Published : 31 Oct 2025, 01:03 PM
মহাবিশ্বের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অংশ জুড়ে থাকা অদৃশ্য পদার্থ ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব প্রমাণের আরও কাছাকাছি পৌঁছালেন বিজ্ঞানীরা। তারা আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে ছড়িয়ে থাকা এক ধরনের মৃদু গামা রশ্মির আলো নিয়ে এ বিষয়ে গবেষণা করছেন।
মহাবিশ্বে দৃশ্যমান সবকিছুই সাধারণ পদার্থ দিয়ে তৈরি, যেমন– তারা, গ্রহ, মানুষ, মাথার টুপি বা শীতের ভাপা পিঠা থেকে শুরু করে সবকিছুই। সাধারণ পদার্থকে আমরা ইনফ্রারেড থেকে দৃশ্যমান আলো ও গামা রশ্মি পর্যন্ত নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যে দেখতে পাই। কিন্তু এই সাধারণ পদার্থ আসলে মহাবিশ্বের কেবল ৫ শতাংশ গঠন করে আছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
অন্যদিকে, ডার্ক ম্যাটার কোনো আলো শোষণ, প্রতিফলন বা বিকিরণ করে না। আর এ ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশ অংশ জুড়ে রয়েছে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের। আর বাকি প্রায় ৬৮ শতাংশ অংশ গঠিত হয়েছে আরেক রহস্যময় উপাদান ডার্ক এনার্জির মাধ্যমে।
মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরে মহাকর্ষীয় প্রভাব ফেলার কারণে ডার্ক ম্যাটার যে সত্যিই রয়েছে এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত। তবে এর প্রকৃতি এতটাই রহস্যময় যে, এর অস্তিত্ব প্রমাণের বিষয়টিই এখনপর্যন্ত কঠিন।
তবে আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বিশাল অংশজুড়ে যে অতিরিক্ত গামা রশ্মি ছড়িয়ে রয়েছে তা শনাক্ত ও মানচিত্রায়ন করেছে ‘ফার্মি গামা-রে স্পেস’ নামের টেলিস্কোপ সেই গবেষণা থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, এ তথ্যই দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে পারে।
গামা রশ্মির উৎস সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন, যেগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত।
একটি ব্যাখ্যা অনুসারে, এসব গামা রশ্মি তৈরি হয়েছে ডার্ক ম্যাটারের বিভিন্ন কণার সংঘর্ষে, যেগুলো ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে জমে আছে। অন্য ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, এগুলো আসে এক বিশেষ ধরনের নিউট্রন তারা, যা বিশালাকার বিভিন্ন তারার মৃত্যুর পর সঙ্কুচিত ও ঘন হয়ে গঠিত হয়। এসব তারাকে বলে ‘মিলিসেকেন্ড পালসার’, এরা প্রতি সেকেন্ডে শত শতবার ঘুরতে ঘুরতে তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো বিকিরণ করে।
উন্নত সিমুলেশনসহ নতুন এক বড় পরিসরের গবেষণায় এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাখ্যার গুরুত্ব যাচাই করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, এ দুটি ব্যাখ্যাই সম্ভব।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ডার্ক ম্যাটারের বিভিন্ন কণার সংঘর্ষে যদি গামা রশ্মি তৈরি হয় তবে সেই রশ্মির ধরণ ও তীব্রতা ‘ফার্মি’ স্যাটেলাইটে পর্যবেক্ষিত গামা রশ্মির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
মেরিল্যান্ডের ‘জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি’ ও ‘ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স প্যারিস/সরবোন ইউনিভার্সিটি’-এর মহাজাগতিক বিজ্ঞানী জোসেফ সিল্ক বলেছেন, “আমাদের ছায়াপথ ও পুরো মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি বোঝার বিষয়টি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
“আমাদের গবেষণার প্রধান ফলাফল হচ্ছে, গামা রশ্মির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ডার্ক ম্যাটারের তত্ত্বও ঠিক মিলে যাচ্ছে– একইভাবে যেমন মিলছে নিউট্রন তারার তত্ত্বের সঙ্গে। আমরা এখন আরও বেশি নিশ্চিত হতে পারছি, সম্ভবত ডার্ক ম্যাটারকে পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা গিয়েছে।”
গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স’-এ।
গবেষকরা বলেছেন, ভূৃপৃষ্ঠে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গামা-রে টেলিস্কোপ হচ্ছে ‘চেরেনকভ টেলিস্কোপ অ্যারে অবজারভেটরি’, যা বর্তমানে চিলিতে নির্মাণাধীন রয়েছে। টেলিস্কোপটি সম্ভবত এই দুটি উৎস থেকে আসা গামা রশ্মি আলাদা করতে পারবে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত উত্তর দেবে। ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হতে পারে এ টেলিস্কোপ।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘লাইবনিজ ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স পটসডাম’-এর জ্যোতির্পদার্থবিদ মুরিটস মিখেল মুরু বলেছেন, “ডার্ক ম্যাটার থেকে আলো আসে না। ফলে আমরা এটিকে কেবল দৃশ্যমান পদার্থের ওপর এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারি। বহু দশক ধরে খোঁজ চালালেও এখনো কোনো পরীক্ষা সরাসরি ডার্ক ম্যাটার কণাকে শনাক্ত করতে পারেনি।”
গামা রশ্মির অতিরিক্ত মাত্রা দেখা গিয়েছে ছায়াপথের ভেতরের ৭ হাজার আলোকবর্ষ জুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে। আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে, যা প্রায় সাড়ে নয় লাখ কোটি কিলোমিটার। এ অঞ্চলটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে।
তড়িৎ চৌম্বকীয় বর্ণালীতে যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম ও শক্তি সবচেয়ে বেশি তাকে গামা রশ্মি বলে। কেন গামা রশ্মি হতে পারে ডার্ক ম্যাটারের প্রমাণ? এর কারণ, বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডার্ক ম্যাটারের বিভিন্ন কণা সংঘর্ষের সময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, যা উপজাত হিসাবে গামা রশ্মি তৈরি করে।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথ মূলত বিশাল এক মেঘ থেকে তৈরি হয়েছে। সেই মেঘে ডার্ক ম্যাটার ও সাধারণ পদার্থ মিশে ছিল। মেঘটি নিজের মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে ছায়াপথের আকার নেয়।
গবেষক সিল্ক বলেছেন, “সাধারণ পদার্থ ঠান্ডা হয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গিয়ে পড়েছিল এবং এর সঙ্গে কিছু ডার্ক ম্যাটারও টেনে নিয়েছিল। সবচেয়ে সাধারণ ডার্ক ম্যাটার তত্ত্বের এক বিশেষ দিক হচ্ছে, ডার্ক ম্যাটারের বিভিন্ন কণা নিজেদের বিপরীত কণার মতো আচরণ করে এবং সংঘর্ষের সময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এ ধ্বংসের ফলে শক্তিশালী গামা রশ্মি তৈরি হয়, যা আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। প্রোটন ও অ্যান্টিপ্রোটনের সংঘর্ষও কিছুটা এমনভাবে কাজ করে। তবে অ্যান্টিপ্রোটন খুবই কম পাওয়া যায়। ফলে এর সম্ভাবনা কম।”
এ আলো এখন পর্যন্ত দেখা না যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, হাজার হাজার মিলিসেকেন্ড পালসারের সম্মিলিত বিকিরণ থেকেও তৈরি হতে পারে এই রশ্মি। ফার্মি স্যাটেলাইট নিশ্চিত করেছে, এ ধরনের বিভিন্ন বস্তু গামা রশ্মির উৎস, যা এই অঞ্চলের আলোর কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে।