Published : 30 Apr 2026, 11:24 PM
সুনামগঞ্জে টানা তিন-চার দিন ধরে প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের পর বৃহস্পতিবার রোদ দেখা গেছে। বিকালে সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক রইচ মিয়া বেরিয়েছিলেন শিয়ালমারা বিলে তার ডুবন্ত ধান উঁকি দিয়েছে কিনা দেখার জন্য।
তিনি বিষন্ন মুখ আর উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন হালুয়ারগাঁও-ইসলামপুর সড়কে হাওরের পাশে। দেখছিলেন, সামনে রাশি রাশি সাদা জল। ধানের কোনো শীষও দেখা যাচ্ছে না। তবে পানি একটু টান ধরেছে।
রইচ মিয়া ১৮ কিয়ার (এক কিয়ারে ৩০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। তার খরচ হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে মাত্র তিন কিয়ার জমির ধান কেটেছেন। বাকি ১৫ কিয়ার জমির ধান ডুবে আছে হাওরে। ডুবে যাওয়া ধান কাটতে পারবেন কিনা সেটা আন্দাজ করতেই হাওরের পাড়ে এসে বসেছিলেন তিনি।
কিন্তু কোনো আশা দেখতে পারছেন না এই কৃষক। আক্ষেপ করে বলছিলেন, “ইবার ফালগুন তনি বৃষ্টি শুরু অইছে। আউরে আর কত কুলাইতো। সব ফসল ডুবি গেছে। পানি নদীতে নামলে কিছু ধান কাডন যাইত। খোরাকির বুঝও নাই।”
এইবার কৃষক অর্ধেক ক্ষেতের ধানও কাটতে পারবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন রইচ মিয়া।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে প্রায় একই আশঙ্কা করছিলেন ওই এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও। তারা এটাও বলছিলেন, ধানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কৃষি অধিদপ্তর যে তথ্য দিচ্ছে তা বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরের নিম্নাঞ্চলের কাচা ধান ‘ডোবরা’ বা ‘ট্যাবলার’ (জলাবদ্ধতায়) পানিতে নষ্ট হয়েছে। সপ্তাহ খানেক ধরে জলাবদ্ধতায় ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে পাকা ধান। এই অবস্থায় ধারদেনা করে চাষ করা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, তাদের অর্ধেক ফসল ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যা আছে শ্রমিকের অভাবে তারও অর্ধেক কাটতে পারছেন না। যা কেটেছিলেন তাও অঙ্কুর গজিয়ে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তা খাবার উপযুক্ত নয়। এগুলো হাঁসের খাবারে পরিণত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের পৌনে চার লাখ কৃষকের সবাই এবার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে হাওর আন্দোলনের নেতারা দাবি করেছেন।

৮৩ শতাংশের জায়গায় ৪৭.৬৬%
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তরের গত বছরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৮৩ ভাগ ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই বছর এখন পর্যন্ত ৪৭.৬৬২ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে দুর্যোগজনিত কারণে ধান কাটার গতি কম।
তবে বৃহস্পতিবার দিন ভালো থাকায় প্রায় এক সপ্তাহ পর কোমর ও বুক সমান পানিতে কৃষকদের পচা ধান কাটতে দেখা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো বন্যার পূর্বাভাস দিয়ে ২৮ এপ্রিলের মধ্যেই হাওরের ৮০ ভাগ পাকা ধান কাটার নির্দেশনা দিয়েছিল। তবে তার আগেই ২৫ এপ্রিল থেকেই বর্ষণ শুরু হয় সুনামগঞ্জে। এ সময় গত বছরের চেয়ে নদ-নদীর পানিও বেশি বৃদ্ধি পায়। ভারী বর্ষণের কারণে প্রতিটি হাওরে জলাবদ্ধতা আরো প্রকট হয়।
পাউবোর ২০২৫ সালের ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল রেকর্ডে দেখা যায়, ওই সময়ে জেলার প্রধান সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে যথাক্রমে ৩.৫৯, ৩.৪৬, ৩.৩৭ ও ৩.২৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হয়েছিল।
এ বছর ২৭ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি (সকাল ৯টার হিসাব) যথাক্রমে ৩.৫১, ৩.৮৬, ৪.৩৬ ও ৪.৫৪ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
একইভাবে গত বছর এই সময়ে বৃষ্টিপাত ছিল একেবারে কম। এ বছর ২৫ এপ্রিল থেকেই ভারী বর্ষণ হচ্ছে।
২৭-২৮ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের লাউড়ের গড় পয়েন্টে ১৩৩ মিলিমিটার, ছাতক পয়েন্টে ৭৬ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ১৩৭ মিলিমিটার এবং দিরাই পয়েন্টে ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অথচ গত বছর ২৮ এপ্রিলের পরিসংখ্যানে মাত্র ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। পরের দিন থেকে ওই বছর মাত্র ছয় ও এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি ১৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এভাবে প্রায় প্রতিটি নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তবে এখনো নদ-নদীর পানি উপচে বা বাঁধ ভেঙে কোথাও ফসল ডুবেনি। কেবল বৃষ্টির পানিতেই হাওরে জলাবদ্ধ পাকা জমির ফসল ডুবে আছে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাওরের প্রায় নয় হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
যদিও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায়ের ভাষ্য, “আমাদের হিসাবে, এ পর্যন্ত অন্তত ৬০ হাজার হেক্টর জমি ডুবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে মাত্র ২০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। সরকারি হিসাবের বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই।”

