Published : 31 Dec 2025, 10:29 PM
কোটি প্রাণের ভিড়ে তারা ছিলেন সগৌরবে। ছিলেন কর্ম-গুণে অনন্য, আলো ছড়িয়েছেন জীবনভর।
চলতি বছর নিভে গেছে এমনই অনেক প্রাণপ্রদীপ। শোক সাগরে ভাসিয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে।
তবু তাদের ছড়ানো দ্যুতি সঞ্চার করছে নতুন প্রাণের, নতুন ভবিষ্যতের।
শওকত আলী
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ এম এম শওকত আলীর জীবনাবসান হয় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। ৮২ বছর বয়সে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
শওকত আলী ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে শওকত অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি গবেষক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কৃষি, খাদ্য, দারিদ্র্য বিমোচন, সুশাসন ও মানবাধিকার বিষয়ে নিয়মিত কলাম লিখতেন পত্রিকায়।

আবদুল্লাহ আল নোমান
বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমান মারা যান ২৫ ফেব্রুয়ারি।তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
ষাটের দশকের শুরুতে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। মেননপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর চট্টগ্রামের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
ছাত্রজীবন শেষে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর হাত ধরে নোমান যোগ দেন শ্রমিক রাজনীতিতে। পূর্ববাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। গোপনে ভাসানীপন্থি ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত হন। ১৯৭০ সালে ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হন।
১৯৭১ সালে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষে ন্যাপের রাজনীতিতে তার পথ চলা। এরপর ১৯৮১ সালে যোগ দেন বিএনপিতে।
১৯৯১ ও ২০০১ সালে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নোমান। খালেদা জিয়ার দুই সরকারের আমলে মৎস্য ও পশু সম্পদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, বন ও পরিবেশ এবং খাদ্য মন্ত্রণায়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব তিনি পালন করেন।

শাহবাজ সানী
ছোট পর্দার তরুণ অভিনেতা শাহবাজ সানী ৩০ বছর বয়সে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে উত্তরার ঢাকা স্পেশালাইড হাসপাতালে মারা যান।
২০১৮ সালে ‘আব্দুল্লাহ’ নাটক দিয়ে বিনোদন জগতে পা রাখেন সানী। কাজ করেছেন বহু নাটকে। ‘চরের মাস্টার, ‘বিফলে মুল্য ফেরত’, ‘ট্রাভেল শো’, ‘মহব্বত’, 'মন দরিয়া', 'মজনু ভাই', 'রুম সার্ভিস', 'দালাল হইতে সাবধান' ইত্যাদি নাটকে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন সানী।
এই অভিনেতার শেষ নাটক ছিল 'জামাইয়ের মাথা গরম'।

মহিউদ্দিন আহমদ
সাবেক রাষ্ট্রদূত বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমদের জীবনাবসান হয় গত ২ মার্চ রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
সাবেক কূটনীতিক মহিউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তখন তিনি হংকং মিশনে বাণিজ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
১৯৬৩ সালে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন।
সেনেগাল ও নেপালে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূতের মহিউদ্দিন ১৯৯৯ সালে অবসর নেওয়ার আগে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বও পালন করেন।
অবসর নেওয়ার পর মহিউদ্দিন জনতা ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার পরিচালক ছিলেন। এছাড়া নাবিল ব্যাংক নেপালের পরিচালক এবং র্যাংগস গ্রুপের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।
তিনি ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসে এবং বিভিন্ন স্থানীয় পত্রিকা, যেমন ইত্তেফাক এবং বেগম ম্যাগাজিনে লেখক ও ফটোগ্রাফার হিসাবেও কাজ করেছেন।

টি এ চৌধুরী
বাংলাদেশের প্রখ্যাত গাইনি চিকিৎসক তৌহিদুল আনোয়ার চৌধুরী (টি এ চৌধুরী) মারা যান গত ৯ মার্চ; তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণ করা টি এ চৌধুরী ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে এমবিবিএস পাস করেন। এডিনবরার রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস করেন।
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যার এই চিকিৎসক ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান।

