Published : 13 Jun 2026, 01:54 PM
মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ও ‘ভুতুড়ে’ পারমাণবিক কণা নিউট্রিনোর রহস্য উন্মোচনে বড় সাফল্য পাওয়ার দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের কাইপিং শহরের কাছে এক পাহাড়ের নিচে মাটির প্রায় ২ হাজার ১৩০ ফুট গভীরে অবস্থিত আধুনিক ‘জিয়াংমেন আন্ডারগ্রাউন্ড নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ বা জুনো নামের গবেষণাগার রয়েছে। এখান থেকে প্রথমবারের মতো এ কণার নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের এ যাবৎকালের সবচেয়ে নিখুঁত পরিমাপ প্রকাশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রাপ্ত এ নতুন তথ্য মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য, ডার্ক ম্যাটার ও পদার্থের উৎস বোঝার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা তাদের এ আবিষ্কারের বিস্তারিত তথ্য বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ প্রকাশ করেছেন।
গেল বছর এ ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্রটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর এর প্রাথমিক কার্যকালের প্রথম ৫৯ দিন, অর্থাৎ ২৬ অগাস্ট থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এ গবেষণাটি করা হয়েছে।
বেইজিংয়ে অবস্থিত চাইনিজ ‘অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর ‘ইনস্টিটিউট অফ হাই এনার্জি ফিজিক্স’-এর পদার্থবিদ ও ‘জুনো কোলাবোরেশন’-এর মুখপাত্র ইফাং ওয়াং বলেছেন, “বিষয়টি কেবল এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয় যে প্রাপ্ত সংখ্যা বা বিভিন্ন পরিমাপ নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যার জন্য দরকারী, বরং গবেষণাটি নতুন ও বড় পরিসরের ডিটেক্টর হিসেবে জুনো’র দারুণ কার্যক্ষমতাকেও প্রমাণ করেছে।
“এ গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছে।”
আমেরিকার ‘ডিপ আন্ডারগ্রাউন্ড নিউট্রিনো এক্সপেরিমেন্ট’ বা ডুন ও জাপানের ‘হাইপার-কামিওকান্দ’-এ পরীক্ষার পাশাপাশি ‘জুনো’ও এমন তিনটি বড় ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পের একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা আগামী দশকগুলোতে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
ওয়াং বলেছেন, “মহাবিশ্বের একবারে মৌলিক কণা নিউট্রিনো ও পুরো মহাবিশ্বে এগুলো বিপুল পরিমাণে ছড়িয়ে রয়েছে, অথচ বিজ্ঞানীদের কাছে এগুলো এখনও সবচেয়ে কম বোঝা বা রহস্যময় কণাগুলোর একটি হয়ে আছে।”
নিউট্রিনোগুলো যে কোনো কিছুর ভেতর দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারে এবং সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এদের কোনো মিথস্ক্রিয়া বা সংঘাত হয় না বললেই চলে। বাস্তবে, প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো অজান্তেই মানুষের দেহের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করছে।
সূর্যের কেন্দ্রস্থল ও সুপারনোভা বিস্ফোরিত তারার মতো চরম জায়গাগুলোতে তৈরি হওয়া এসব নিউট্রিনো তিন ধরনে পাওয়া যায়। ভ্রমণের সময় এগুলো এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হতে পারে, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ‘অসিলেশন’ বা দোলন।
বিভিন্ন ধরনের নিউট্রিনোর ভরের মধ্যে যে তারতম্য বা অনুক্রম তা ‘মাস অর্ডারিং’ নামে পরিচিত, যা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও বড় অনুত্তরিত প্রশ্ন।
এ বিষয়ে ওয়াং বলেছেন, “জুনো’র প্রধান লক্ষ্য নিউট্রিনোর এ ‘মাস অর্ডারিং’ বা ভরের অনুক্রমটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা। আমরা জানি, নিউট্রিনোর ভর আছে তবে এদের মধ্যে কোনটির ভর সবচেয়ে কম আর কোনটির ভর সবচেয়ে বেশি তা আমরা এখনও জানি না।
“আমাদের এ প্রথম ফলাফলটি এখনই নিউট্রিনোর ভরের অনুক্রম বা ‘মাস অর্ডারিং’ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে ফেলেনি। এখন পর্যন্ত আমাদের অর্জন হচ্ছে, বাস্তব তথ্যের সাহায্যে আমাদের শনাক্তকারী যন্ত্র ও তথ্য বিশ্লেষণের নির্ভুলতাকে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।”
