Published : 18 Jul 2026, 12:15 AM
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের জন্য যখন একযোগে বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ সংগ্রহের কথা চলছে, একই সময়ে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলাও।
বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে টেক্কা দিয়ে দেশীয় বাজার ধরতে মরিয়া ইউএস-বাংলা প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মাথায় নতুন করে ১৪ হাজার কোটি টাকা (১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার খবর দিয়েছে।
দেশীয় বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে এটা রেকর্ড। সবচেয়ে কম টাকায় হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্যও সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে এয়ারলাইন্সটি।
একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কাঠমান্ডু রুটও নতুন করে শুরু করার কথা বলা হয়েছে ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে।
দেশের এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে ঢাকা থেকে যাত্রী বহন করা ৪১টি এয়ারলাইন্সের মধ্যে মাত্র চারটি দেশি। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো।
এখানে যাত্রী চাহিদা এত বেশি যে বাজে সার্ভিস দিয়েও দিনের পর দিন টিকে যাচ্ছে একেকটি এয়ারলাইন্স। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো বাজার ধরতে পারলে বিদেশি মুদ্রা বাঁচবে।
দেশের চারটি এয়ারলাইন্সের মধ্যে ইউএস-বাংলার বহরে সবচেয়ে বেশি ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্স বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ।
বিমান সম্প্রতি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ সংগ্রহের জন্য চুক্তি করেছে। পাশাপাশি এয়ারবাস থেকেও বিমানের জন্য উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার ‘ড্রাই লিজে’ তিনটি সিঙ্গেল আইল বোয়িং সংগ্রহের জন্য দরপত্র প্রকাশ করেছে বিমান।
ইউএস-বাংলাও গত সপ্তাহে ২১টি নতুন বোয়িং সংগ্রহের ঘোষণা দেয়। গত ১২ জুলাই বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে পাঠানো একটি চিঠিতে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২১টি নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ সংগ্রহের বিষয়টি জানায় এয়ারলাইন্সটি।
চিঠিটি মূলত দেওয়া হয়েছিল বোয়িং ও এয়ারক্রাফট লিজিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আগামী ২৯ জুলাই অনুষ্ঠেয় আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বিডার চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।
নতুন উড়োজাহাজে বিনিয়োগের অর্থ পাঁচটি আন্তর্জাতিক লিজিং কোম্পানির মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে জানিয়ে ইউএস-বাংলার চিঠিতে বলা হয়, ২০২৭ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হবে।
অন্যদিকে বিমানের অর্ডার করা উড়োজাহাজগুলো আসতে আসতে ১০ বছর গড়িয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বহর সম্প্রসারণে ইউএস-বাংলা এগিয়ে থাকবে।
প্রচুর যাত্রী, টানছে বিদেশিরাই
বর্তমানে দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ প্রবাসী। মূলত তাদের যাতায়াতের কারণেই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিন-রাত ব্যস্ততা।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে প্রধান এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী। আগের বছর যাত্রী সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৫ লাখ।
এই বিমানবন্দরে বর্তমানে যাত্রীসেবা দিচ্ছে ৪১টি দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্স। যার মধ্যে মাত্র চারটি দেশি। এবং এই চারটির মধ্যে কেবল বিমান ও ইউএস-বাংলা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িং বিমান চলাচল ও যাত্রীসংখ্যার বিষয়ে পূর্বাভাস দেয় তাদের কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুক (সিএমও) ম্যাাগাজিন।
‘কমার্শিয়াল মার্কেট আউটলুক ২০২৫- ২০৪৪’ এ বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এভিয়েশন (বিমান পরিবহন) বাজার। আগামী বিশ বছরে, গড় বার্ষিক এয়ার ট্রাফিক (বিমান চলাচল) প্রবৃদ্ধি জিডিপিকে প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্টে ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

“এছাড়া সাম্প্রতিক সরকারি সংস্কার এবং উদার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতি দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর মূলধন পাওয়ার সুযোগ উন্নত করতে সহায়তা করছে এবং এ অঞ্চলে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করছে।”
বোয়িং কমার্শিয়ালের এশিয়া প্যাসিফিক ও ভারতের মার্কেটিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডেভ শাল্টে ২০২৩ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সিএমওর বরাত দিয়ে বলেছিলেন, “পশ্চিম এশিয়া ও ভারতে আঞ্চলিক ট্র্যাফিক বিবেচনায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিমান ভ্রমণ দ্বিগুণ হবে বলে আমরা মনে করি।”
সিএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যাত্রী ভ্রমণ এবং এয়ার কার্গোর জোরালো চাহিদা মেটাতে, দক্ষিণ এশিয়ার ক্যারিয়ারগুলোকে আগামী ২০ বছরে ২ হাজার ৩০০টির বেশি নতুন বাণিজ্যিক বিমান বহরে যুক্ত করতে হবে, যা এখনকার তিনগুণ।
এর মধ্যে সিঙ্গেল-আইল বা ৭৩৭ এর মত ন্যারোবডি উড়োজাহাজ থাকবে ক্যারিয়ারগুলোর বহরের ৯০ শতাংশ। বোয়িং ৭৮৭ এর মত ওয়াইডবডি থাকবে ১০ শতাংশ।
