Published : 16 May 2025, 11:36 PM
ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যাওয়া মাগুরার সেই আট বছরের শিশুটির বই ও খাতা যত্ন করে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছেন তার মা।
শিশুটি সেই খাতার একটি পাতায় তার ‘স্বপ্নের স্কুলে’ পড়ার কথা লিখে রেখেছে, যেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর বই দেওয়া হয়।
মেয়ের হাতের স্পর্শ থাকা সেই বই আর খাতাই এখন মায়ের কাছে থাকা একমাত্র স্মৃতি। তিনি বুকে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “আমার সোনার লেখাপড়ায় মন ছিল। আর কিছু তো নেই, এইগুলোই আছে।”
কথা বলতে বলতে শিশুটি মা একটি খাতা এগিয়ে দেন। উল্টাতে উল্টাতে একটি পাতায় চোখ আটকে যায়। একপাশে জামা পড়া একটি শিশুর ছবি এঁকেছিল শিশুটি। আর আরেক পাশে লিখেছে, “মিতু আমাদের প্রতিবেশী। তার বাবার একটি লাইব্রেরি আছে। মিতুর বড় বোন হাইস্কুলে পড়ে। সেই দোকানের নাম পুবালি লাইব্রেরি।
“সেখানে তিনি আমাদের আদর করেন। বড়ো মজার মজার বই পাওয়া যায়। (বড়) হয়ে আমি সেই স্কুলে পড়ব। মিতুর মা হাসপাতালে কাজ করেন।”
খাতার এই পাতাটিতে শিশুটির শ্রেণি শিক্ষকের স্বাক্ষরও রয়েছে। ২৯ জানুয়ারি, ২০২৫ সাল।
এ সময় তার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলেন শিশুটির বড় বোন; রোজার ছুটিতে স্কুল বন্ধ থাকায় যার শ্বশুরবাড়ি সদর উপজেলা নিজনান্দুয়ালির গ্রামে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে সে মারা যায়।
মাগুরার আলোচিত সেই শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ের জন্য শনিবার দিন রেখেছে আদালত।
সারাদেশে সমালোচনার জন্ম দেওয়া এই মামলাটির বিচারকাজও খুব দ্রুত সম্পন্ন হতে চলেছে। ঘটনার মাত্র দুই মাস ১১ দিনের মাথায় এই মামলার রায় হতে চলেছে।
৬ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার শিশুটি তার বোনের বাড়ি বেড়াতে এসে ধর্ষণের শিকার হয়। সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায়।
১৩ এপ্রিল মাগুরার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলাউদ্দিন। মামলা চার আসামি হচ্ছে- শিশুটির বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখ, বোন জামাই সজীব শেখ, তার ভাই রাতুল শেখ ও তাদের মা জাহেদা বেগম। তারা কারাগারে আছেন।
রায়ের আগের দিন শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে শিশুটির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিস্তব্ধ নিরবতা। বাড়িতে শিশুটির মা আর বড় বোন রয়েছে।
বাড়ির ভেতরে দুটি ঘর; একটিতে মা আর মেয়ে থাকেন। অন্যটি গরু রাখার জন্য।
খুব বেশি কথা বলতে চাননি শিশুটির মা। তিনি শুধু বার বার তার মেয়ের ধর্ষণ ও হত্যার ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছিলেন। এ সময় তিনি কাঁপছিলেন।
শিশুটির মা জানান, তিনি শনিবার রায় শোনার জন্য আদালতে যাবেন।
বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের জারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যেত শিশুটি। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে। প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পাশেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়। মা বলছিলেন, মেয়ে মাঝে মাঝে বলত সে এই স্কুলে পড়বে। তার সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।
শুক্রবার বিধায় স্কুল বন্ধ ছিল।
পরে জারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সবিতা রানীর সঙ্গে মোবাইলে কথা হলে তিনি শিশুটির কথা স্মরণ করে বলেন, সে খুব শান্তশিষ্ট ছিল। এভাবে যেন আর কোনো মেয়ের জীবন শেষ না হয়। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
শিশু সংগঠন এনসিপিএসের জেলা সভাপতি তৃষা বৈদ্য (১৭) বলছিল, “শিশুদের সঙ্গে এ ধরনের নৃশংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর সঠিক বিচার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস না পায়।”
