Published : 25 Jul 2026, 01:07 PM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা ও সরকার সংস্কারে জড়িয়ে ‘অতিরিক্ত ভেসে গিয়েছিলেন’ বলে স্বীকার করেছেন ইলন মাস্ক।
তবে রাজনীতি নিয়ে নিজের অনুশোচনা থাকলেও অভিবাসন, ইউরোপীয় রাজনীতি ও এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একচুলও সরেননি বিশ্বের শীর্ষ এই ধনকুবের।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আর্থিক নীতি বাস্তবায়ন বিষয়ক বিশেষ সংস্থা ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ বা ডজ-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাজনীতি নিয়ে ‘অতিরিক্ত মশগুল হয়ে পড়েছিলেন’ বলেও স্বীকার করেছেন মাস্ক।
বৃহস্পতিবার ইকোনমিস্ট-এ প্রকাশিত এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই খেদ প্রকাশ করেন স্পেসএক্স প্রধান। এ বছরের জুনে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে স্পেসএক্সের শেয়ার ছাড়ার পর স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার বা ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছিলেন মাস্ক।
সাক্ষাৎকারে তিনি বৈশ্বিক যুদ্ধ থেকে শুরু করে এআই পর্যন্ত নানান বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছু চমকপ্রদ পূর্বাভাসও দিয়েছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে মাস্ক বলেছেন, “সত্যি বলতে, আমি একটু বেশিই ভেসে গিয়েছিলাম।”
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ২০ কোটি ডলার অর্থায়ন করে ট্রাম্পকে জয়ী করতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন মাস্ক।
পরবর্তীতে ট্রাম্পের বিতর্কিত মেয়াদে ডজ-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ১৫ হাজার কোটি ডলারের বাজেট কাটছাঁট করেন এবং হাজার হাজার সরকারি কর্মীকে চাকরিচ্যুত করতে ভূমিকা রাখেন।
টেসলার এ কর্ণধার অবশ্য নিজের বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। তবে ওয়াশিংটনের ক্ষমতা চর্চায় জড়ানোর প্রভাব যে কতটা গভীর ছিল সে বিষয়ে তিনি সচেতন বলেই মনে হয়েছে।
এর আগে, ডিসেম্বরে স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলারের এক পডকাস্টে মাস্ক বলেছিলেন, মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকার সংস্কারে তার নেওয়া জোড়ালো কৌশল কেবল আংশিকভাবে সফল হয়েছে। আবার যদি একই সুযোগ দেওয়া হয় তবে হয়ত তিনি আর এতে জড়াবেন না।
মাস্ক বলেছেন, “আমার মনে হয়, ‘ডজ’-এর পেছনে সময় না দিয়ে বরং আমার বিভিন্ন কোম্পানির পেছনেই মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল।”
ইকোনমিস্টের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে পাওয়া জনসম্পৃক্ততা ও নিজের প্রভাব বেশ উপভোগই করেছেন।
এদিকে, মাস্ককে রূপক অর্থে আধুনিককালের ‘ক্যাসান্ড্রা’, অর্থাৎ যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পান কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না এমন মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছে ইকোনমিস্ট।
মাস্কও বলেছেন, “মানুষ বোঝে না যে, আমি যা বলি তা-ই কিন্তু বাস্তবে ঘটে।”
টেক্সাসের টেসলা কারখানায় রেকর্ড করা ইকোনমিস্টের এ ৯০ মিনিটের দীর্ঘ ভিডিও সাক্ষাৎকারটি ছিল স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে আসার পর মাস্কের প্রথম কোনো বক্তব্য।
এর পরপরই তার ব্যক্তিগত সম্পদ সাময়িকভাবে ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। তবে পরবর্তীতে তা নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৭৫ হাজার কোটি ডলারে।
একই দিনে নিজের অনুভূতি ‘প্রচণ্ড উত্তেজনা থেকে আতঙ্কে’ রূপ নেওয়ার কথা বললেও তা স্পেসএক্সের শেয়ার দর নিয়ে ছিল না, বরং মাস্ক বলেছেন তা ছিল এআই নিয়ে। তার ভাষ্য, এআই অদূর ভবিষ্যতে মানুষের কাজকে পুরোপুরি ‘ঐচ্ছিক’ বা বিকল্প করে তুলবে।
মাস্ক বলেছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে এআইয়ের বুদ্ধি পৃথিবীর সব মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে। আর ১০ বছরের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহারের ফলে ‘এত সম্পদ ও উৎপাদন’ নিশ্চিত হবে যে, কাগজের টাকার কোনো অর্থই থাকবে না।
তবে পুরো সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ ছিল মাস্কের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যদ্বাণী। বহু বছর যুক্তরাজ্যে না গেলেও সম্প্রতি দেশটির অভিবাসন ও বর্ণবাদ সম্পর্কিত রাজনীতি নিয়ে কড়া মন্তব্য করছেন মাস্ক।
তার দাবি, আগামী ২০ বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্য এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
ইসলামবিদ্বেষী কি না এমন প্রশ্নে ক্ষিপ্ত হয়ে মাস্ক উল্টো সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীকে বলেছেন, এমন প্রশ্ন ডনাল্ড ট্রাম্পের ব্যবহৃত পথচ্যুতির কৌশলকেই মনে করিয়ে দেয়।
“আমি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে। পশ্চিমে আমাদের প্রচলিত মূল্যবোধের পরিপন্থী যে কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী আমি। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আপনাদের মতো প্রথাগত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তা স্বীকার করতে চায় না।”
সাক্ষাৎকারের সঙ্গে প্রকাশিত বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধে ইকোনমিস্ট বলেছে, মাস্ক একজন চরম বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।
সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, “এক্স-এ তার ২৪ কোটি অনুসারীর কাছে ছড়ানো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকের কাছে স্পষ্টভাষী মনে হলেও ইকোনমিস্টসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে তা স্পষ্টতই অন্ধ গোঁড়ামি।
“তবে তিনি সেই অল্প কয়েকজন ব্যক্তির একজন, যারা এআই প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এর গতিপথের ওপর বড় প্রভাব রাখছেন। মহাকাশে তার প্রস্তাবিত ডেটাসেন্টার এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরেও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, রকেট বা স্যাটেলাইট যোগাযোগের মতো প্রযুক্তিতে তার সাফল্য অন্য প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।”
ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মাস্ক, যেখানে তার স্টারলিংক স্যাটেলাইট রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সাহায্য করে আসছে। এরপরও মাস্কের ধারণা, যে কোনো শান্তি চুক্তিতে রাশিয়ার জন্য ভূখণ্ডগত সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
সাক্ষাৎকারের শেষে মাস্ক এআই ও মহাকাশ গবেষণা নিয়ে নিজের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ২০২৪ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ২০২৮ সালের মধ্যেই মানুষ মঙ্গলে পা রাখবে।
মাস্কের ধারণা পুরো মহাবিশ্ব হয়ত অন্য গ্রহের কোনো এলিয়েন বা প্রাণীর তৈরি এক কম্পিউটার সিমুলেশন।
“আমি যেসব কাজ করছি তা এতটাই অবিশ্বাস্য যে এগুলো সত্যিই ঘটছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন।”