এই দৌড়ে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে বিমান ও ইউএস-বাংলা ছাড়া আর কেউ অংশ নিতে পারছে না। যাত্রী প্রবাহ বৃদ্ধির পূর্বাভাসের কারণেই বিদেশি লিজিং কোম্পানিগুলো ইউএস-বাংলার সঙ্গে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য।
বেসরকারি এয়ারলাইন্সের আসা-যাওয়া
গত তিন দশকে দেশে ১০টির মত বেসরকারি এয়ারলাইন্স ব্যবসা শুরু করেছে; এর মধ্যে ছয়টিই বন্ধ হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যে।
দেশের বিমানবন্দরের অতিরিক্ত চার্জ, নানা সুবিধায় থাকা ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার বিমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে না উঠতে পারাসহ নানা কারণে এ এয়ারলাইন্সগুলো বিপুল দেনা রেখে অকালেই ঝরে গেছে।
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট শুরু করে ‘অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’। চার বছরের মাথায় ব্যবসা গুটিয়ে নেয় তারা।
১৯৯৭ সালে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছিল ‘এয়ার পারাবত’। তারাও চার বছরের মধ্যে ২০০১ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৫ সালে চালু হয় ‘এয়ার বাংলাদেশ’ এবং ২০০৭ সালে চালু হয় ‘রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’। অব্যাহত লোকসানের কারণে এ দুটি এয়ারলাইন্সও বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ করা ‘বেস্ট এয়ার’ ফ্লাইট অপারেশন শুরু করে ২০০৮ সালে। এক বছরের মধ্যেই এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
২০০৫ সালের জুন মাসে প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অপারেশন বন্ধ করে দেয়।
২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা জিএমজি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যায় ২০১২ সালে।
২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা রিজেন্ট এয়ার ২০২০ সালে কোভিডে মহামারীর সময় বন্ধ হয়ে যায়। বিপুল পরিমাণ দেনার দায়ে তখন তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের কথাও সংসদে জানান তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এখন যেসব বেসরকারি কোম্পানি চালু আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো এয়ারলাইন্স নভোএয়ার ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। গত বছর একবার কার্যক্রম স্থগিত করে তারা আবার ফিরে এসেছে। তবে তাদের আন্তর্জাতিক রুটে কোনো ফ্লাইট নেই।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে বেসরকারি খাতে রীতিমত রেকর্ড গড়ে ২৫টি এয়ারক্রাফটের বহর চালাচ্ছে ইউএস-বাংলা। আরও ২১টি তাদের বহরে যোগ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলেন, নতুন এয়ারক্রাফট দিয়ে ইউএস-বাংলা পশ্চিম এশিয়ার কুয়েত, বাহরাইন, মদিনার মত গন্তব্যের পাশাপাশি হংকং, মালয়েশিয়ার পেনাং, জহরবারুর মত পর্যটক আকর্ষণকারী গন্তব্যে ফ্লাইট চালানোর পরিকল্পনা করছে।

পাশাপাশি যেসব রুট ইতোমধ্যে চালু আছে, সেগুলোতেও ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি।
নতুন এয়ারক্রাফট সংযোজনের ঘোষণা আসতে না আসতেই সরকারকে ৯৮ হাজার টাকা ভাড়ায় হজ ফ্লাইট চালানোর প্রস্তাব দিয়ে একটি চিঠি দিয়েছে ইউএস-বাংলা।
সবশেষ ২০২৬ সালের হজ যাত্রীদের জনপ্রতি বিমান ভাড়া ছিল এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা। হজ প্যাকেজের একটি বড় অংশ বিমান ভাড়ায় খরচ হয়। হজের ভাড়া কমানো নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় এয়ারলাইন্সগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে।
হজ ফ্লাইটের ভাড়া কম রাখার বিষয়ে ইউএস-বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বলছেন, “যেহেতু সৌদি আরবের দুটি এয়ারলাইন্স (সৌদিয়া ও ফ্লাই নাস) হজ ফ্লাইট পরিচালনা করে, আর বাংলাদেশের একটা (বিমান)। সেই জায়গা থেকে আমরা অনেক কম টাকায় এই সেবা দিতে চাই। এখানে লাভের চাইতে সেবার বিষয়টিকে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি।”
২০১৮ সালে কাঠমান্ডুতে ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ার পর তাদের নেপাল রুটটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন আবার নেপালে ওড়ার খবর দিচ্ছে এয়ারলাইন্সটি।
২০১৮ সালের ১২ মার্চ ৭১ জন আরোহী নিয়ে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুগামী ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস২১১ ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়। তাতে নিহত হন ৫১ জন। এর মধ্যে ২২ জন নেপালি, একজন চীনা এবং বাকিরা বাংলাদেশি যাত্রী ছিলেন।
কামরুল ইসলাম বলছেন, “নেপালে ফ্লাইট পরিচালনার একটা কথা চলছে, হয়ত সেপ্টেম্বর নাগাদ সেটা হতে পারে। আমরা আশাবাদী।”
দেশের এভিয়েশন খাতের একজন বিশেষজ্ঞ এবং বিমানের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, দেশের কোনো সরকারি বা বেসরকারি এয়ারলাইন্স এর আগে একসঙ্গে এত বড় পরিসরে বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়নি।
“এটি নিঃসন্দেহে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি বড় সফলতা। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পর্যটন শিল্প, রপ্তানি ও বিনিয়োগ আরও গতিশীল হবে।
“একইসঙ্গে নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনায় বিপুলসংখ্যক পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার ও সহায়ক জনবলের প্রয়োজন হবে, যা দেশে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।”