সৈয়দ মনজুর এলাহী
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী মারা যান গত ১২ মার্চ; ৮৩ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করে মঞ্জুর এলাহী সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে তখনকার পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে বিদেশি একটি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন মঞ্জুর।
১৯৭৫ সালে ঢাকার হাজারিবাগের ওরিয়ন ট্যানারি নিলামে উঠলে তা কিনে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এপেক্স ট্যানারি’। বর্তমানে ১১টি কোম্পানি রয়েছে এপেক্স গ্রুপের।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুই দফা নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মঞ্জুর এলাহী বাংলাদেশে বেলজিয়াম দূতাবাসের অনারারি কনসাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স (এমসিসিআই) এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এই সভাপতি এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ছিলেন। বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি।

সন্জীদা খাতুন
বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি সন্জীদা খাতুন গত ২৫ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে ১৯৭৮ সালে সেখান থেকেই পিএইচডি করেন সন্জীদা খাতুন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে তিনি অবসর নেন।
তার লেখার একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ব্যাপক পরিসরে জনমানসে কবিগুরুকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার।
গত শতকের ষাটের দশকের শুরুর দিকে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সন্জীদা খাতুন। তার তত্ত্বাবধানে ছায়ানট এখন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান, যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের প্রসারে কাজ করছে।
ছায়ানটের পাশাপাশি জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। প্রচলিত ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নালন্দার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। এশিয়াটিক সোসাইটির সাম্মানিক ফেলো ছিলেন তিনি।
একাধারে শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক সন্জীদা খাতুন ভারত সরকারের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ খেতাবে ভূষিত হন।
একুশে পদক, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কারে (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) ভূষিত সন্জীদা ১৬টি বই লিখেছেন।

গুলশান আরা আহমেদ
‘ব্যাচেলর পয়েন্টে’ নাটক দিয়ে পরিচিতি পাওয়া অভিনেত্রী গুলশান আরা আহমেদ গত ১৫ এপ্রিল মারা যান। ৫৭ বছর বয়সী এ অভিনেত্রীর জীবনাব্সান হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে।
২০০২ সালে টেলিভিশনের নাটক দিয়ে গুলশান আরার অভিনয় জীবন শুরু হয়। তার প্রথম চলচ্চিত্র প্রয়াত পরিচালক এনায়েত করিমের ‘কদম আলী মাস্তান’।
এছাড়া ‘হৃদয়ের কথা’, ‘ডাক্তার বাড়ি’, ‘ভালোবাসা আজকাল’, ‘লাল শাড়ি’সহ আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন গুলশান আরা।

জয়নাল আবেদীন
প্রবীণ সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন গত ১৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে মারা যান; তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
লেখাপড়া শেষে ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি বার্তা সংস্থা ‘এনা’র বার্তা সম্পাদক ছিলেন।
মর্নিং নিউজ, ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে কাজ করেছেন জয়নাল আবেদীন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্থান টাইমসে ঢাকার সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করেছেন দীর্ঘদিন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য জয়নাল আবেদীন ২০০৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

