Published : 17 Jul 2026, 11:49 PM
দেড় বছর আগে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে দনিয়া কলেজের সামনে ছুরিকাঘাতে মিনহাজ হত্যার নেপথ্যে ‘আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ’ দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে তা মানতে চাইছে না নিহতের পরিবার; বলছে, এ ঘটনায় ‘রাজনৈতিক বিষয়-আশয়’ রয়েছে।
মিনহাজ ছাত্রদলের রাজনীতি করতেন, ছিলেন টেক্সটাইল বিষয়ে ডিপ্লোমা সনদধারী। গত বছরের ২৮ জানুয়ারি মিনহাজকে হত্যার পাশাপাশি তার বন্ধু আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে আহাদকে কুপিয়ে জখম করা হয়।
ঘটনার পরদিন মিনহাজের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে ‘কিং মাহফুজ’সহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অচেনা আরো ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। এরপর তদন্তভার দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে।
তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশের ডেমরা জোনাল টিমের পরিদর্শক আব্দুল মজিদ গত ১৫ এপ্রিল ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র এবং একজন কিশোরের বিরুদ্ধে দোষীপত্র জমা দেন।
অভিযোগপত্রে যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা হলেন—আরহান সরকার মাহফুজ ওরফে কিং মাহফুজ ওরফে মোহাম্মদ মাহফুজ সরকার, সাইফুল ইসলাম ওরফে সাইফুল ইসলাম মাহফুজ, সৌরভ কাজী, আলফাজ হোসেন, শাহিন ওরফে শুভ, জাকির হোসেন ইকবাল, রাসেল ওরফে রাব্বি, ইব্রাহিম, শাহ আলম, সাব্বির সরকার ওরফে সাব্বির, আশিক ওরফে আশিষ, সোহান মিয়া ও কাওছার মিয়া।
তাদের মধ্যে সাইফুল, সৌরভ, আলফাজ, রাসেল ও ইব্রাহিম শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। অপর আসামিরা জামিনে রয়েছে। আগামী ১২ অগাস্ট মামলার শুনানির পরবর্তী দিন রেখেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক।
যোগাযোগ করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আব্দুল মজিদ বলেন, “ভিকটিম ও আসামিরা এক সাথেই চলতো। ঘটনার দিন ২৮ জানুয়ারি দনিয়া কলেজ থেকে বাঁশ আনাকে কেন্দ্র করে তাদের দ্বন্দ্ব হয়।
“মিনহাজকে কিং মাহফুজের লোকজন অনেক জায়গায় ছুরিকাঘাত করে। ভিকটিম মারা যান। তারা কিন্তু এক সাথেই চলতো-ফিরতো অনেকটা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।”
অভিযোগপত্রেও এমন বর্ণনায় তুলে ধরেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মিনহাজ ২০২৩ সালে সাইনবোর্ড এলাকার পার্ক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর বিভিন্ন জায়গায় খণ্ডকালীন ও অস্থায়ী চাকরি করছিলেন। অবশ্য ঘটনার মাস তিনেক আগে থেকে তিনি বেকার ছিলেন। আসামিরা মিনহাজের পূর্ব পরিচিত এবং এলাকার ‘ছোট ভাই-বড় ভাই’ সম্পর্কে ছিলেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে চলাফেরা, আড্ডা দেওয়া এবং ঘোরাঘুরি করতেন। মিনহাজ, আহাদসহ আসামিরা একসঙ্গে সব ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।
অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, একপর্যায়ে এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মিনহাজের সঙ্গে আসামিদের বনিবনা হচ্ছিল না। ফলে তাদের মধ্যে বিভিন্ন মতবিরোধ ও সম্পর্কের দূরত্ব এবং বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে একাধিক পক্ষ তৈরি হয়। একটির নেতৃত্ব দিতেন মিনহাজ, অপরটিতে কিং মাহফুজ।
“যেহেতু তারা মনমালিন্য ও বিরোধের কারণে পৃথক পৃথক গ্রুপ পরিচালনা করতো, সেহেতু উভয় গ্রুপের মধ্যে শত্রুতাপ্রবণ মানসিকতা ও একে অপরের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হিসেবে প্রকাশ করার প্রবণতা ছিল। যার কারণে এলাকার বিভিন্ন বিষয়ে আধিপত্য বিস্তার করাকে কেন্দ্র করে মিনহাজের গ্রুপের সাথে মাহফুজ গ্রুপের বিভিন্ন সময় তর্কবিতর্কের ঘটনা ঘটে এবং দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি হয়।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়, মিনহাজ দনিয়া কলেজের ছাত্র ছিল না। এজন্য কলেজের ছাত্ররা মিনহাজের নেতৃত্ব মানতে চাইতো না। এ অবস্থায় ২৬ জানুয়ারি দনিয়া কলেজে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে আসামিদের পক্ষের সঙ্গে মিনহাজ পক্ষের মতবিরোধ হয়। দনিয়া কলেজের এক অংশ মিনহাজের পক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়, যাদেরকে কাছে টেনে নেন মাহফুজ। পরে কিং মাহফুজ পক্ষ দনিয়া কলেজের ছাত্রদের নিয়ে কলেজকেন্দ্রিক বিভিন্ন বিষয়ে আধিপত্য বিস্তার করাসহ শিক্ষালয়টিতে মিনহাজের নেতৃত্ব শেষ করার পাঁয়তারা করছিল।
২৯ জানুয়ারি মিনহাজের এলাকায় ঘুড়ি ওড়ানোর একটা অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরির জন্য কিছু বাঁশের দরকার পড়ে, আর সেজন্য স্থানীয় ছেলেরা মিনহাজের কাছে ধরনা দেন। এরপর মিনহাজের কথামতো তারা দনিয়া কলেজ থেকে বাঁশ আনতে যান। কলেজের সামনে তারা মাহফুজ আসামিদের অবস্থান দেখে বিষয়টি মিনহাজকে জানান।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিনহাজ তার বন্ধু আহাদসহ অন্যদের নিয়ে কলেজের সামনে উপস্থিত হন। মিনহাজ দনিয়া কলেজ থেকে কিছু বাঁশ নিয়ে তা ভ্যানে করে পাঠিয়ে দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে লিখেছেন, বিষয়টি নিয়ে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়ে মিনহাজকে উদ্দেশ্য করে ‘উসকানিমূলক ও আজেবাজে’ কথাবার্তা বলতে থাকেন। তখন কথা বলার জন্য আসামিদের ডাকেন মিনহাজ ও আহাদ। কথাবার্তার একপর্যায়ে আসামিরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, সুইচ গিয়ার, চাকু, চাপাতি, লোহার রড ও পাইপ দিয়ে মিনহাজ ও আহাদের ওপর হামলা করে। মাহফুজের হুকুমে আসামিদের কেউ রড ও লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে জখম করে, কেউ সুইচ গিয়ার দিয়ে মিনহাজের পিঠে আঘাত করে, কেউবা চাপাতি দিয়ে আহাদের হাতে কোপ দেয়। রামদা দিয়েও মিনহাজকে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে আসামিরা চলে যায়। পরে মিনহাজ ও আহাদকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়, সেখানে মিনহাজকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
