Published : 16 Jul 2025, 08:52 PM
জাতীয় নাগরিক পার্টির-এনসিপি পদযাত্রা ও সমাবেশকে ঘিরে সারাদিন দফায় দফায় হামলা, সংঘর্ষে গোপালগঞ্জ শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার পর কারফিউ জারি করা হয়েছে।
বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে শহরের কোথাও কোনো হামলা বা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা না ঘটলেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
শহরে রাত ৮টা থেকে কারফিউ শুরু হয়েছে। শহরে কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তেমন কোনো একটা দেখা যায়নি।
রাত সাড়ে ৮টায় শহর মোটামুটি শান্ত দেখা গেছে। দুপুরের পর থেকেই শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। সন্ধ্যার পর থেকে মানুষজন ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। শহরের বিভিন্ন স্থানে ইট ভাঙা, কাঠ, বাঁশ, টায়ার পুড়ানো ছাই দেখা গেছে। অনেক স্থানে সংঘর্ষে ব্যবহৃত সরঞ্জাম পড়েছিল।
শহরে যান চলাচল নেই বললেই চলে। কয়েকটি রিকশা চলতে দেখা গেছে। তবে কোনো ইজিবাইক বা অন্য কোনো পরিবহন নেই। যে কয়েকজনকে রাস্তায় দেখা গেছে তারাও বাড়িমুখো। তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক দেখা গেছে।
রাত সোয়া ৮টার দিকে এনসিপির সমাবেশস্থল শহরের পৌর পার্কের পাশে দিনমজুর মো. টুটুলের সঙ্গে কথা হয়। অনেকটা আতঙ্ক নিয়ে তিনি বলেন, “শহরের বেদ গ্রামে থাকি। আগে ঢাকায় চাকরি করতাম। করোনাভাইরাসের সময় চাকরি চলে যায়। পরে গোপালগঞ্জে চলে আসি। এখন দিনমজুরের কাজ করি। কাজ করে বাড়ি যাচ্ছি। আজকের ঘটনার পর শহরে দিয়ে হাঁটতে ভয় লাগছে।”
রিকশাচালক সোহেল বলেন, “দিনে রাজমিস্ত্রির কাজ করি। সন্ধ্যার পর রিকশা চালাই। কিন্তু আজকে প্যাসেঞ্জার নাই। আয়-রোজগার হচ্ছে না। তারপরও আতঙ্কের মধ্যে রাতে রিকশা নিয়ে বের হয়েছি।”
রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন সুমন শেখ। তিনি বলছিলেন, “কাজ করতে করতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। এখন বাড়ি ফিরছি। শহরে যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে শহরে চলতে ভয় লাগছে।”
রাত সাড়ে ৮টায় গোপালগঞ্জ সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এখন শহর শান্ত আছে। হামলাকারীরা কোথাও কোথাও আছে। তবে পুলিশের সঙ্গে তারা মুখোমুখি অবস্থানে নেই।
সারাদিনের হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পুলিশের ৩০ থেকে ৪০ জন আহত হয়েছেন জানিয়ে পরিদর্শক বলেন, শহরে এখন মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এক বার্তায় জানিয়েছে, বুধবার রাত ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গোপালগঞ্জে কারফিউ জারি থাকবে।
বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীদের সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার খবর এসেছে।

এনসিপির এই পদযাত্রা ও সমাবেশ ঘিরে মঙ্গলবার থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চলানো হয়।
বুধবার সকালে এনসিপি নেতারা গাড়িবহর নিয়ে শহরে ঢোকার আগেই পুলিশের গাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত হয়। পরে ইউএনওর গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।
এসবের মধ্যে বেলা দেড়টার দিকে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা মিছিল করে এসে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে গোপালগঞ্জ শহরের পৌরপার্ক এলাকায় সমাবেশ মঞ্চে হামলা চালায়।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে নেতারা পুলিশি নিরাপত্তায় টেকেহাট হয়ে মাদারীপুর যাওয়ার পথে দুপুর পৌনে ৩টার দিকে শহরের লঞ্চ ঘাট এলাকায় গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে ফের হামলা হয়।
এ সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের সংঘর্ষে গোপালগঞ্জ শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এ পরিস্থিতিতে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। পরে তারা সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে করে পুলিশ সুপার কার্যালয় ছাড়েন।
দুপুরে জেলা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় সন্ধ্যায় কারফিউ জারির ঘোষণা আসে।
আরও পড়ুন:
গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৩ লাশ: তত্ত্বাবধায়ক
সাঁজোয়া যানে করে পুলিশ সুপারের কার্যালয় ছাড়লেন এনসিপি নেতারা
গোপালগঞ্জে কী হচ্ছে, প্রশ্ন জামায়াত আমিরের
এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা-সংঘর্ষে গোপালগঞ্জ রণক্ষেত্র, ১৪৪ ধারা
হামলার শিকার এনসিপি নেতারা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে
গোপালগঞ্জে সমাবেশ শেষে এনসিপির গাড়িবহরে ফের হামলা
গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ মঞ্চে হামলা, বোমাবাজি
'মুজিববাদীরা' বাধা দিয়েছে, জবাব দেওয়া হবে: নাহিদ
গোপালগঞ্জে জুলাই পদযাত্রার আগে পুলিশের গাড়িতে 'ছাত্রলীগের' আগুন
গোপালগঞ্জে পুলিশের পর ইউএনওর গাড়িতে হামলা