Published : 13 Aug 2025, 10:17 PM
স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের তিন দাবিতে বরিশালে চলমান আন্দোলনের মধ্যে অনশনে বসা শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের আহ্বানে সাড়া দেননি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ ছাড়া বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অনশনে বসা শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য দুটি মেডিকেল টিম গঠনের কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর।
বুধবার দুই দফা চেষ্টা করেও শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙ্গাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবু জাফর। এদিকে ছাত্র-জনতার ব্যানারে চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজও ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনের মধ্যে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সাত দাবিতে কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালক আবু জাফর কর্মকর্তাদের নিয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান গেইটের সামনে অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে যান। এ সময় অনশনে থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি।
পরে আবু জাফর মেডিকেল কলেজের সভাকক্ষে হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবাদিক প্রতিনিধিসহ সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময় শেষে সেবাগ্রহীতাদের নিয়ে আবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আন্দোলন স্থলে যান তিনি।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায় জুস খাইয়ে তাদের অনশন ভাঙ্গানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে হাসপাতাল এলাকা ছেড়ে চলে যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
অনশনে বসা শাফিন মাহমুদ বলেন, “ভাইয়েরা ১৭ দিন ধরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের তিন দাবিতে আন্দোলন করছেন। আমরাও তিন দিন ধরে অনশন করছি। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
“স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এসে যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো সমাধান দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অনশন করব। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যদি দেশের মানুষের জন্য সঠিক চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করা হয়, তবে সেই মৃত্যু আমরা মেনে নেব।”
আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী মহিউদ্দিন রনি বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রতিনিধির বৈঠক হয়নি, সুতরাং তার সঙ্গে আমাদের আনুষ্ঠানিক কোনো কথা হয়নি।
“তবে তিনি অনশনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। শিক্ষার্থীরা তাকে জানিয়েছে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা না আসা পর্যন্ত তারা অনশন চালিয়ে যাবেন।”
তিনি বলেন, “আমাদের সুশৃঙ্খল আন্দোলনের মধ্য দিয়েও যেহেতু কারও টনক নড়াতে পারিনি, তাই শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা দেখে আমরাও গণঅনশনে যাচ্ছি। সেইসঙ্গে ‘ব্লকেড’ কর্মসূচিও চলবে।”
দুপুরে ১টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত নগরের রূপাতলী ও নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেছেন ছাত্র-জনতা।
এর মধ্যে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে; এতে আটজন আহত হয়েছেন বলে দাবি প্রধান সমন্বয়কারী রনির।
ঘটনাটি খতিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন এয়ারপোর্ট থানার ওসি জাকির শিকদার।

অনশনরত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় মেডিকেল টিম গঠন
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অনশনরত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য দুটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আরপি ডা. শরীফ উদ্দিন রায়হানকে প্রধান করে আলাদা মেডিকেল টিম গঠন করার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক এ কে এম মশিউল মুনীর।
টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- মেডিসিন ৩ নম্বর ইউনিটের আইএমও স্বপ্না বেগম, মেডিসিন ২ নম্বর ইউনিটের আইএমও মেহেদী হাসান সৃজন, মেডিসিন ২ নম্বর ইউনিটের আইএমও দিলিপ রায়, মেডিসিন ১ নম্বর ইউনিটের আইএমও মো. আবু নোমান, মেডিসিন ৩ নম্বর ইউনিটের আইএমও মো. সালেহ উদ্দীন ও মেডিসিন ৩ নম্বর ইউনিটের আইএমও সাজ্জাদ উজ্জামান।
মেডিকেল টিমকে হাসপাতালের সামনে অনশনরত শিক্ষার্থী ও ছাত্র-জনতার সার্বিক চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মশিউল মুনীর।
এ ছাড়া অনশন স্থানে হাসপাতালের পক্ষ থেকে ফ্যান, ফোম, স্ট্যান্ডসহ স্যালাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক মশিউল মুনীর বলেন, অনশনরত শিক্ষার্থীদের ওয়ার্ডে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন। তারা ওয়ার্ডের বেডে চিকিৎসা নিলে সুস্থ থাকবেন। হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাদের ওয়ার্ডের আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তির সৃষ্টি হলে ব্যবস্থা: স্বাস্থ্যের ডিজি
বরিশালে স্বাস্থ্য সংস্কারের আন্দোলনের সঙ্গে একমত পোষণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু জাফর বলেছেন, আন্দোলন ঘিরে বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তির সৃষ্টি হলে ব্যবস্থা নেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বুধবার দুপুরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সভাকক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবাদিক প্রতিনিধিসহ সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এ কথা বলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আবু জাফর বলেন, “আমরা কি সরকারের সঙ্গে বিনা কারণে বিরোধ সৃষ্টি করতে চাই, না-কি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অন্য কোনো ফায়দা লুটতে চাই। সেটাও আমাদের আরেকবার চিন্তা করতে হবে। তবে এই সুযোগ আমরা দিতে চাই না।
“আমরা তাদের প্রতি সহনীয় এবং সীমাবদ্ধভাবে সহনীয় থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু এটা যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে চলে যায়, তারা যদি মনে করে বিশৃঙ্খলা ও জনভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। সেটা তারা ব্যবস্থা নেবে।”
তিনি বলেন, “দুর্নীতি দমন ও সংস্কারের জন্য সরকার কাজ করছে। সবাই মিলে কাজ করতে চাই।”
এ সময় হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ ছায়েদুল হকসহ বরিশালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

শের-ই-বাংলা মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির হুঁশিয়ারি
বরিশালে স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার চলমান আন্দোলনের মধ্যে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
বুধবার দুপুরে মেডিকেল কলেজের সভাকক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফরের কাছে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সাত দফা দাবি পেশ করে এই আল্টিমেটাম দেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের প্রতিনিধি নাজমুল হুদা বলেন, “ছাত্র-জনতার আন্দোলন যে কারণে হচ্ছে, সেই স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার আমরাও চাই। তবে সেটি অবশ্যই যৌক্তিক পথে, যৌক্তিকভাবে হোক। আন্দোলনের কারণে সৃষ্ট ভোগান্তি আমরা সাপোর্ট করতে পারছি না।”
দাবিগুলো হলো- ১. কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ২. অ্যাডমিশন এবং পোস্ট অ্যাডমিশন ওয়ার্ডে আনসার সদস্যদের দ্বারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ৩. হাসপাতালে দর্শনার্থী প্রবেশ দর্শনার্থী কার্ডের মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একজন রোগীর সঙ্গে একজন দর্শনার্থী থাকতে পারবে। ৪. হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এবং ক্যাজুয়ালটি বিভাগকে কার্যকর ও উন্নত করা।
৫. হাসপাতালের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যে-সব পরীক্ষা চালু নেই সেগুলো দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করা। ৬. হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৭. হাসপাতালের বেড সংখ্যার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি নেওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
নাজমুল হুদা বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং নিয়মিত কাজের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকরা সঠিকভাবে দায়িত্বপালনে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
দাবিগুলোর বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না পেলে এবং চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফরা হয়রানির শিকার হলে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ইন্টার্নদের এমন আল্টিমেটামের হুঁশিয়ারির পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু জাফর সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।