Published : 30 Apr 2026, 12:46 AM
কখনও কখনও ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গেলেও এবার অবস্থা অন্য রকম; টানা বর্ষণে জমা পানি বের হতে না পেরে ‘ডোবরায়’ ডুবে আছে হাজার হাজার কৃষকের শ্রমে-ঘামে বোনা বছরের একমাত্র ফসল।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয় জেলাজুড়ে যখন বিস্তৃত হাওরে বোরো ধান কাটার ‘দাওয়ামারির’ উৎসব চলার কথা, ঠিক তখন কৃষক চোখের সামনে তার ফসল তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখলেও কিছু করতে পারছেন না। তাকে অসহায়ের মত ভবিষ্যতের দুর্দিনের কথা ভাবতে হচ্ছে।
কারণ সুনামগঞ্জের হাওরে এখন ধানের অর্ধেক দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা ‘নয়নভাগা’ দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক মিলছে না। ধান কেটে রাখার খলাও (ধান শুকানো ও মড়াই করার অস্থায়ী মাঠ) তলিয়ে গেছে, রাস্তা জলমগ্ন হওয়ায় সেই কাটা ধান গোলায় ওঠাতে পারছেন না। যারা বাড়ি পর্যন্ত সামান্য ধান আনতে পেরেছেন, টানা বৃষ্টিতে রোদের অভাবে সেই ধানেও চারা গজাচ্ছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপদের মধ্যে পড়েছেন হাওরের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন বর্গাচাষিরা। বর্গাচাষিরা জমির ভাড়া তুলতে পারছেন না। তাদের ‘খোরাকির’ স্বপ্নও এখন অধরা।

বেশির ভাগ কৃষকই বলছেন, জমির পাকা ধান বৃষ্টির জলে ডুবে গেছে। এখন কোমর সমান পানিতে নেমে কাটতে হবে। তাই শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রমিক পেলেও মজুরি দিতে হচ্ছে ১২০০ টাকা করে। এরকম দুর্যোগপূর্ণ সময়ে কৃষক সাধারণত সনাতনি প্রথা ‘নয়নভাগা’ পদ্ধতিতে ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু এবার তাও হচ্ছে না।
কৃষক সাধারণত টাকার বিনিময়ে বা ধানের বিনিময়ে ক্ষেতের ধান কাটতে শ্রমিককে কাজ দেন। সময় ও ক্ষেত্র বিশেষে কাটা ধানের ছয় বা সাত ভাগের এক ভাগ ধান শ্রমিককে দিতে হয়। কিন্তু ‘নয়নভাগা’ বলতে সেই অবস্থাকে বোঝায় যখন কৃষক তার কাটা ধানের অর্ধেক শ্রমিককে দেবেন।
আর ‘ডোবরা’ হচ্ছে সেই অবস্থা যখন বৃষ্টির পানি হাওরে জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। হাওরের লোকজন স্থানীয় ভাষায় একে ‘ডোবরা’ বলে থাকেন।
এবার মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই বৃষ্টির জলে হাওরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। প্রথম দফায় অনেক জায়গায় কৃষক শ্যালো মেশিন বসিয়ে সাধ্যমত পানি নিষ্কাশন করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার এক সপ্তাহ পর শুরু হয় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল। এতে নদী টইটম্বুর থাকায় বাঁধ কেটে সেই পানি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও টানা বর্ষণের আগাম বার্তা দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আগেই মাঠের ৮০ শতাংশ পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দিয়েছিল।
কৃষি বিভাগের মতে, এই বার্তা দেওয়ার পর দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে প্রায় অর্ধেক জমির ধান কেটেছে কৃষক।
কিন্তু কৃষকরা বলছেন, বাস্তবে ৩০ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়নি। এর আগে জমির ধান ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে এবং অবশিষ্ট পাকা ধান নতুন করে জলাবদ্ধতায় হাবুডুবু খাচ্ছে।
এ অবস্থা শুধু সুনামগঞ্জ জেলায় নয়, নেত্রকোণার গারো পাহাড়ের নিম্নাঞ্চল ও সমতলেও অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতায় জমির ফসল হারিয়েছে কৃষক। হবিগঞ্জ ও কুমিল্লার জেলাতেও হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
এ অবস্থার মধ্যে জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতি তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তখন ফসল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় বড়, মাঝারি, ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ ৭৮ হাজার ৬৯৭ কৃষক রয়েছেন। তবে বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, যারা বর্গা নিয়ে জমি চাষ করেন।

