Published : 18 Jul 2026, 12:40 AM
‘অতিমানব’ কথাটি তো ক্রিকেটে কত জনের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এই বিশেষণের জন্য স্যার গ্যারি সোবার্সের চেয়ে বেশি উপযু্ক্ত কি কেউ কখনও ছিল? অতিমানব হয়ে তিনি জন্মাননি। তবে এই খেলাটি খেলেই অমন ঘোর লাগিয়েছেন, “মানুষের পক্ষে কী এসব সম্ভব!”
আর মাত্র ১১ দিন পর তার জন্মদিন। কিন্তু জীবনের ইনিংসে ৯০ পূর্ণ হলো না তার। স্রষ্টার ইচ্ছের কাছে এখানে সবাই অসহায়। তবে ক্রিকেট মাঠে তার নিজের যা কিছু করার ছিল, সেখানে অপূর্ণতা রেখেছেন সামান্যই। প্রায় সকল বিচারেই তিনি ছিলেন সর্বকালের সবচেয়ে প্রতিভাবান ক্রিকেটার, এই খেলার সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার।
দুই হাতেই একটি করে আঙুল বেশি নিয়ে জন্মেছিলেন সোবার্স। পরে অস্ত্রোপচার করে তা কেটে ফেলা হয়। তবে স্রষ্টা অকৃপণ হাতে প্রতিভার যে ভান্ডার তাকে দিয়েছিলেন, তা কী আর কেড়ে নেওয়া যায়!
বারবাডোজের হয়ে ফুটবল, বাস্কেটল ও গলফও খেলেছেন তিনি। তার আসল পরিচয় যেটি, সেই ক্রিকেটে দেখিয়েছেন এক খেলার ভেতরও কত কিছু করা যায়। এই কারণেই পরিসংখ্যানের ঝনঝনানি, নানা যুগের বাস্তবতা এবং নানা ক্রিকেটীয় সমীকরণ তার কাছে ঠুনকো হয়ে যায়। এজন্যই অসংখ্য লোকে তাকে মনে করেন সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার তথা সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।
তিনি এমন একজন, জীবনে যদি একটিও উইকেট না নিতেন, তবুও তাকে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের ছোট্ট তালিকায় রাখতে হতো। যদি তিনি জীবনে একটিও রান না করতেন, তবুও তাকে দারুণ কার্যকর এক বোলার হিসেবে গণ্য করতে হতো।
ব্যাট হাতে প্রচুর রান ও সেঞ্চুরি তো করেছেনই। এর চেয়েও বড় ব্যাপার, রানগুলো কীভাবে করেছেন। বল জিনিসটা যে পেটানোর জন্যই, সেটা তিনি সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে দারুণ আগ্রাসী ও অভিজাত। অফ-সাইডে অবিশ্বাস্য।
বোলিংয়ে সত্যি বলতে, তার মতো এমন বহুমুখী বোলার ক্রিকেট ইতিহাসেই অতি বিরল। বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন করতেন, বাঁহাতি রিস্ট স্পিনও করতেন। স্পিনার হিসেবেই তার টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ১৭ বছর বয়সে। পরে পেস বোলিং করেছেন। স্রেফ কাজ চালানোর পেস বোলিং নয়। নতুন বলে আর প্রথম পরিবর্ত বোলার হিসেবেই বোলিং করেছেন ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ ইনিংসে। তার সেরা সময়ে গতিতে ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলেও ছাড়তেন…
ফিল্ডিংয়েও তিনি ছিলেন অসাধারণ। স্লিপে ও ক্লোজ-ইন ফিল্ডিংয়ে তাকে এখনও মনে করা হয় সর্বকালের সেরাদের একজন।
কেবল কিপিংটাই করেননি। অধিনায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন দারুণ আগ্রাসী। কখনও কখনও একটু বেশিই রোমাঞ্চকর, সেজন্য খেসারতও দিতে হয়েছে দলকে। এই কিপিং আর অধিনায়কত্বের কারণেই হয়তো তাকে মানুষের কাতারে রাখা যায়, নইলে হয়তো ক্রিকেট-ইশ্বরই বলতে হতো!