মিনহাজের স্ত্রী মহিমা ইসলাম মিষ্টি বলেন, “মিনহাজ আড্ডা দিত দনিয়া কলেজের সামনে, তাকে সবাই চিনতো। রেপুটেশন ছিল তার। এলাকায় কোনো ঝামেলা হলে সবাই মিনহাজকে ডাকতো। মাহফুজ দনিয়া কলেজের সামনে ফুডকোর্ট থেকে চাঁদা তুলত।
“দনিয়া কলেজের ছাত্র তানজীলের সাথে চাঁদা তোলা নিয়ে মাহফুজের ঝামেলা হয়। তানজীল বিষয়টি মিনহাজকে জানায়। মিনহাজ মাহফুজকে ডেকে চাঁদা তুলতে নিষেধ করে। এরপর মাহফুজ ক্রিমিনালি মাইন্ডসেট করে। ওরা গ্রুপ করে মিনহাজকে মেরেছে। মারার পর ওই জায়গার সব সিসিটিভি ফুটেজ ভেঙে ফেলেছে।”
নিহতের স্ত্রী বলেন, “আসামিরা প্রশাসনিকভাবে সাপোর্ট পাচ্ছে। খুনের মামলায় ৬ মাসের মধ্যে জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছে। মিনহাজের মামলা নিয়ে যারা অ্যাকটিভ ছিল, জামিনে বের হয়ে তাদের থ্রেট দিচ্ছে। রাব্বি ও তানজীলকে তারা থ্রেট দিচ্ছে।
“মিনহাজকে মারার বিষয়টা রাজনৈতিক ইস্যু ছিল বলে মনে হচ্ছে। মার্ডারের পেছনে আধিপত্য বিস্তার নয়, রাজনৈতিক ইস্যু জড়িত। এ অভিযোগপত্রে আমরা সন্তুষ্ট না। খুনের প্রকৃত কারণ উঠে আসেনি।”
তদন্তে গাফিলতি রয়েছে দাবি করে মিষ্টি বলেন, “এ ঘটনায় হামজা নামে এক ব্যক্তি জড়িত। সবাই বলছে, হামজাও ওই সময় ঘটনাস্থলে থেকে মিনহাজকে মেরেছে। কিন্তু তাকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।
“কয়েকজন আসামিকে তো পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এখানে প্রশাসনের গাফিলতি রয়েছে। তারা আসামি ধরতে পারে না আমাদের বলে খুঁজে দিতে।”
মিনহাজ যখন খুন হয়, তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন মিষ্টি। এখন মিনহাজের ছেলের বয়স ১৩ মাস। ছেলেকে নিয়ে বাবার বাসা উত্তরাতে থাকছেন মিষ্টি।
মাঝে-মধ্যে ছেলেকে তার দাদা-দাদির কাছেও নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে মিষ্টি বলেন, “সন্তানের জন্য বড় সাপোর্ট তার বাবা। অথচ ওর বাবা আজ নেই। সিঙ্গেল মাদার হিসেবে বাচ্চাটাকে বড় করে তুলব।”
মিনহাজের বোন রুবায়া সুলতানা ফারিন বলেন, “দেড় বছর হলো ভাইটা খুন হয়েছে। অভিযোগপত্র দিয়েছে। আমরা কারো সহযোগিতা পাচ্ছি না। আর্থিকভাবেও আমরা অতটা সচ্ছল না। আসামিরা প্রভাবশালী। সবদিক থেকে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।
“আমার বাবা ৩৫ বছরের অধিক সময় ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন। বয়স হয়েছে, মানসিকভাবে অসুস্থ। ভাই মারা যাওয়ার আগে (বাবা) যতটুকু ভালো ছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে। পরিবারের বাইরে কাউকে চিনতে পারেন না। পলিটিক্যালি সাপোর্টটা আমরা পাচ্ছি না।”
ফারিন বলেন, “মার্ডার মামলার আসামিরা জামিনে বের হয়ে এলাকায় ঘুরছে। যেখানে আমার ভাইকে খুন করেছে, সেখানেই আড্ডা দিচ্ছে। আশঙ্কা তো থেকেই যায়, কখন কী করে ফেলে!
“আর আমার ভাইয়ের সাথে কিন্তু মাহফুজের ঝামেলা ছিল না। ঝামেলা ছিল তানভীর ও মাহফুজের মধ্যে। মাঝখান দিয়ে প্রাণ হারালো আমার ভাই। কিন্তু কী কারণে আমার ভাইকে খুন করা হয়েছে জানতে পারলাম না। পুলিশ, ডিবি পুলিশ বলতে পারল না।”