দাউদ হায়দার
‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’- পংক্তিমালা এসেছিল যার কলম হয়ে, সেই নির্বাসিত কবি দাউদ হায়দার জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে অনন্তে পারি জমান গত ২৬ এপ্রিল।
৭৩ বছর বয়সী এই কবি জার্মানির রাজধানী বার্লিনের একটি বয়স্ক নিরাময় কেন্দ্রে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৭৪ সালে দেশ ছাড়ার পর কয়েক বছর কলকাতায় কাটিয়ে ১৯৮৭ সালে সেখান থেকে জার্মানিতে চলে যান দাউদ হায়দার। এরপর থেকে সেখানেই ছিলেন।
১৯৭৪ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় তার কবিতা ‘কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়’ প্রকাশিত হলে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের’ অভিযোগে তার বিরূদ্ধে মামলা হয়। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে ১১ মার্চ তাকে আটক করে পুলিশ।
২০ মে মুক্তি দেওয়া হলেও কবিকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি তখনকার সরকার। পরদিন সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে তাকে একপ্রকার খালি হাতে কলকাতায় পাঠানো হয়।
দাউদ হায়দারের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’, ‘সম্পন্ন মানুষ নই’, ‘নারকীয় ভূবনের কবিতা’, ‘যে দেশে সবাই অন্ধ’, ‘ধূসর গোধূলি ধূলিময়’, ‘আমি ভালো আছি, তুমি?’
তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আরও রয়েছে-‘নির্বাসিত’, ‘সংগস অব ডেস্পায়ার’, ‘এই শাওনে এই পরবাসে’, ‘বানিশম্যান্ট’, ‘আমি পুড়েছি জ্বালা ও আগুনে’, ‘এলোন ইন ডার্কনেস অ্যান্ড আদার পোয়েমস’, ‘হোল্ডিং অ্যান আফটারনুন অ্যান্ড আ লিথ্যাল ফায়ার আর্ম’, ‘অবসিডিয়ান’।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী
প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী, সুরকার, সংগ্রাহক, গবেষক ও লেখক মুস্তাফা জামান আব্বাসীর জীবনাবসান হয় গত ১০ মে। সেদিন ভোরে বনানীর ইয়র্ক হাসপাতালে তার মৃত্যুবরণ করেন ৮৯ বছর বয়সী এ শিল্পী।
ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, দেহতত্ত্ব, মুর্শিদী, চটকা, মারফতী, বাউল, হাসনগীতিসহ গ্রামবাংলার নানা ঢঙের লোকগীতি শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর কণ্ঠে।
জীবনভর গানের সঙ্গে কাটানো মুস্তাফা জামান আব্বাসী গবেষক হিসেবেও দেশীয় সংগীতের বৈচিত্র্যের সন্ধান করে গেছেন। ইসলামি ও লোকধারার গান সংগ্রহ এবং তা জনপ্রিয় করতে কাজ করেছেন।
ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ‘কাজী নজরুল ইসলাম এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদ গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্রের’ গবেষক হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগীত সম্মিলনে উপস্থাপন করে গেছেন এ দেশের সংগীত বৈভব।
বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভিতে ‘আমার ঠিকানা’ ও ‘ভরা নদীর বাঁকে’ শিরোনামে দুটি সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। একসময় পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং জাতীয় সংগীত কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা একাডেমির এই সম্মানিত ফেলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।
সংগীতে অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন মুস্তাফা জামান আব্বাসী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কাজের জন্য ২০১৩ সালে নজরুল মেলায় তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।
কবি, লেখক ও গবেষক মুস্তফা জামান আব্বাসীর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০। ভাওয়াইয়া গানের ওপর তার দুটি বই ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’ এবং ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি-২’ এ ১২০০ গানের কথা বলা আছে।

বিচারপতি শামসুল হুদা মানিক
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামছুল হুদা মানিকের জীবনাবসান হয় গত ২৫ মে, তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
আইন পেশায় থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শামছুল হুদা মানিক গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর শামছুল হুদা মানিক হাই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পরও তিনি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

মোস্তফা মোহসীন মন্টু
গণফোরাম সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মোস্তফা মোহসীন মন্টু গত ১৫ জুন ৮০ বছর বয়সে মারা যান।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে গণফোরামে নাম লেখানো বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
সত্তরের দশক থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় এই আওয়ামী লীগ নেতা ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত মন্টু যুবলীগের চেয়ারম্যান, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
পরে ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বাদ পড়েন তিনি। পরে কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরামে যোগ দেন। ২০০৯ সালে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি গণফোরামের একাংশের সভাপতি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।

শিল্পী জীনাত রেহানা
'সাগরের তীর থেকে, মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে’ গানে খ্যাতি পাওয়া ষাটের দশকের সংগীতশিল্পী জীনাত রেহানা গত ২ জুলাই মারা যান।
১৯৬৪ সালে জীনাত রেহানা বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হন। সেখানে ১৯৬৮ সালে জীনাত রেহানার ‘সাগরের তীর থেকে’ গানটি রেকর্ড করা হয়। এটি প্রচারের পরপর গানটি দর্শকপ্রিয়তা পায়।
১৯৬৫ সালে টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে গান শুরু করেন জীনাত। নব্বইয়ে দশকেও বিটিভির পর্দায় গান পরিবেশনায় পাওয়া গেছে তাকে। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কারণে তাকে গানে কম দেখা যেত। আধুনিক ও আধ্যাত্মিক গানের পাশাপাশি তিনি ছোটদের গানও করেছেন।