৯৩ টেস্টে ২৬ সেঞ্চুরিতে ও ৫৭.৭৮ গড়ে ৮ হাজার ৩২ রান, ২৩৫ উইকেট, ১০৯টি ক্যাচ, এসব পরিসংখ্যানই যথেষ্ঠ তার শ্রেষ্ঠত্ব বোঝাতে। তবে পরিসংখ্যানেরও আসলে সাধ্য নেই তাকে ফুটিয়ে তুলতে।
তার হাঁটাচলাতেই নাকি ফুটে উঠত, তিনিই এই খেলাটির সেরা! ধীর, অস্থিহীন চলন দেখে কেউ কেউ তাকে বলতেন ‘রাজপুত্র’। তবে ব্যাট-বল হাতে তিনি আসলে হয়ে উঠতেন রাজা।
১৯৩৬ সালে বারবাডোজের বে ল্যান্ডের চেলসি রোডে সোবার্সের জন্ম। তার বাবা ছিলেন একজন বণিক নাবিক। দ্বিতীয় বিশ্বযু্দ্ধের সময় ১৯৪২ সালে একটি জার্মান ইউ-বোটের টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যায় কানাডিয়ান একটি জাহাজ। সেখানেই সলিল সমাধি হয় তার বাবার।
কে জানে, হয়তো নিয়তি নির্ধারিতই ছিল!
কারণ, তার বাবা শ্যামন্ট সোবার্স নিজে ফুটবল খেলতেন, কিন্তু সন্তানদের খেলতে দিতে চাইতেন না। বাবার মৃত্যুর পর মা থেলমার কাছ থেকে অবাধ স্বাধীনতা পেলেন সোবার্সরা ছয় ভাই-বোন। খেলাধুলার সহজাত প্রতিভাও বিকশিত হতে থাকল দ্রুতই।

ক্রিকেট নিয়ে তার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতি তিনি মনে করতে পারতেন, ৮-৯ বছর বয়সে রাস্তায় ও সৈকতে খেলা। কখনও কখনও বাড়ির ভেতরে, দুই বাড়ির মাঝে সরু রাস্তায় খেলতেন। একটু বড় হয়ে বাড়ির কাছেই ওয়ান্ডারার্স মাঠে গিয়েছিলেন খেলা দেখতে ও স্কোরবোর্ড চালাতে। সেখানেই তিনি দেখেছিলেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের মহানায়ক ‘থ্রি ডব্লিউ’ ফ্র্যাঙ্ক ওরেল, এভারটন উইকস ও ক্লাইড ওয়ালকটকে। তার মনে স্বপ্নও গেঁথে গিয়েছিল।
১৫ বছর বয়সে বারবাডোজ পুলিশের হয়ে ক্লাব ক্রিকেটে নজর কাড়েন সোবার্স। ১৬ বছর বয়সে পা রাখেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। ১৭ বছর ২৪৫ দিন বয়সে টেস্ট অভিষেক ১৯৫৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জ্যামাইকায়। তখনও ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার, এখনও আছেন।
বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে অভিষেক, ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। তবে ৯ নম্বরে নেমে ব্যাটিং প্রতিভার ছাপও কিছুটা রেখেছিলেন। দুই ইনিংসে করেছিলেন ৪০ রান।
পরের টেস্ট ম্যাচটি খেললেন এক বছর পর এবং তখন তিনি পুরোদস্তুর অলরাউন্ডার। ক্রমে তার আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে ক্রিকেট আঙিনায়। বাঁহাতি স্পিনার সোবার্স হয়ে ওঠেন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন।
প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির জন্য অবশ্য অপেক্ষা করতে হয় ১৭ টেস্ট। সেই সেঞ্চুরিটি যখন পেলেন, ইনিংসটিকে এমন রূপ দিলেন যে, ক্রিকেট ইতিহাসে তা অমর হয়ে রইল। প্রথম সেঞ্চুরিতেই তিনশ রান আজও করতে পারেননি কেউ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে জ্যামাইকায় অধিনায়ক যখন ইনিংস ঘোষণা করলেন, সোবার্সের নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছে অপরাজিত ৩৬৫!
