Published : 18 Jul 2026, 02:47 AM
সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন এই ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি।
সোবার্সকে অনেকেই মনে করেন সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার ও সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। ব্যাটিংয়ে যেমন তিনি ছিলেন অসাধারণ, বোলিংয়ে তেমনি ছিলেন কার্যকর। বাঁহাতি পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি অর্থোডক্স স্পিন, রিস্ট স্পিন, সবই করতে পারতেন। ফিল্ডিংয়েও ছিলেন দুর্দান্ত, বিশেষ করে স্লিপে। শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবেও সর্বকালের সেরাদের তালিকায় রাখা হয় তাকে।
ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুক্রবার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ সোবার্সের মৃত্যুর খবর জানায়।
“একটি গ্রেট ইনিংসের সমাপ্তি ঘটল। আমাদের হৃদয়ে, এখন ও চিরকাল, স্যার গারফিল্ড সোবার্স।”
১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে সোবার্স টেস্ট খেলেন ৯৩টি। ২৬ সেঞ্চুরিতে ৫৭.৭৮ গড়ে রান করেন আট হাজার ৩২। ৩৪.০৩ গড়ে উইকেট নেন ২৩৫টি। ইনিংসে পাঁচ উইকেট ছয়বার।
পুরুষ ক্রিকেটে আইসিসির যে বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার দেওয়া হয়, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে সেটির নামকরণ করা হয় ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি।’
১৯৫২-৫৩ মৌসুমে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সোবার্সের অভিষেক হয় স্রেফ ১৬ বছর বয়সে। এর এক বছর পর জ্যামাইকায় তার টেস্ট অভিষেক হয় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। যেখানে তিনি ৯ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৪ ও ২৬ রান করেন, এবং ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ৭৫ রানে নেন ৪ উইকেট।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের টেস্টগুলোয় বোলার হিসেবে খেলেন সোবার্স। ২৩ বছর বয়সে করেন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। তবে সেদিন শুধু সেঞ্চুরি করেই থামেননি তিনি, সেটিকে রূপান্তর করেন ট্রিপল সেঞ্চুরিতে! ১৯৫৮ সালে স্যাবিনা পার্কে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৬৫ রানের ওই ইনিংস খেলেন তিনি। তাতে ১৯৩৮ সালে লেন হাটনের করা ৩৬৪ ছাড়িয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড লেখা হয় নতুন করে।
ওই এক ইনিংসের পর তার ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় প্রায় ১৫ বেড়ে যায় এবং পরের টেস্টেই তা প্রথমবার স্পর্শ করে ৫০, সেখান থেকে আর কখনও পঞ্চাশের নিচে নামেনি। এমনকি ১৯৫৯ সালের শুরু থেকে ১৯৭৪ সালে ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত, তার গড় কখনও ৫৬ এর নিচে নামেনি।
সোবার্সের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটি টিকে ছিল ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৭৫ রানের ইনিংস খেলে সেটি ভেঙে দেন আরেক ক্যারিবিয়ান ব্রায়ান লারা। সেটির সাক্ষী ছিলেন সোবার্স।
পরের দুই ইনিংসেও সেঞ্চুরির স্বাদ পান সোবার্স। ওই ট্রিপল সেঞ্চুরি থেকে ১০ ইনিংসের মধ্যে শতক করেন মোট ছয়টি! যার তিনটি ১৯৫৮-৫৯ মৌসুমে ভারত সফরে।
পরের বছর ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে আট ইনিংসে ১০১.২৮ গড়ে সোবার্স করেন ৭০৯ রান। এই সিরিজে ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের সঙ্গে ৩৯৯ রানের মহাকাব্যিক জুটির পথে ২২৬ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। এরপর আসে অস্ট্রেলিয়া সফরের চ্যালেঞ্জ এবং আবারও জ্বলে ওঠেন সোবার্স। ব্রিজবেন টেস্টে (ইতিহাসের প্রথম টাই টেস্ট) খেলেন ১৩২ রানের ইনিংস, সিডনি টেস্টে ১৬৮।
ওরেলের বিদায়ের পর, সোবার্সকে দলের নেতৃত্ব দেওয়া হয়। অধিনায়ক হিসেবেও যথেষ্ট সাফল্য পান তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দেন তিনি ৩৯টি টেস্টে।
১৯৬৮ সালে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগনের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে ছয়টি ছক্কা হাঁকান সোবার্স। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মারা প্রথম ক্রিকেটার হন তিনি।
এছাড়া বারবাডোজ ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়েও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেন সোবার্স। সব মিলিয়ে ৩৮৩টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ৫৪.৮৭ গড়ে তার রান ২৮ হাজার ৩১৪ রান। সেঞ্চুরি ৮৬টি। ২৭.৭৪ গড়ে উইকেট এক হাজার ৪৩টি।
সোবার্স লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেন ৯৫টি। সেখানে তার রান তিন হাজারের কাছাকাছি, উইকেট একশর বেশি। ওয়ানডে ক্রিকেটের আবির্ভাবের সময়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার প্রায় শেষ দিকে। এই সংস্করণে একটিই ম্যাচ খেলেন তিনি, ১৯৭৩ সালে হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
ক্রিকেটে অবদানের জন্য ১৯৭৫ সালে তাকে নাইট উপাধি দেওয়া হয়। ২০০০ সালে উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক তাকে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, স্যার জ্যাক হবস, স্যার ভিভ রিচার্ডস ও শেন ওয়ার্নের সঙ্গে শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের একজন হিসেবে মনোনীত করে।
২০০৯ সালে আইসিসি হল অব ফেম-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয় সোবার্সকে।
১৯৩৬ সালে বারবাডোজে জন্ম সোবার্সের। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে তার নাবিক বাবা মারা যাওয়ার পর মূলত মায়ের কাছেই বড় হন তিনি। দুই হাতেই ছয়টি আঙুল নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সোবার্স এবং শৈশবেই বাড়তি আঙুলগুলো কেটে ফেলা হয়।
বাস্কেটবল, ফুটবল ও গলফসহ সব ধরনের খেলায় পারদর্শী ছিলেন সোবার্স। ক্রিকেটের পাশাপাশি এই তিনটি খেলাতেও তিনি জন্মভূমি বারবাডোজের প্রতিনিধিত্ব করেন।
'আমার নায়ক, আমার অনুপ্রেরণা', সোবার্সের মৃত্যুতে ক্রিকেট বিশ্বের