Published : 17 Aug 2025, 09:06 PM
স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের দাবিতে বরিশালে চলমান কর্মসূচির মধ্যে এক চিকিৎসককে মারধরের প্রতিবাদে ও কর্মস্থলের নিরাপত্তার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
রোববার বিকাল ৩টা থেকে তারা কর্মবিরতি শুরু করেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল একেএম মশিউল মুনীর।
তবে তিন ঘণ্টা পর পুলিশি প্রহরায় ও পরিচালকের অনুরোধে জরুরি বিভাগের সেবা চালু করেছেন মিড লেবেলের চিকিৎসকরা।
পরিচালক মুশিউল মুনীর বলেন, “হাসপাতালের সামনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। এর মধ্যে দুপুর ২টার দিকে এক চিকিৎসককে মারধর করা হয়েছে। হাসপাতাল লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা ইটের আঘাতে কর্মচারীসহ দুইজন আহত হয়েছে।
“ঘটনার পর পরই হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা আমার কাছে বিচার চেয়েছেন। তাদের শান্ত হয়ে নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু চিকিৎসককে মারধর করায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। তাই চিকিৎসকরা দুপুর ২টার পর ভয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “পরে চিকিৎসা না পেয়ে রোগী ও রোগীর স্বজনরা কান্না করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের অনুরোধ করা হয়। বিকাল ৫টার পর পুলিশের সহযোগিতায় তাদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

“যে কয়েকজন চিকিৎসক এসেছেন তাদের দিয়ে আপাতত জরুরি সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ইন্টার্নদেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে। তারা শুধু জরুরি সেবা দিতে রাজি হয়েছে।”
আহত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-২ এর আইএমও দিলিপ রায় বলেন, “দায়িত্ব পালন শেষে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। কিন্তু পকেট গেট দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে কোনো কথা বলার সুযোগও দেয়নি- জাস্ট মব সৃষ্টি করে ফিজিক্যাল ও ভারবারলি অ্যাটাক করেছে।
“একজন বলে ‘ওকে দেখে নেব’। আরেকজন বলে ‘ওরে পাশে নে’। ওদের এটিটিউট ও চেহারার যে অবস্থা জীবনেও ভুলবো না। নিরপরাধ মানুষও ওদের দেখার বিষয় নয়। এভাবে কাজ করা যায় না।”
হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রাব্বি আল মামুন ফয়সাল বলেন, “বেলা ১২টার দিকে স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে হাসপাতালের সামনে আসে। এ সময় তারা হাসপাতালের গেটের সামনে অবস্থান নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে স্লোগান দেয়।”
“দুপুর ২টার দিকে তারা মেডিকেল অফিসার দিলিপ রায় স্যারকে মারধর করে। পরে পুলিশ তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করেন। এর কিছুক্ষণ পরই হাসপাতালের দিকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীরা। এতে আমাদের বাহাউদ্দিন নামের এক কর্মচারী এবং এক রোগীর স্বজন আহত হয়।”
এ ঘটনার পর কর্মস্থলের নিরাপত্তার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে আমরা গত ১৪ অগাস্ট কর্মবিরতিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতাল পরিচালক স্যারের অনুরোধ ও রোগীর দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় কর্মবিরতি প্রত্যাহার করি। এ সময় পরিচালক মহোদয়কে ৪৮ ঘণ্টার সময় দেয়া হয়।
“কিন্তু রোববার, ১৭ অগাস্ট আবার আন্দোলনের নামে কিছু দুষ্কৃতকারী মেডিসিন বিভাগের ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. দিলীপ রায় স্যারের উপর অতর্কিত হামলা করে। এছাড়া হাসপাতালের স্টাফদের উপর হামলা করে। হাসপাতাল ভবনকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে পুরো হাসপাতালে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।”