টেস্ট ক্রিকেটের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হয়ে সেটি টিকে ছিল ৩৬ বছর। ১৯৯৪ সালে তা পেরিয়ে যান ব্রায়ান লারা।
সেই ট্রিপল সেঞ্চুরিতে শুরু। পরের পাঁচ টেস্টে পাঁচ সেঞ্চুরি করে বুঝিয়ে দেন, ওই সাফল্য স্রেফ আচমকা নয়। সময় গড়ায় আর তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের সেরা। পুরো ১৯৬০-এর দশকজুড়ে সোবার্স অপ্রতিদ্বন্দ্বী অলরাউন্ডার। স্রেফ রাজত্ব করেছেন টেস্ট ক্রিকেটে।
জেরি আলেক্সান্ডারের অধিনায়কত্বে তার শুরু। পরে খেলেছেন কিংবদন্তি ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের নেতৃত্বে। সবচেয়ে বেশি খেলেছেন অবশ্য নিজে অধিনায়ক হিসেবে। ১৯৬৫ থেকে সাত বছর ৩৯ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
নেতৃত্বের শুরুর দিকটাও ছিল তার মতোই দাপুটে। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তিনি ১০৩ গড়ে ৭২২ রান করেন, ২০টি উইকেট ও ১০টি ক্যাচ নেন, পাঁচটি টেস্টেই টস জেতেন এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন।
১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জ্যামাইকায় অসাধারণ এক সেঞ্চুরিতে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে। চরিত্র বিরুদ্ধভাবে ৩৫৭ বলে ১১৩ করেছিলেন বলেই শুধু নয়, ম্যাচের সেটি ছিল তৃতীয় ইনিংস, উইকেট ছিল বিভীষিকা। সেখানেই তিনি অপরাজিত ছিলেন। উইকেটের অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, পরের ইনিংসে ইংল্যান্ড ৬৮ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে কোনোরকমে ম্যাচ বাঁচাতে পেরেছিল।
তার সেরা ইনিংস অবশ্য এটি বা সেই ৩৬৫ রানের ইনিংসও নয়। প্রায় সবার চোখেই তার সেরা ইনিংসটি টেস্ট ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে নেই।
১৯৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পর শূন্যতা পূরণে ‘রেস্ট অব দা ওয়ার্ল্ড’ ক্রিকেট দল গঠন করা হয়েছিল, যেটির অধিনায়ক ছিলেন সোবার্স। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডে টেস্ট খেলেছিল সেই দল। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট হয়েছিল। সেখানেই মেলবোর্নে ২৫৪ রানের একটি ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। যেটা দেখে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্র্যাডম্যান বলেছিলেন, “সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ায় মেলে ধরা সর্বকালের সেরা ব্যাটিং প্রদর্শনী।”
আরেক কিংবদন্তি অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেলেরর চোখেও সেটি সর্বকালের সেরা ইনিংস। সোবার্স নিজেও বলেছিলেন, “ব্যাট হাতে আমি সম্ভবত নিখুঁতের এত কাছাকাছি আর কখনও আসতে পারিনি।”
ওই ম্যাচগুলি তখন টেস্ট ক্রিকেটই ছিল। পরে টেস্ট মর্যাদা তুলে নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। রেকর্ড বই থেকে মুছে গেলেও লোকের স্মৃতিতে তা অমলিন।