‘ভাবছিলাম ঋণ তনি মুক্তি পাইমু, কিন্তু ঋণে আরো জড়াইছে’
দুপুরের দিকে জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের জলিলপুর গ্রামের কৃষক রতীন্দ্র বর্মণ কোমরে হাত দিয়ে ডুবন্ত ধান দেখছিলেন বিষন্ন মনে। ফসল হারানোর কষ্টে ছলছল করছিল তার চোখ।
বলছিলেন, “আমার অনেক টেকা লস অইগিছে। ৪৫০ মণ ধান পাওয়ার কথা ছিল। পাঁচ লাখ টেকার লস পোষাইতে তিন-চার বছর লাগব। মনে করছিলাম, ইবারের গিরস্তি দিয়া ঋণ তনি মুক্তি পাইমু। কিন্তু ইবার ঋণে আরো জড়াইছে আমারে। ভগবান আমার আশা পূরণ করেনি। আমার খুব ক্ষতি হইয়া গেছে। তিন বাচ্চা ও পরিবার নিয়ে কিভাবে যে চলতাম!”
একই হাওরের গজারিয়া গ্রামের কৃষক পলাশ মিয়া ১২ কিয়ার জমিনে ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কিয়ার জমির ধান কেটেছেন। তবে কাটা ধানেও রোদের অভাবে অঙ্কুর গজিয়েছে। হাওরের নিচের ধান কাচা অবস্থায় জলাবদ্ধ হয়ে নষ্ট হয়েছে। এখন নতুন করে জলাবদ্ধতায় পাকা ধানও ডুবে গেছে।
পলাশ মিয়া বলেন, “যে পাঁচ কিয়ার জমিনের ধান লোক দিয়া কাটাইছি তার জন্য কামলাদেরকে এক হাজার টাকা করে মজুরি দিতো অইছে। কাটার পর এই ধান বাড়িত আনতেও আরো বেশি খরচ অইছে। ইবার কোনোভাবেই পোষাইতো না। ঋণে জর্জড়িত অইযাইবো।”
বিকালে সদর উপজেলার শিয়ালমারা হাওরের অংশে গিয়ে দেখা গেছে, ইসলামপুর গ্রামের কৃষক বশির মিয়া তার স্কুল পড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে কাচা ধান কাটছেন। সেই ধানের মুঠো নৌকায় করে সড়কে নিয়ে আসছেন।
বশির মিয়া বলেন, “আউরোর ১০ কিয়ার ক্ষেতো ধান লাগাইছলাম। সব বৃষ্টির পাইন্যে লইয়া গেছেগি। অনে কাচা ধান বাল-বাচ্চারে লইয়া সাঁতরাইয়া কাটরাম। তারপরও খোরাকি তোলতাম পারতাম না। ইবার কষ্টত পড়ি গেছি।”

‘অপরিকল্পিত’ বাঁধ নিয়ে আলোচনা
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদিত হওয়ার কথা ছিল। ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে হাইব্রিড দুই লাখ ১১ হাজার ১০৩.৯০ টন, উফশী দুই লাখ ৫৪ হাজার ৬৪ টন এবং স্থানীয় এক হাজার ৭৩৫.৩৬ টন উৎপাদিত হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেনরায় বলেন, “এবার বাঁধ না ভাঙলেও বাঁধের কুফলে হাওরে জলাবদ্ধতা প্রকট হয়েছে। কারণ প্রতি বছর অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে এবং বাঁধের মাটির কারণে হাওর, নদী জলাশয় ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হয়েছে। এ কারণে হাওরের ফসল এবার ডুবে নষ্ট হয়েছে। হাওরের পানি নিষ্কাশনের পকেট না থাকায় পানি নামতে পারেনি।”
পাউবো সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক বলেন, বুধবার দিবাগত রাতে জেলায় আট মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পানিও সামান্য কমেছে। রোদও ছিল। তবে হাওরগুলোতে জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে। সুরমা নদীর পানিও বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, বৃহস্পতিবার দিনে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকরা ধান কাটা ও মাড়াই এবং শুকাতে পেরেছেন।
জলাবদ্ধতায় এবার ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত নয় হাজার হেক্টরের বেশি ধান নষ্ট হয়ে গেছে। যে ধানের বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।