কেএনএফের সঙ্গে সংলাপ সম্ভব নয়: শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি

“সাম্প্রতিক ঘটনায় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি তীব্রভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। এসব ঘটনায় চলমান সকল ধরনের প্রচেষ্টা পদানত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।”

বান্দরবান প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 4 April 2024, 10:56 AM
Updated : 4 April 2024, 10:56 AM

দুই দিনে বান্দরবানের তিন ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনায় কেএনএফের নাম আসায়, সশস্ত্র এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া আর ‘সম্ভব নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের নিয়ে গঠিত শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির আহ্বায়ক ক্য শৈ হ্লা মারমা।

বৃহস্পতিবার জেলা পরিষদের সম্মেলনে কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “কমিটি মনে করে, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে কেএনএফ শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সঙ্গে সংলাপ করার সকল ধরনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।”

কেএনএফের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে পাহাড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়লে ২০২৩ সালের ৩০ মে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি গঠিত হয়। ওই বছরের জুলাই ও অগাস্টে কমিটির সঙ্গে কেএনএফের দুইবার ভার্চুয়াল আলোচনাও হয়।

পরে ৫ নভেম্বর রুমা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মুনলাই পাড়ায় প্রথমবারের মত কেএনএফের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সরাসরি দুটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে প্রথমবারের মত প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

‘শান্তি আলোচনা’ শুরুর পর পাহাড়ে হত্যা-সহিংসতা থেকে মুক্তির আশা জাগতে শুরু করেছিল পাহাড়ের মানুষের মনে। এরইমধ্যে মঙ্গল ও বুধবার বান্দরবানের রুমা এবং থানচি উপজেলার কৃষি ও সোনালী ব্যাংকের তিনটি শাখায় হামলা চালায় সশস্ত্র লোকজন।

তারা ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধর করে এবং এক ব্যাংক ব্যবস্থাপককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। লুট করে বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি।

রুমায় সোনালী ব্যাংকে হামলা-ডাকাতি এবং ব্যবস্থাপক নেজাম উদ্দিনকে অপহরণের ঘটনাটি মঙ্গলবার রাতে প্রথম ভাগে ঘটলেও; থানচিতে কৃষি ও সোনালী ব্যাংকে হামলা হয়েছে ভরদুপুরে।

দুটি ঘটনাতেই পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ এর নাম এসেছে; যারা পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিত। এ ঘটনার কেএনএফের সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও জানিয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন ডাকে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। এ কমিটির আহ্বায়ক, বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা মারমা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান।

তিনি বলেন, “অতি সাম্প্রতিক ঘটনায় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি তীব্রভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। এসব ঘটনায় চলমান সকল ধরনের প্রচেষ্টা পদানত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।”

কেএনএফ সংলাপ করার পথ ‘বন্ধ করে দিয়েছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আগামীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির পক্ষে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

ব্যাংকে হামলা ও অপহরণের ঘটনায় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির পক্ষ থেকে নিন্দাও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

কমিটির আহ্বায়ক বলেন, সশস্ত্র সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য গত বছর ২৯ মে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি উপস্থিতে অরুণ সারকি টাউন হলে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। পরে জুন মাসে বিভিন্ন জাতিসত্তার সমন্বয়ে ১৮ সদস্য বিশিষ্ট শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি গঠন করা হয়।

শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি ও কেএনএফের মধ্যে কয়েক দফা ভার্চুয়াল মিটিং হয়। সবার মতামতের ভিত্তিতে সরাসরি সংলাপে বসার সুযোগ হয়। গত বছর ৫ নভেম্বর এবং এ বছর মার্চে সরাসরি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

উভয় সংলাপে কেএনএফ সকল ধরনের সশস্ত্র কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা ও অন্যান্য বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারকে সই করে বলে জানান ক্য শৈ হ্লা মারমা।

কিন্তু তারা চুক্তি ভঙ্গ করে সশস্ত্র কার্যক্রম অব্যাহত রাখে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “কমিটির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বারবার অবগত করা হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। বিভিন্ন সময় স্থানীয়দের ওপর হামলা, অপহরণ ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যায় তারা।"

সংবাদ সম্মেলনে শান্তি প্রতিষ্ঠার কমিটি মুখপাত্র ও জেলা পরিষদের সদস্য কাঞ্চনজয় তঞ্চঙ্গ্যা, শান্তি প্রতিষ্ঠার কমিটির সচিব ও বম সোশাল কাউন্সিলের সভাপতি জারলমময় বম এবং কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে অপহৃত রুমা শাখার সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনের এখনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে রুমা ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) দিদারুল আলম জানিয়েছেন।

সোনালী ব্যাংক বান্দরবান শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ওসমান গণি সাংবাদিকদের বলেন, “নিরাপত্তাজনিত কারণে সোনালী ব্যাংকের রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি শাখার সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে অন্যান্য উপজেলার শাখার কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।”

কারা এই কুকি চিন

২০২২ সালের শুরুর দিকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র সংগঠনের কথা সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়। বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, খুমি ও ম্রোদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও সেখানে বম জনগোষ্ঠীর কিছু সংখ্যক লোকজন রয়েছে। যার কারণে সংগঠনটি পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামে পরিচিতি পায়।

কেএনএফের ফেইসবুক পেইজে তারা জানায়, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাইছড়ি বিলাইছড়ি ও বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদমসহ নয়টি উপজেলা নিয়ে ‘কুকি-চিন রাজ্য’ হিসেবে গঠন করা হবে।

পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে আতঙ্কে সেই সময় ভারতের মিজোরামে পালিয়ে আশ্রয় নেয় পাঁচ শতাধিক বম নারী-পুরুষ।

সশস্ত্র সংগঠনটি অর্থের বিনিময়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে ২০২২ সালে অক্টোবর মাসে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে জানায় র‌্যাব।

পুরনো খবর:

Also Read: দুই দিনে ৩ ব্যাংকে ডাকাতি: পাহাড়ে ফের ‘বম পার্টি’ আতঙ্ক

Also Read: রুমায় ব্যাংক ডাকাতি: ‘লড়বি না, লড়লেই গুলি করে দেব’

Also Read: থানচিতে রাস্তাঘাট ফাঁকা, বন্ধ দোকানপাট

Also Read: এবার ভরদুপুরে থানচির দুই ব্যাংকে ডাকাতি

Also Read: ব্যাংক ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা: আইজিপি

Also Read: ব্যাংক ম্যানেজার নেজামকে তারাবির নামাজ থেকে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্ররা

Also Read: রুমায় ব্যাংক লুট: সন্ধান মেলেনি ‘অপহৃত’ ব্যবস্থাপকের

Also Read: রুমায় ব্যাংক ডাকাতি, সন্দেহে ‘বম পার্টি’

Also Read: রুমায় ব্যাংকে হামলা, টাকা লুট, ম্যানেজারকে ‘অপহরণ’