ওই সময়ের অন্য ক্যারিবিয়ান গ্রেটদের মতো তিনিও ইংল্যান্ডে ও দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন প্রচুর। ওই সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট খেলে মাঝেমধ্যে ৫ পাউন্ড করে মিলত, কখনও কিছুই নয়। দেশের বাইরে খেলেই তাই জীবিকা নির্বাহ করতে হতো তাদের।
ল্যাঙ্কাশায়ারে র্যাডক্লিফের হয়ে লিগ ক্রিকেট খেলতেন তিনি। তখনও কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সুযোগ ছিল না। কারণে সেখানে খেলতে হলে তাকে ইংল্যান্ডে বেশ কয়েক বছর থাকতে হতো। ১৯৬৮ সালে কাউন্টিতে বিদেশি খেলোয়াড়দের তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হয়। দ্রুতই তাকে লুফে নেয় নটিংহ্যামশায়ার। মৌসুমে ৫ হাজার পাউন্ডের চুক্তি ছিল তার। ওই সময়ের জন্য যা চোখধাঁধানো অঙ্ক। তিনি প্রতিদানও দেন। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের একেবারে তলানি থেকে চতুর্থ স্থানে তুলে আনেন দলকে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওভারে ছয়টি ছক্কা মেরেছিলেন ওই বছরই।
অস্ট্রেলিয়ায় তিনি খেলেছেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে। সেখানেও গড়েছেন অবিশ্বাস্য সব কীর্তি। ১৯৬২-৬৩ সালে মাত্র ১০টি প্রথম-শ্রেণির ম্যাচে এবং ১৯৬৩-৬৪ সালে ৯টি ম্যাচে তিনি হাজারের বেশি রান করেন এবং ৫০-এর বেশি উইকেট নেন। তার আগে এমন কীর্তি আগে কেউ করতে পারেননি, তার পরেও পারেননি।
তখন তিনি বাঁ-হাতি রিস্ট-স্পিন বোলিংই বেশি করতেন এবং এই ঘরানায় তাকে মনে করা হতো সর্বকালের সেরা। পরে কাঁধের সমস্যার কারণে অর্থোডক্স স্পিন এবং পেস বোলিংয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।

তার অধিনায়কত্বের অধ্যায়ের শুরুটাও ছিল দুর্দান্ত। প্রথম তিনটি সিরিজ জিতেছিলেন এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অনানুষ্ঠানিক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে তা ম্লান হয়ে যায়। অধিনায়ক হিসেবে তার প্রধান শক্তি ছিল উদাহরণ সৃষ্টি করে নেতৃত্ব দেওয়া। তবে অনেক জিনিয়াস প্রতিভাবান ক্রিকেটারের মতোই, নিজের চেয়ে কম প্রতিভাবানদের প্রতি সহানুভূতি খুব বেশি ছিল না। হয়তো তাদের মানসিকতা ধরতেই পারেননি!
১৯৬৮ সালে ত্রিনিদানে ইংল্যান্ডকে ১৬৫ মিনিটে ২১৫ রান তোলার চ্যালেঞ্জ দিয়ে ইনিংস ঘোষণা করেছিলেন তিনি। জেফ বয়কট ও কলিন কাউড্রের দারুণ ব্যাটিংয়ে ইংলিশরা ম্যাচটি জিতে যায় আর তুমুল সমালোচনার শিকার হতে হয় সোবার্সকে।
১৯৬৮-৬৯ মৌসুম নাগাদ, যখন অস্ট্রেলিয়ায় হারছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সোবার্স তখন ম্যান ম্যানেজমেন্টের চেয়ে গলফ কোর্সেই বেশি সময় কাটাতেন।
তরুণ ক্রিকেটার বা তার সমসাময়িকদের সেরাটা বের করে আনতে পারছিলেন না এবং এক পর্যায়ে তাকে সরিয়ে রোহান কানহাইকে অধিনায়ক করা হয়। সোবার্সের নেতৃত্বে ৩৯টি টেস্টে জয় ৯টি, হার ১০টি, ড্র ২০টি।
তার অন্য সব পরিসংখ্যানের তুলনায় এই রেকর্ড খুবই ম্লান। হয়তো রক্ত-মাংসের মানুষ বোঝাতেই!
