Published : 27 Jun 2026, 11:32 PM
ইতালির রাজধানীতে শিশু কন্যাসহ বাংলাদেশি দম্পতি খুনের ঘটনায় এক সন্দেহভাজনের ছবি প্রকাশ করেছে রোম প্রসিকিউটর কার্যালয়।
সেই ব্যক্তিও বাংলাদেশি। তার নাম মো. শাহাদাত হোসেন।
প্রসিকিউটর কার্যালয় শাহাদাত নামের যে যুবকের ছবি প্রকাশ করেছে তা দেখে তাকে শনাক্ত করেছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনরা।
শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল আহাদের ছেলে। তিনি একসময় উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব ছিলেন। তার সঙ্গে নিহত দম্পতির আগে থেকেই চেনাজানা ছিল।
ইতালির আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের একটি পার্কসংলগ্ন এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন- নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাঁকড়া বিজয়নগর এলাকার বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আরিশা।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের ছেলে অয়ন (১৮); যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এই খবর কোম্পানীগঞ্জে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা বিলাপ করছিলেন। তারা বলছিলেন, কামাল ও শাহাদাত একসময় বন্ধু ছিলেন। কামালের পরিবারে একসময় শাহাদাতের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।
নিহত কামালের চাচাত ভাই ও একই বাড়ির বাসিন্দা সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, “একসময় কামাল একাই ইতালিতে থাকতেন। তার পরিবার বাংলাদেশে কোম্পানিগঞ্জের বাড়িতে থাকতেন। এই সময় শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এটা নিয়ে তখন এলাকায় বিচার-শালিসও বসে। এরপর দুই বছর আগে কামাল তার স্ত্রী ও পরিবারকে ইতালিতে নিয়ে যায়।”
তিনি বলেন, ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের সময় কামাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দুই মাসের ছুটি নিয়ে কোম্পানিগঞ্জে আসেন। তখন তার বাড়িতে একটি উড়ো চিঠি আসে। সেই চিঠিতে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা-পয়সা দাবি করা হয়। আর দাবি পূরণ না হলে গৃহকর্তার প্রবাসী ছেলে ও নাতিকে হত্যার পাশাপাশি পরিবারের নারী সদস্যদের নির্যাতনের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। পরিবার বিষয়টি থানাকেও জানিয়েছিল। হুমকির মুখে তারা ২৬ দিনের মাথায় ইতালিতে ফিরে যান।
অন্যদিকে, শাহাদাত হোসেন প্রায় চার বছর আগে তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে তার স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। বছরখানেক আগে হয়ত তিনি ইতালিতে যান। শাহাদাতের ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে কামালের স্ত্রী সহযোগিতা করেন বলেও দাবি করেন সাজ্জাদ মাহমুদ।
একই ধরনের দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারের স্বজন অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস সুমন। তিনি দাবি করেন, “দেশে থাকাকালীন শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে কামাল ভাইয়ে স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বিষয়টি নিয়ে পারিবারিক অশান্তির কারণে বছর দুই আগে কামাল তার স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান।
“ইতালি যাওয়ার পর কামাল ভাই শাহাদাতকে তার বাড়ির আশপাশে না যেতে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সে কোনো বাধাই শুনেনি।”

ইউনুস সুমন বলেন, “হত্যাকান্ডের পর শাহাদাদের ফেসবুক পোস্টই বলে দেয় যে, সে এ নির্মম হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করেছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এর বিচার চাই।”
ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত তার ফেইসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।”
নিহত কামাল উদ্দিনের বাবা সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, এ হত্যাকাণ্ডে কামালের পরিচিত ও একই গ্রামের প্রবাসী শাহাদাত জড়িত।
সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনের চরকাঁকড়া বিজয়নগর এলাকার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তার মা ও ছোট ভাইয়ের পরিবার রয়েছেন। তবে তাদের দাবি, চার বছর ধরে শাহাদাতের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
শাহাদাতের বড় ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, “চার বছর আগে শাহাদাত সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। আমি দুই মাস আগে দেশে এসেছি, এই সময়ের মধ্যেও তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।”

ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার রাতে পার্ক এলাকা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মাহমুদুর রহমান রিপন বলেন, “বিষয়টি আমি ফেইসবুকে দেখেছি। এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই।”
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামসুদ্দিন হায়দার বলেন, “শাহাদাত হোসেন চার বছর আগে যুক্তরাজ্য যাওয়ার পর থেকে দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. নুরুল হাকিম বলেন, “উড়ো চিঠিতে হুমকির বিষয়টি ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।”
আরও পড়ুন:
ইতালিতে স্বামী-স্ত্রী-মেয়ে খুন: নোয়াখালীর বাড়িতে উড়ো চিঠিতে এসেছিল হত্যার হুমকি