Published : 11 Oct 2025, 11:53 AM
প্রথমবারের মতো নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এক বিশাল তারার বিস্ফোরণের ঠিক আগ মুহূর্তের স্পষ্ট ছবি তোলার দাবি করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
তারা বলেছেন, তারার এমন দুর্লভ মুহূর্ত আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি।
ধূলার ঘন আবরণের আড়ালে থাকা তারার এ আবিষ্কারটি থেকে হয়ত ব্যাখ্যা মিলতে পারে কেন অনেক বছর ধরে বড় বড় লাল সুপারজায়ান্ট তারা খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। কারণ এসব তারা সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বেশিরভাগ সময়ই যেন এরা ‘অদৃশ্য’ হয়ে যায়।
আবিষ্কারটি করেছেন ‘নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সি’টির একদল বিজ্ঞানী। এর থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, এসব তারা আসলে ‘অদৃশ্য’ বা হারিয়ে যায়নি। এরা কেবল ঘন ধূলার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে। এজন্য এদের দেখা যায় না।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড আলো ধূলার মধ্যে দিয়েও পেরিয়ে যেতে পারে। টেলিস্কোপটির এ সক্ষমতার কারণে এখন এসব তারাকে এদের ‘জীবনের’ শেষ মুহূর্তে কেমন হয় সেটি দেখতে পারছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
‘এসএন২০২৫পিএইচটি’ নামের এক সুপারনোভা নিয়ে গবেষণা করেছে গবেষণা দলটি। সুপারনোভাটি প্রথম ২০২৫ সালের ২৯ জুন দেখা গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
এ বিস্ফোরণ ঘটেছিল ‘এনজিসি ১৬৩৭’ নামের ছায়াপথ থেকে, যা পৃথিবী থেকে প্রায় চার কোটি আলোবর্ষ দূরে অবস্থিত। জেমস টেলিস্কোপের ছবি ও পুরানো হাবল স্পেস টেলিস্কোপের ছবির সঙ্গে তুলনা করে বিস্ফোরিত এই তারাটি শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার ফলাফল অসাধারণ ছিল উল্লেখ করে গবেষকরা বলেছেন, ‘জীবনের’ শেষ বেলায় থাকা তারাটি ছিল খুবই উজ্জ্বল, যা সূর্যের থেকে প্রায় এক লাখ গুণ বেশি আলো ছড়াচ্ছিল। এর সঙ্গে ছিল গভীর লাল রঙেরও আভাও। এ অদ্ভুত রঙের কারণ ছিল এর আশপাশে থাকা ধূলার ঘন আবরণ।
তারাটি আসলে অনেক বেশি উজ্জ্বল ছিল, তবে এর আশপাশে থাকা ধূলার কারণে আসল উজ্জ্বলতার চেয়ে এটি একশ ভাগের এক ভাগ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। লাল রঙের আলোরতুলনায় নীল রঙের আলোকে চেয়ে বেশি আটকে দেয় ধূলা। ফলে তারাকে লাল রঙের দেখা দিয়েছে। এ কারণে তারাটিকে ‘এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে লাল আর ধূলায় ঢাকা সুপারজায়ান্ট বিস্ফোরিত তারা’ বলে বর্ণনা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় তারাগুলোর অন্যতম এসব লাল সুপারজায়ান্ট তারা। এরা যখন ‘জীবনের’ শেষ পর্যায়ে পৌঁছায় তখন এদের কেন্দ্র বিশাল আকারের বিস্ফোরণ ঘটায়, যা টাইপ টু সুপারনোভা নামে পরিচিত।
এ বিস্ফোরণের ফলে নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাক হোলের মতো ঘণ বস্তু তৈরি হয়। এ ধরনের তারার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি ওরিয়নের কাঁধে থাকা বিখ্যাত লাল তারা ‘বেটেলজিউস’।
তবে বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, বড় বড় লাল সুপারজায়ান্ট তারায় সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে সেসব তারা অনেক সময় দেখা যায় না, যা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় এক ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন ওয়েব টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ সেইসব রহস্যের ‘হারানো’ অংশ তুলে ধরেছে। অনেক বড় বড় লাল সুপারজায়ান্ট তারা এদের শেষ বছরগুলোতে এত ঘন ধূলার আবরণ তৈরি করে যে, দৃশ্যমান আলোর ওপর নির্ভরশীল টেলিস্কোপের কাছে এরা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
‘এসএন২০২৫পিএইচটি’-এর ক্ষেত্রে ধূলা কেবল ঘন ছিল না, বরং অদ্ভুত ধরনেরও ছিল। সাধারণত লাল সুপারজায়ান্ট তারা অক্সিজেনওয়ালা ধূলা তৈরি করে। তবে এ তারার ধূলা ছিল কার্বনওয়ালা।
এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, তারাটির শেষ সময় এর ভেতরের শক্তিশালী বিভিন্ন প্রবাহ গভীর স্তর থেকে কার্বনকে তুলে এনে এর পৃষ্ঠে ছড়িয়ে দিয়েছিল, যার ফলে তারা থেকে বের হওয়া ধূলার রসায়ন পরিবর্তিত হয়ে কার্বনে ভরপুর হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, এ আবিষ্কারটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রথম জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ সরাসরি সেই তারাকে শনাক্ত করেছে যা সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও অনেক নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দিয়েছে এ আবিষ্কার।
ওয়েব টেলিস্কোপের নিয়ার ও মিড-ইনফ্রারেড আলোতে দেখতে পারার সক্ষমতা ধূলার মধ্য দিয়ে চোখ বুলিয়ে যেতে পারে। ফলে আগে যেসব তারা ধূলার আড়ালে ঢাকা থাকার কারণে দেখা যেত না তা এখন স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হচ্ছে।