এ টি এম শামসুল হুদা
নবম সংসদ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদা গত ৫ জুলাই ৮২ বছর বয়সে মারা যান।
ফখরুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সাবেক আমলা এটিএম শামসুল হুদা সিইসির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি কাজ করেছেন ২০১২ সাল পর্যন্ত। কমিশনার হিসেবে তার সঙ্গী হন মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও এম সাখাওয়াত হোসেন।
ভোটের আগে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন হয় ওই কমিশনের সময়েই। সংলাপ করে নির্বাচনী আইন সংস্কার করা হয়। চালু হয় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের নিয়ম ও ইভিএম।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন করে শামসুল হুদার কমিশন। সেবার ৮৭ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে।

সাঈদ হোসেন চৌধুরী
এইচআরসি গ্রুপের চেয়ারম্যান সাঈদ হোসেন চৌধুরী ৬৮ বছর বয়সে গত ১৫ জুলাই রাজধানীর একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
সাঈদ হোসেন চৌধুরী কর্ণফুলী গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হেদায়েত হোসেন চৌধুরীর বড় ছেলে এবং কর্ণফুলী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর বড় ভাই।
ওয়ান ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সাঈদ হোসেন ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও প্রকাশক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি স্পেনে বাংলাদেশের সাবেক অনারারি কনসাল ছিলেন।

হামিদুজ্জামান খান
‘জাগ্রতবাংলা’, ‘সংশপ্তক’, ‘বিজয় কেতন’ আর ‘স্বাধীনতা চিরন্তন’, এর মত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহু ভাস্কর্যের স্রষ্টা হামিদুজ্জামান খান মৃত্যুবরণ করেন গত ২০ জুলাই। তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্যের পাশাপাশি জলরঙ, তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, স্কেচ মাধ্যমে সমানতালে কাজ করেছেন। যুক্তিযুদ্ধের পর ভাস্কর্যে তার প্রিয় বিষয় ছিল পাখি। ঢাকার বুকে ব্রোঞ্জ ও ইস্পাতের তৈরি বেশ কিছু পাখি তার শিল্পী সত্তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
এ প্রখ্যাত ভাস্কর ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭২ সালে ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নির্মাণে কাজ করেন। জয়দেবপুর চৌরাস্তায় এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সার কারখানায় ‘জাগ্রতবাংলা’, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’, ঢাকা সেনানিবাসে ‘বিজয় কেতন’, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন প্রাঙ্গণে ‘ইউনিটি’, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ‘ফ্রিডম’, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্বাধীনতা চিরন্তন’, আগারগাঁওয়ে সরকারি কর্মকমিশন প্রাঙ্গণে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’, মাদারীপুরে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ হামিদুজ্জামান খানের অন্যতম বহিরাঙ্গণ ভাস্কর্য।
এক জীবনে হামিদুজ্জামান খান দুইশর মত ভাস্কর্য গড়েছেন। তার একক প্রদর্শনী হয়েছে ৪৭টি।
হামিদুজ্জামান খান ২০০৬ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক পান। ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি ফেলো নির্বাচিত হন।

এ কে রাতুল
‘ওন্ড’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট, বেজিস্ট ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার এ কে রাতুল মারা যান গত ২৭ জুলাই।
প্রয়াত চিত্রনায়ক জসিমের ছেলে ও অর্থহীন ব্যান্ডের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার রাতুল ব্যায়ামাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রাতুল ও তার ব্যান্ড ‘ওন্ড’ বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এক ভিন্ন যাত্রা শুরু করে। ২০১৪ সালে তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘ওয়ান’ এবং ২০১৭ সালে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘টু’ মুক্তি পায়। এরপর ব্যান্ডটি জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
কেবল গায়ক নয়, রক সংগীতের একজন দক্ষ প্রযোজক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন রাতুল। অনেক জনপ্রিয় ব্যান্ডের অ্যালবাম তৈরিতে তার ভূমিকা রয়েছে।

