Published : 01 May 2026, 07:01 PM
সুনামগঞ্জের বেশ কিছু হাওরে এখন বোরো ধান পানির নিচে; উপরের থইথই করছে পানি। সেই ধান আর উঠানোর উপায় নেই বলে মানছে কৃষক ও কৃষি বিভাগ।
কৃষক টানা বৃষ্টির আগে গত সপ্তাহের শুরুর দিকে বেশ কিছু কাঁচা-পাকা ধান করেছিলেন। কিন্তু তারপরই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় সেই ধান আর শুকাতে পারেননি।
ক্ষেত থেকে কেটে খলায় রাখা ধানও সেখানেই বৃষ্টিতে ভিজেছে। যে অল্প পরিমাণ ধান কৃষক পরিবহন করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন তাতে চারা গজাচ্ছে। ফলে এগুলো আর খাদ্য উপযোগী থাকছে না।
বাধ্য হয়ে হাওরে অনেক কৃষক এখন কাঁচা ধানই সিদ্ধ করছেন; যদি কিছুটা খোরাকি পাওয়া যায়।
এই অবস্থায় জেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন ধানের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা কৃষকদেরকে পানির তলের ধান কেটে বাড়িতে উঁচু স্থানে রাখার পরামর্শ দিচ্ছি। যেহেতু টানা বৃষ্টিতে বন্যার আশঙ্কা আছে তাই খলায় ধান রাখা যাবে না।
“ঘরের ভিতর ফ্যান চালিয়ে রাখতে পারলে ধানের অঙ্কুরোদগম হবে না।”

কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তা পরামর্শ দিয়ে বলেন, যদি আশপাশে স্কুল বা এ ধরনের বড় জায়গা থাকে সেখানেও ভেজা ধান কিছুটা সময় নেড়ে রাখা যেতে পারে।
তবে কৃষি বিভাগের এ ধরনের পরামর্শ খুব একটা কাজে লাগাতে পারছে না কৃষক। কারণ, তারা বলছেন, ধান কেটে বাড়িতে এনে রাখার সুযোগ ও পরিবেশ নেই।
এই অবস্থার মধ্যে বৃহস্পতি ও শুক্রবার কৃষক কিছুটা রোদ পেয়েছে। এতে ধান খুব একটা কাটতে না পারলেও কিছুটা ধান শুকাতে পেরেছে কৃষক।
এতে ধানের পাশাপাশি কৃষক গোখাদ্য হিসেবে খড় পাবেন। কৃষকরা বলছেন, যেহেতু এবার ধান নষ্ট হয়ে গেছে ফলে গোখাদ্যের ব্যাপক সংকট দেখা দেবে।
সুনামগঞ্জের পাগনার হাওরের ফেনারবাক ইউনিয়নের রামপুর ও শরিফপুর এলাকায় দেখা গেছে, গ্রামের নারী-পুরুষ ভিজা ধান নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে সেই কাঁচা ধান সিদ্ধ দিচ্ছেন। যদিও হাওরের মানুষ সাধারণত সিদ্ধ চাল খান না। তারা আতপ চালেই অভ্যস্ত।
শুক্রবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গিয়ে দেখা যায়, দেখার হাওরের লাখাই ও শিয়ালমারা অংশ সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। তীরের জমিও এখন আর দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ করে যে অল্প-বিস্তর জমির ধান কেটেছেন তা শুকানোর জন্য আধা রোদে মেলে দিয়েছেন। তবে টানা রোদও নেই। আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন।
ইসলামপুর গ্রামের আশরাফুল ও তার মা নূরজাহান বেগম ভেজা ধান ত্রিপালে নাড়ছেন। পিছনেই শিয়ালমারা হাওরের জমিগুলো পানিতে সাদা হয়ে গেছে। আশরাফুলকে টুকরিতে ধান ভরে দিচ্ছেন তার ষাটোর্ধ্ব মা। মা ও ছেলে কাটা ধানগুলো নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছেন।

নূরজাহান বেগম বলেন, “আমার এক ছেলে, তিন মেয়ে ও দুই নাতি নিয়ে সংসার। কৃষির উপরই নির্ভরশীল। নিজের জমিজমা নেই। বর্গায় চাষ করেছিল। আট কেয়ার জমি চাষ করেছিলেন। রোপণ পর্যন্ত নিজের শ্রম বাদে খরচ হয়েছিল ৪০ হাজার। আট কেয়ারের মধ্যে ছয় কেয়ার পানিতে তলিয়ে গেছে। আর কাটার সম্ভাবনা নেই। যে দুই কেয়ার কেটেছিলেন তাও ভিজে নষ্ট হয়ে আছে।”
এখন হালকা রোদে শুকিয়ে সিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।
জামালগঞ্জের গজারিয়া গ্রামের এক কিষাণি বলেন, তিন ভাগের দুই ভাগ জমির ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। যা কাটা হয়েছিল তাও ভিজে, অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হওয়ার পথে। তাই বাধ্য হয়ে ভিজা ধানই এখন সিদ্ধ দেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগের মতে শুক্রবার পর্যন্ত ১৫ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমির ধান ডুবে নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষক ও হাওর বাঁচা আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের হিসাবের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।
যা অবশিষ্ট আছে তা আর তোলার মতো নয় বলে জানান হাওর বাঁচাও আন্দোলনের জেলা কমিটির সভাপতি ইয়াকুব বখত বহলুল। তিনি বলেন, এবার দুই দফা জলাবদ্ধতায় কৃষকের ধানের ক্ষতি হয়েছে। প্রথমে ধান পাকার আগে আর এখন পাকা ধান ডুবে গিয়ে। এই ক্ষতি কোনওভাবেই পোষানো সম্ভব নয়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহাদাত হোসেন বলেন, অঙ্কুর গজানো ধান থেকে চাল পাওয়া সম্ভব নয়। এটা প্রায় নষ্ট হয়ে যায়। এ থেকে চাল নয়, খুদকুড়ো পাওয়া যায়।
সদর উপজেলায় ৮০৫ হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন:
'আউরে আমার সব ধান ডুবি গ্যাছে, খোরাকির বুঝও নাই'
'ডোবরায়' ডুবছে পাকা ধান, 'নয়নভাগাতেও' মিলছে না শ্রমিক