ওয়াং বলেছেন, জুনো নিউট্রিনো দোলনের মোট ছয়টি মৌলিক প্যারামিটারের মধ্যে দুটির ক্ষেত্রে এ যাবৎকালের সবচেয়ে নিখুঁত পরিমাপ করতে পেরেছে, যা আগের যে কোনো রেকর্ডের তুলনায় প্রায় ১.৬ গুণ নির্ভুল।
সাধারণ পদার্থের প্রতিটি কণারই একটি করে বিপরীত কণা বা ‘অ্যান্টিপার্টিকেল’ থাকে, যেটির ভর মূল কণার সমান হলেও এর বৈদ্যুতিক চার্জ বা আধান হয় সম্পূর্ণ বিপরীত, তা পজিটিভ, নেগেটিভ বা নিউট্রিনোর মতো নিরপেক্ষ হতে পারে।
সেই হিসাবে, প্রতিটি নিউট্রিনোরও একটি করে সংশ্লিষ্ট ‘অ্যান্টিনিউট্রিনো’ রয়েছে। জুনো পরীক্ষার প্রধান কৌশলটি হচ্ছে, ডিটেক্টর থেকে প্রায় ৫২.৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইয়াংজিয়াং ও তাইশান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত হওয়া বিভিন্ন অ্যান্টিনিউট্রিনোকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিউট্রিনো দোলন পরিমাপ করা।
আর জুনোর নিখুঁতভাবে মেপে ফেলা ওই দুটি প্যারামিটার অ্যান্টিনিউট্রিনোর আচরণের সঙ্গেই সম্পর্কিত ছিল।
জুনো ডিটেক্টরটি বড় এক গোলাকার ট্যাংক, যা ২০ হাজার টন জৈব তরলে পূর্ণ। সম্পূর্ণ অন্ধকার এই পরিবেশে যখন এ তরলের ভেতর দিয়ে অ্যান্টিনিউট্রিনোসহ অন্যান্য কণা যায়, তখন সেখান থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়।
নিউট্রিনো হচ্ছে একবারে প্রাথমিক বা মৌলিক কণা, যার অর্থ এগুলোর আর কোনো ছোট উপাদান নেই; আর এ বৈশিষ্ট্যই এদের মহাবিশ্ব গঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান বা ‘বিল্ডিং ব্লক’ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
যেহেতু নিউট্রিনোর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই ফলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রও এদের গতিপথে কোনো বাধা তৈরি করতে পারে না। ফলে, মহাকাশে ভ্রমণের সময় বিভিন্ন নিউট্রিনো তারা, গ্রহ বা অন্য যে কোনো পদার্থের ভেতর দিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই অনায়াসে চলে যেতে পারে।
যেহেতু নিউট্রিনোগুলো কোনো বাধা ছাড়াই চলাচল করতে পারে ফলে বিজ্ঞানীরা এদের গতিপথ অনুসরণ করে সরাসরি এদের উৎপত্তিস্থল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। এর মাধ্যমেই মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও শক্তিওয়ালা বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা সম্ভব।
মহাবিশ্বে সাধারণ পদার্থের উৎপত্তি কীভাবে হল এবং এর বিপরীত উপাদান ‘অ্যান্টিম্যাটার’ বা প্রতিকণার তুলনায় কেন পদার্থের পরিমাণ এত বেশি তা বোঝার মূল চাবিকাঠি হতে পারে এই নিউট্রিনো।
এ ছাড়া ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি ও সুপারনোভার অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালী বোঝার ক্ষেত্রেও নিউট্রিনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ওয়াং বলেছেন, জুনো গবেষণাগারটি সূর্য, পৃথিবী, বায়ুমণ্ডল ও সম্ভবত ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া কোনো সুপারনোভা থেকে নির্গত হওয়া নিউট্রিনোগুলো নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা ও গবেষণা করবে।
“প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ নিউট্রিনো পৃথিবীর বুক চিরে চলে যাচ্ছে। তবে এদের মধ্যে খুব সামান্য অংশই সাধারণ পদার্থের সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়। ঠিক এ কারণেই জুনো’র মতো পরীক্ষাগুলোর জন্য মাটির গভীর তলদেশে বড় আকারের ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র বসানো, সতর্ক সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদে এর স্থিতিশীল কার্যক্রম ধরে রাখা প্রয়োজন।”
৩০ কোটি ডলারেরও বেশি ব্যয়ে নির্মিত জুনো প্রকল্পটি একটি যৌথ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রয়াস। জুনো, ডুন ও হাইপার-কামিওকান্দে এ তিনটি প্রকল্প আসলে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
ওয়ায় বলেছেন, “তারা প্রত্যেকে আলাদা প্রযুক্তি ও ভিন্ন ভিন্ন নিউট্রিনো উৎস ব্যবহার করছে, যার ফলে নিউট্রিনো পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর একেকটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাওয়া সম্ভব। সব মিলিয়ে, এসব প্রকল্প যৌথভাবে নিউট্রিনোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের আরও ব্যাপক, গভীর ও সুদৃঢ় ধারণা দেবে।”