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম মুকুল বলেন, “ধর্ষণের কারণে যে শিশুটি মারা গেছে তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পেরেছে। আমরা আশাবাদী, আদালত ন্যায়বিচার করবে। হিটু শেখের সর্বোচ্চ শাস্তিই হবে। অন্যদেরও যার যার অপরাধ অনুযায়ী সাজা হবে।”
জেলা পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা বলেন, “আলোচিত এই মামলায় রায় ঘোষণা উপলক্ষে আদালত চত্বর ও এর আশপাশে শনিবার সকাল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
একনজরে শিশু ধর্ষণ-হত্যা
১ মার্চ: রোজার ছুটিতে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আট বছরের শিশুটি তার বোনের বাড়ি বেড়াতে আসে।
৬ মার্চ: সকালে শিশুটি তার বোনের বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হয়।
ওইদিনই শিশুটিকে মাগুরা সদর হাসপাতাল থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতেই তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
৭ মার্চ: শিশুটির চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।
৮ মার্চ: পরে তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এদিন শিশুটির মা চারজনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মাগুরা সদর থানায় একটি মামলা করেন। আসামিরা হলেন- শিশুটির বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখ, বোনের জামাই সজীব শেখ, তার ভাই রাতুল শেখ ও তাদের মা জাহেদা বেগম। শুরু থেকেই তারা পুলিশ হেফাজতে ছিলেন।
৯ মার্চ: শিশুটির ধর্ষণের বিচারের দাবিতে ছাত্র-জনতার অব্যাহত বিক্ষোভ।
১০ মার্চ: নিরাপত্তার কারণে রাতে শুনানি করে চার আসামিকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
১২ মার্চ: তিন পুরুষ আসামির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ।
১৩ মার্চ: শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায়। আসামিদের গ্রামের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
ওইদিনই বিমান বাহিনীর একটি উড়োজাহাজে শিশুটির মরদেহ মাগুরায় নিয়ে যাওয়া হয়। দুই দফা জানাজা শেষে তাকে রাতে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
১৪ মার্চ: পুলিশ জানায়, শিশুটি মারা যাওয়ায় আগের ধর্ষণ মামলার পাশাপাশি হত্যা মামলাও হয়েছে।
১৫ মার্চ: ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
৮ এপ্রিল: মাগুরার পুলিশ সুপার জানান, হিটু শেখের ডিএনএ প্রতিবেদনে শিশুটিকে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৩ এপ্রিল: মাগুরার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলাউদ্দিন।
২০ এপ্রিল: শুনানি শেষে আদালত অভিযোগ গঠনের জন্য ২৩ এপ্রিল দিন রাখেন।
২৩ এপ্রিল: অভিযোগ গঠনে শেষে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়।
২৭ এপ্রিল: শিশুটির মা ও মামলার বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
৮ মে: মামলার মোট ২৯ জনের সাক্ষ্যপ্রদান শেষ হয়।
১৩ মে: দুই দিনের যুক্তিতর্ক শেষে মাগুরা জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান আলোচিত এই মামলার রায়ের জন্য ১৭ মে দিন রাখেন।
** মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন মনিরুল ইসলাম মুকুল।
** মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রালয় থেকে বিশেষ কৌসুলি হিসেবে (অ্যাটর্নি জেনারেল সমমর্যাদার) আইনজীবী এহসানুল হক সমাজীকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন:
মাগুরার আলোচিত সেই শিশু ধর্ষণ-হত্যার রায় ১৭ মে
মাগুরায় শিশু ধর্ষণ-হত্যা: সাক্ষ্য না দেওয়ায় ২ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে
মাগুরায় শিশু ধর্ষণ-হত্যা: সাক্ষ্য না দেওয়ায় ২ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে
মাগুরায় শিশু ধর্ষণ-হত্যা: পঞ্চম দিনে চিকিৎসক-নার্সের সাক্ষ্য
মাগুরায় শিশু ধর্ষণ-হত্যা: তৃতীয় দিনে ১০ জনের সাক্ষ্য
মাগুরার সেই শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ
মাগুরার সেই শিশু ধর্ষণ-হত্যার বিচার শুরু
মাগুরার শিশু ধর্ষণ-হত্যা: ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের শুনানি
মাগুরার সেই শিশু ধর্ষণ: হিটু শেখের ডিএনএ প্রতিবেদন, 'সব পজিটিভ'