিন ইসলাম। তিনি বলেন, এলাকার রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। এতে করে পানিবন্দি মানুষজন রান্না করে খেতে পারছে না। দেখা দিয়েছে গবাদি পশুর খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটারি ব্যবস্থার মারাত্মক সংকট।
ছাতুনামা কেল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা হবিবর রহমান বলেন, তাদের এলাকার পাঁচ থেকে সাত শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বুধবার রাত থেকে তাদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
রান্না করে খাওয়ার পরিস্থিতি না থাকায় বানভাসিদের জন্য দ্রুত শুকনো খাবারের সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
ভেণ্ডাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শুকুর আলী বলেন, “কয়েকশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। আমার ঘরেও পানি উঠেছিল, তবে এখন পানি নেই, উঠানে নেমে গেছে। রাস্তাগুলো তলিয়ে গেছে। একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা ভেঙে গেছে।”
দুপুরে জামায়াতের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
এ সময় এলাকাবাসী দাবি করেন, “আমরা ত্রাণ চাই না। এলাকার বন্যা ঠেকাও, ভাঙন ঠেকাও। আশ্বাস নয়-সমাধান চাই।”
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর হোসেন বলেন, “আমার বাড়িও নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকায় নদী ভাঙন শুরু হওয়ায় ৬০টি পরিবার বাড়ি-ঘর ভেঙে বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
“বুধবার রাতে বানের পানি কমে গেলেও বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে তিস্তার পানি আবারও বেড়ে যাওয়া গ্রামে বন্যা সৃষ্টি করেছে।”
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে ১৩ টন চাল ও ২০টি শুকনো খাবার পাওয়া যায়; যা বন্যা কবলিত মানুষদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইমরানুজ্জামান বলেন, তিস্তার ডানতীরে ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। তারা কাজ করছে।
এ ছাড়া ওই এলাকার বন্যাকবলিত মানুষদের জন্য চাল ও শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; যা ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বিতরণ করছেন বলে জানান তিনি।