চলতি মৌসুমে জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। বাম্পার ফলন বা সব ফসল গোলায় তোলা গেলে এ থেকে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান বা পাঁচ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ফসল উৎপাদন হত।
এবার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের জন্য সরকার ৭০৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
সুনামগঞ্জ সদর ও আশপাশের কয়েকটি জায়গায় গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি হাওর এখন বৃষ্টির পানিতে ভরে গেছে। ধান পরিবহনের ‘জাঙ্গাল’ (ক্ষেতের আল ধরে বানানো রাস্তা) ডুবে আছে। ভেসে থাকলেও কর্দমাক্ত। কিছু কৃষক ধান কাটলেও পরিবহন করতে পারছেন না।
হাওরের কৃষকরা বলছেন, হাওরের বড় কৃষকরা বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে কৃষিকাজ ছেড়ে দিয়েছেন। তারা জমি ভাড়া দিয়ে দেন। হাওরের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা সেই জমি ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেন। জমির ভাড়া ও উৎপাদন খরচ শেষে তাদের কোনো লাভ হয় না।
কেবল সারা বছরের খোরাকির জন্যই তারা চাষাবাদ করেন বলে জানান। কিন্তু এবার উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা খোরাকির সংস্থানও হবে না বলে হতাশা প্রকাশ করছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
কৃষকরা বলেন, এক কেয়ার (৩০ শতাংশ) জমির ধান কাটা ও খলা পর্যন্ত নিয়ে আসতে চারজন শ্রমিক প্রয়োজন। তার পর মাড়াই, শুকানো ও বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসতে তিন থেকে চার হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। বর্গাচাষিরা প্রতি কেয়ার জমি মালিকের কাছ থেকে ৮-১০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেন। ধান কাটা, মাড়াইসহ কৃষকের খরচ হয় আরো ৮-১০ হাজার টাকা। জমিতে ধান হয় ১২-১৬ মণ। এই পরিমাণ ধানে কোনোমতে উৎপাদন খরচ ওঠলেও কৃষকের কোনো লাভ নেই।

মৌসুমজুড়ে পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার জন্য পানি আর বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই আর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবু হাল ছাড়ছেন না কৃষক। ফসলের মায়ায় বজ্রবৃষ্টি মাথায় নিয়ে তারা হাওরে অবস্থান করছেন। যুদ্ধ করছেন ফসল ঘরে তোলার।
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের আনন্দপুর গ্রামের কৃষক রথীন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, “পাঁচ কেয়ার জমির মধ্যে দেড় কেয়ার ধান কেটেছি অনেক কষ্ট করে। সাড়ে তিন কেয়ার জমির পাকা ধান পানির নিচে। এখন আমার গুলিধানে ‘গ্যাঁড়া’ (চারা) গজাচ্ছে। এগুলো আর কোনো কাজে আসবে না।”
ধানের মায়ায় চারা গজানো স্তূপের পাশে রথীন্দ্রের স্ত্রী বসে কান্না করছেন। তারা যুদ্ধ করছেন, অবশিষ্ট ক্ষেতের ধান কাটার জন্য। কিন্তু শ্রমিক পাচ্ছেন না।
হাওরের একই গ্রামের কৃষক কাচু রায় বলেন, “আমার ২২ কেয়ার জমির মধ্যে ২০ কেয়ার পানির নিচে। দুই কেয়ার জমির ধান কাটতে পারছি। এবার আমার উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা; বছরের খোরাকিও তুলতে পারব না।”
এমন অবস্থায় ঋণ ও দায়দেনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন বলে জানান এই কৃষক।
তার বড় ভাই অনন্ত রায় বলেন, “আমার ১৪ কেয়ার জমি তলিয়ে গেছে। কাটতে পারছি না। আর কাটতে পারব কিনা জানি না। কারণ শ্রমিক পাচ্ছি না। মেশিনও নামছে না পানিতে। কাটলেও ধান পরিবহন করা সম্ভব না।”

আরেক কৃষক কিংকর রায় বলেন, “আমার ১৩ কেয়ার জমি পানির নিচে। আমি ৮-১০ হাজার টাকা করে প্রতি কেয়ার জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছিলাম। ধান কাটার আগ পর্যন্ত প্রতি কেয়ারে আরো অন্তত চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন পাকা ধান ডুবে যাচ্ছে। কাটানোর শ্রমিক নাই। জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে আমার ধান।”
শাল্লা উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন বলেন, “এবার হাওরের কৃষকের প্রায় ৮০ ভাগই ক্ষতি হবে। ধান কাটানো গেলে ক্ষতি কিছুটা কাটানো যেত। কিন্তু এখন কাটানোর সুযোগ নাই। শ্রমিকরা এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা মজুরি চাচ্ছেন। এক কেয়ার জমির ধান কাটাতে চারজন শ্রমিক প্রয়োজন। তারপরও শ্রমিক মিলছে না।”
শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায় বলেন, উপজেলার হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে ২১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দফায় জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছে ১৭৩ হেক্টর জমির। পরে হয়েছে এক হাজার ১০ হেক্টর জমি। এখনও কর্তনের বাকি পাঁচ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি। এটা পানিতে তলিয়ে আছে।
সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “প্রতিটি হাওরে পাকা ধান জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে। নদীগুলোও পাহাড়ি ঢলে ভরাট হয়ে আছে। চোখের সামনে পাকা ধান ডুবছে। কাটানোর শ্রমিক নাই।

“এবার বাঁধ ভেঙে ফসল নষ্ট না হলেও বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় সব হাওরের ধান ডুবে আছে। এতে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক। তারা খরচই তোলতে পারছেন না।”
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার প্রধান নদী সুরমার পানি দুটি পয়েন্টে ছাতক-সুনামগঞ্জে যথাক্রমে ৫১ ও ৫০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। নলজুর ও পাটলাই নদীর পানি একই সময়ে ৫৫ ও ৪২ সেন্টিমিটার বেড়েছে। পুরাতন সুরমার পানি দিরাই পয়েন্টে ৫৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
এভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যার শঙ্কা রয়েছে। তবে এখনো পাউবোর নির্মিত বাঁধ ভেঙে ফসলহানি ঘটেনি বলে জানান প্রকৌশলী।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এ পর্যন্ত সাত হাজার ৫৭ হেক্টর জমির বোরো ধান সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে। চূড়ান্ত ক্ষতি এখনো নির্ধারণ হয়নি।
তবে ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৫০ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে বলে জানান তিনি।