Published : 25 Jun 2026, 02:46 PM
আমাদের সৌরজগতে প্রবেশ করেছে এ যাবৎকালে দেখা প্রাচীনতম এক আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক হাজার কোটি বছর আগে তৈরি হওয়া ‘৩আই/অ্যাটলাস’ নামের ধূমকেতুটির রাসায়নিক গঠন আমাদের সৌরজগতের যে কোনো বস্তুর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্ব তৈরির আদিম যুগের উপাদান বুকে নিয়ে কোটি কোটি কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এ ধূমকেতুটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সামনে মহাকাশ গবেষণার এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুটি নিয়ে গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাইরে থেকে আমাদের সৌরজগতে আসা এ অতিথিটি বিস্ময়কর রকমের প্রাচীন। প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি বছর আগে এক আদিম গ্রহীয় সিস্টেমে এর জন্ম হয়েছিল।
গবেষকরা বলেছেন, সৌরজগতে এ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া তৃতীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু এ ধুমকেতু, যার রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে ধূমকেতুটি যে গ্রহীয় সিস্টেমে তৈরি হয়েছিল সেখানকার ভৌত ও রাসায়নিক অবস্থা কেমন ছিল সে সম্পর্কে ধারণা মিলেছে।
সোমবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অবস্থিত নাসার ‘গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার’-এর গ্রহ বিজ্ঞানী ও জ্যোতিঃরসায়নবিদ মার্টিন কর্ডিনার বলেছেন, প্রায় ২.৬ কিলোমিটার ব্যাসের এ ধূমকেতুটি সম্ভবত আমাদের সৌরজগতে প্রবেশ করা এ যাবৎকালের সবচেয়ে প্রাচীন বস্তু।
গবেষকরা বলছেন, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী ও আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য বস্তু যে পরিবেশে তৈরি হয়েছিল নতুন ধূমকেতুটি তার চেয়ে বেশি শীতল পরিবেশে প্রায় মাইনাস ৪০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় জন্মেছিল। কোনো এক অজানা কারণে নিজস্ব গ্রহীয় সিস্টেম থেকে ছিটকে যাওয়ার পর তা মহাবিশ্বের অনেক দূরত্ব পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে।
গবেষক কর্ডিনার বলেছেন, “আমরা এর আগে কখনোই এ ধূমকেতুর মতো কোনো বস্তু দেখিনি।”
গবেষকরা জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ধূমকেতুর হাইড্রোজেন ও কার্বনের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের আইসোটোপ বা একই উপাদানের ভিন্ন রূপের অনুপাত পরিমাপ করেছেন।
এর হাইড্রোজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ ধূমকেতুটি যে পরিবেশে তৈরি হয়েছিল, সেখানকার তাপমাত্রা ও বিকিরণ সম্পর্কে প্রমাণ দিয়েছে।
অন্যদিকে, এর কার্বন আইসোটোপের অনুপাত থেকে সেই আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস মেঘের গঠন সম্পর্কে ধারণা মিলেছে, যা থেকে এ ধূমকেতু ও এর নিজস্ব গ্রহীয় সিস্টেমের জন্ম হয়েছিল।
এ ধূমকেতুর পানিতে আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য ধূমকেতুর তুলনায় প্রায় ৩০ গুণ বেশি ‘ডিউটেরিয়াম’ বা হাইড্রোজেনের ভারী আইসোটোপ মিলেছে।
এ ছাড়া এর কার্বন আইসোটোপের অনুপাত আমাদের সৌরজগতের কোনো বস্তু, আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘ বা কাছাকাছি থাকা কোনো নতুন তারার আশপাশে গ্রহ গঠনকারী উপাদানের বিভিন্ন চাকতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গবেষক কর্ডিনার বলেছেন, নতুন ধূমকেতুটি সম্ভবত অন্য কোনো তারাকে কেন্দ্র করে গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়ার সময় অবশিষ্ট থেকে যাওয়া ভাঙা অংশ বা টুকরা।
“জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, ধূমকেতুটি যে তারা ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছিল সেখানকার গ্রহ গঠনকারী পরিবেশ আমাদের সৌরজগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যা সম্ভবত আরও বেশি শীতল ও কম ধাতব উপাদানে সমৃদ্ধ ছিল। একইসঙ্গে সেখানে অতিবেগুনি রশ্মি ও মহাজাগতিক রশ্মির বিকিরণ অনেক তীব্র ছিল।”
‘প্রাণের উপাদান’
শীতল ও দূরবর্তী পরিবেশে জন্ম হলেও ধূমকেতুটি কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও সালফারওয়ালা জৈব অণুতে সমৃদ্ধ।
বিজ্ঞানী কর্ডিনার বলেছেন, “এর থেকে প্রমাণ মেলে, শীতল ও দূরবর্তী উৎস হওয়ার পরও আমাদের পরিচিত প্রাণের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্বায়ী বিভিন্ন উপাদান সেই সুদূরের গ্রহ গঠনকারী চাকতিতে অনেক পরিমাণে উপস্থিত ছিল।”
এর কার্বনের গঠন থেকে বোঝা যায়, ধূমকেতুটি আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি বছর আগে এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছিল যে সময় মহাবিশ্বের ওই অঞ্চলে তীব্র গতিতে তারা তৈরি হচ্ছিল।
প্রায় ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে আমাদের মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছিল। যার মানে, ধূমকেতুটি এমন এক সময়ের বস্তু যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল এর বর্তমান বয়সের কেবল ১৩ শতাংশ।
গবেষকদের ধারণা, ধূমকেতুটির জন্ম আমাদের ছায়াপথ, অর্থাৎ মিল্কি ওয়েতেই হয়েছিল। তবে এর বয়স বিবেচনায় ধূমকেতুটি অন্য কোনো ছায়াপথ থেকে আসার সম্ভাবনাকেও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কর্ডিনার বলেছেন, “আমি ভেবেছিলাম ছায়াপথগুলোর মধ্যকার দূরত্ব হয়ত অনেক বেশি। তবে বাস্তবে দ্রুতগতির আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তুর পক্ষে আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ছায়াপথ ‘ম্যাজেলানিক ক্লাউডস’ থেকে কেবল ১০০ কোটি বছরেই এখানে চলে আসা সম্ভব।”
কোনো গ্রহের মহাকর্ষীয় টানের কারণে ধূমকেতুটি হয়ত এর নিজস্ব গ্রহীয় সিস্টেম থেকে ছিটকে পড়েছিল। তবে কোনো ধরনের সংঘর্ষের ফলেও এমনটা ঘটে থাকতে পারে।
এর আগে, আমাদের সৌরজগতে ঘুরে যাওয়া দুটি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু শনাক্ত হয়েছিল। ধূমকেতু দুটির নাম যথাক্রমে ২০১৭ সালে আবিষ্কৃত ‘১আই/ওউমুয়ামুয়া’ ও ২০১৯ সালে আবিষ্কৃত ‘২আই/বোরিসভ’।
বর্তমানে শনি গ্রহের কক্ষপথের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে নতুন ধূমকেতুটি। ধারণা, করা হচ্ছে, ২০২৯ সালে বামন গ্রহ প্লুটোর কক্ষপথ অতিক্রম এবং ২০৩৫ সালের দিকে আমাদের সৌরজগতের বাইরের সীমানা ছাড়িয়ে চলে যাবে ধূমকেতুটি।
ভিনগ্রহের মহাকাশযান বা এলিয়েন স্পেসক্রাফট হতে পারে বলে গেল বছর খুব জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছিল এ ধূমকেতু নিয়ে। তবে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, ধূমকেতুটি প্রাকৃতিক এক বস্তু।
গবেষক কর্ডিনার বলেছেন, কর্ডিনার “একজন ভালো বিজ্ঞানী সবসময়ই নিজের উপলব্ধিকে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে আপডেটের জন্য প্রস্তুত থাকেন। তবে আমরা প্রতিটি অনুমানের সপক্ষে থাকা বিভিন্ন প্রমাণকে খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করি।
“এ বস্তুটির ক্ষেত্রে একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকেই প্রমাণ স্পষ্ট ছিল যে, আমরা ধূমকেতুর মতো বস্তুই দেখছি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ আমাদের সেই ধারণাকেই নিশ্চিত করেছে।”