ওয়ানডে ক্রিকেটের আবির্ভাব হয় তার ক্যারিয়ারের শেষ দিকে। স্রেফ একটি ওয়ানডেই তিনি খেলেছেন ১৯৭৩ সালে। ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ১৯৭৪ সালে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৮৩ ম্যাচ খেলে ৮৬ সেঞ্চুরি ও ১২১ ফিফটিতে ২৮ হাজার ৩১৪ রান করেছে ৫৪.৮৭ গড়ে। উইকেট নিয়েছেন ১ হাজার ৮৩টি। ক্যাচ ৪০৭টি।
ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট খেলে ৯৫ ম্যাচে ৩৮.৩২ গড়ে ২ হাজার ৭২১ রান করে ও ১০৯ উইকেট নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেরা সময়ে পেলে এই সংস্করেও রাজত্ব করতেন।
মাঠের বাইরে তিনি বেশ কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক অপরিপক্কতা ফুটে ওঠে ১৯৭০ সালে, যখন জিম্বাবুয়ে (তখনকার রোডেশিয়া) একটি শ্বেতাঙ্গ-সংখ্যালঘু সরকার দ্বারা শাসিত হচ্ছিল, তখন সলিসবারিতে (বর্তমানে হারারে নামে পরিচিত) একটি ডাবল-উইকেট প্রতিযোগিতায় খেলার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন সোবার্স। এতে কোনো ভুল আছে বলে কখনও মনে করেননি তিনি। ৬০০ পাউন্ডের মতো মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক তার কাছে ছিল মুখ্য।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের জনগণ তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। সোবার্স বুঝতে পারেননি যে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। শ্বেতাঙ্গ-সংখ্যালঘু সরকারের নেতা ইয়ান স্মিথ তাকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করেন এবং পরে তাকে ‘মহান ব্যক্তি’ বলে অভিহিত করেন। বেশ কয়েকটি ক্যারিবীয় দেশ তখন সোবার্সকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী এরল ব্যারো তখন সোবার্সের পক্ষে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলেন।
মদ্যপানের আসক্তি ছিল তার। ঝোঁক ছিল জুয়াতে। শৈশবে তিনি মাঝেমধ্যে সারারাত ধরে ডমিনো খেলতেন, কিন্তু খ্যাতি ও সম্পদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘোড়দৌড়ে আরও বেশি করে জুয়া খেলতে শুরু করেন।
ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি বার্বাডোজের পর্যটন প্রসারের জন্য একটি পদ গ্রহণ করেন। তখন তার জুয়ার দেনা শোধ করেছিল সরকার।
তবে ক্রিকেট মাঠে তিনি ছিলেন রূপকথার চরিত্র।
ক্রিকেটের জন্যই ‘নাইটহুড’ পান তিনি ১৯৭৫ সালে।
তার আগে ও পরে অনেক অলরাউন্ডার দেখেছে ক্রিকেটে। জ্যাক ক্যালিসের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের নামটি নিয়ে কোনো তর্কের অবকাশই ছিল না।
ক্যালিসও অসাধারণ পারফর্ম করেছেন। পরিসংখ্যানে সোবার্সকে পেছনে ফেলেছেন, টেস্টের সঙ্গে ওয়ানডেতেও তার রেকর্ড চোখধাঁধানো। খেলেছেন টি-টোয়েন্টিও। বিভিন্ন সংস্করণে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জও তাকে নিতে হয়েছে।
কিন্তু ওই যে, এক খেলাতে এক সংস্করণেই সোবার্স এত কিছু করেছেন এবং এমনভাবে করেছেন, সেখানেই তিনি আলাদা। অনেকের চোখেই হয়তো তার চেয়ে ভালো কেউ আছে বা আসবে ভবিষ্যতে। কিন্তু তার মতো আর কেউ আসবে না।
ক্রিকেট যতদিন থাকবে, সোবার্স অনন্যই থাকবেন।
'আমার নায়ক, আমার অনুপ্রেরণা', সোবার্সের মৃত্যুতে ক্রিকেট বিশ্বের