এমন পরিস্থিতিতে বিকাল ৩টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘটনায় উসকানিদাতা এবং জড়িতদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি করা হয়।
মিড লেভেল ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন সৈকত বলেন, “মহিউদ্দিন রনির নেতৃত্বে বেশ কিছু স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী হাসপাতালের প্রবেশ পথে অবস্থান নিয়ে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের হুমকি দেয়। চিকিৎসকের উপর এমন নির্যাতন ও হাসপাতালের সামনে তারা অবস্থান নেওয়ায় রোগীরা যেমন নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন, তেমনি আমাদের চিকিৎসকরা কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
“সেকারণে ঘটনার পর তারা কর্মস্থল ত্যাগ করেন। তবে হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। তাই পরিচালক স্যারের বিশেষ অনুরোধে ও পুলিশের করা নিরাপত্তায় এবং মুমূর্ষু রোগীদের স্বার্থে আমরা মিড লেভেল চিকিৎসকরা বিকেল ৫টার পর থেকে শুধু মাত্র জরুরি সেবা চালিয়ে যাচ্ছি।”
দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সারাদেশে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও হয়রানি বন্ধের দাবিতে সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। দাবির সপক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী অনশনও করছেন।
এই আন্দোলনের মধ্যে বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলার প্রতিবাদে রোববার বেলা ১১টায় নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চলাকালে আন্দোলনের সমন্বয়ক মহিউদ্দিন রনি বলেন, “অতিদ্রুত তারা যেন দাবি মেনে নেয়, সেটা লিখিতভাবে এবং কীভাবে তারা করবে রোডম্যাপ সহকারে যোগাযোগ করতে হবে।”
তার সঙ্গে থাকা তাহমিদ ইসলাম দাইয়ান বলেন, “আজকে ২১ দিন হয়েছে আমরা আন্দোলন করছি। কিন্তু এখনো আমরা প্রশাসনিকভাবে এখনো কিছু পাইনি। এর মধ্যে ডিজির উসকানিতে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।”

পরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে হাসপাতালের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। সেখানে গিয়ে তারা নানা ধরনের স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় তারা হাসপাতালের পরিচালককে তাদের কাছে আসার জন্য এক ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়।
এ সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে দুই স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সামনের সড়কে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। এছাড়াও গেটের ভিতরে ছিল আনসার সদস্যরা।
এর মধ্যেই হাসপাতালের এক চিকিৎসককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও নিক্ষিপ্ত ইটের আঘাতে কর্মচারীসহ দুইজন আহত হয়েছে।
চিকিৎসককে মারধর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনার পর তারা সেখান থেকে চলে এসে বেলা ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে এসে অবস্থান নেয়।
সেখানে তাদের সঙ্গে কথা বলতে জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি আসলেও মহিউদ্দিন রনি কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। পরে সেখানে এক ঘণ্টার মতো অবস্থান করে চলে যান আন্দোলনরতরা।
বরিশাল মহানগর উপ-পুলিশ কমিশনার ইমদাদ হোসেন বলেন, “আমরা সকাল থেকে হাসপাতালের সামনে অবস্থানে ছিলাম। আন্দোলনের মধ্যে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। কয়েকজন ইট-পাটকেল নিক্ষেপের চেষ্টা করেছিলো। আমরা তাদের নিবৃত্ত করতে পেরেছি। এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”
পুরানো খবর
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার: বরিশালে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার: বরিশালে এবার সড়ক অবরোধের সঙ্গে আমরণ অনশন
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার: স্বাস্থ্যের ডিজির আহ্বানে সাড়া দেয়নি আন্দোল
আন্দোলনের মধ্যে বরিশাল মেডিকেলে অকেজো যন্ত্রপাতি মেরামত শুরু
'ব্লকেডে' ভোগান্তি বরিশাল নগরে, বুধবার সারা বিভাগে
বরিশালে স্বাস্থ্য সংস্কারের আন্দোলনের অনশনে অসুস্থ ২ শিক্ষার্থী