যতীন সরকার
প্রগতিশীল বাম ধারার বুদ্ধিজীবী, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, শিক্ষক যতীন সরকার গত ১৩ অগাস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
যতীন সরকার দুই মেয়াদে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ছিলেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করে ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর হাই স্কুলে বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন যতীন সরকার। ১৯৬৪ সালে বাংলার প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজে।চার দশকের বেশি সময় শিক্ষকতা করার পর ২০০২ সালে অবসরে যান।
ঊনিশশ ষাটের দশক থেকে ময়মনসিংহ শহরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন যতীন সরকার। ২০০৭ সালে তিনি সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেছিলেন।
একজন মানবতাবাদী লেখক, প্রাবন্ধিক ও সাম্যবাদী বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে তিনি গুরুত্ব পেতে শুরু করেন ১৯৯০ এর দশকে। ১৯৮৫ সালে তার প্রথম বই ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ যখন প্রকাশিত হয়।
২০০৮ সালে তিনি গবেষণা ও প্রবন্ধের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। ২০১০ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।

মাহফুজা খানম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি মাহফুজা খানম মারা যান এ বছর ১২ অগাস্ট; তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
মাহফুজা খানম ১৯৬৬-৬৭ ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি ভিপি হয়েছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে স্নাতক ও পরের বছর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে লন্ডনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পেলেও রাজনৈতিক কারণে তখন তাকে পাসপোর্ট দেয়নি পাকিস্তান সরকার।
বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করা মাহফুজা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যও ছিলেন তিনি।
মাহফুজা বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে সাধারণ সম্পাদক এবং জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন খেলাঘর আসরের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিক্ষায় বিশেষ অবদান রাখায় ২০২১ সালে একুশে পদক পান অধ্যাপক মাহফুজা।

বিভুরঞ্জন সরকার
অফিসে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার; ২২ অগাস্ট মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
৭১ বছর বয়সী বিভুরঞ্জন চাকরি করতেন 'আজকের পত্রিকা'য়। এর বাইরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত কলাম লিখতেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মতামত পাতাতেও তিনি লিখতেন। নানা কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
বিভুরঞ্জন সর্বশেষ নিবন্ধটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মেইল করেন লাশ উদ্ধারে আগের দিন ২১ অগাস্ট সকাল সোয়া ৯টায়। ফুটনোটে তিনি লেখেন, “জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।”
১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া বিভুরঞ্জন সরকার ষাটের দশকের শেষ দিকে স্কুলে পড়ার সময় দৈনিক আজাদ-এর মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে লেখাপড়া করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিকে তিনি কাজ করেছেন। দৈনিক মাতৃভূমি, সাপ্তাহিক চলতিপত্রের সম্পাদক এবং সাপ্তাহিক মৃদুভাষণের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে ‘তারিখ ইব্রাহিম' ছদ্মনামে লেখা তার রাজনৈতিক নিবন্ধ পাঠকপ্রিয় হয়।
ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ছিলেন বিভুরঞ্জন সরকার। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ছিলেন।
তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘বৃত্তবন্দি রাজনীতি’, ‘দোষারোপের রাজনীতি’, ‘আওয়ামী লীগ নিয়ে আশা ও আশঙ্কা’, ‘নানা চিন্তা নানা মত’, ‘কার চেয়ে কে ভালো’। তার সম্পাদিত গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে- ‘কিবরিয়া স্মারকগ্রন্থ বক্তৃতা’, ‘কৃষক নেতা হাতেম আলী খান’, ‘মোনায়েম সরকার যখন নির্বাসনে’।

আলমগীর মহিউদ্দিন
প্রবীণ সাংবাদিক ও বাংলা দৈনিক নয়া দিগন্তর সাবেক সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন ৮৩ বছর বয়সে গত ২৩ অগাস্ট মারা যান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ডেইলি অবজারভার, নিউ নেশন, দ্যা ডন পত্রিকায় কাজ করেছেন। এছাড়া অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তানে (এপিপি) কাজ করেছেন তিনি।
২০০৪ সালে থেকে ২০২৪ সালের শুরু পর্যন্ত আলমগীর মহিউদ্দিন বাংলা দৈনিক নয়া দিগন্ত এর সম্পাদক ছিলেন। এর আগে তিনি ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশন পত্রিকায় কিছুদিন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

বদরুদ্দীন উমর
লেখক, গবেষক ও মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর ৭ সেপ্টেম্বর মারা যান; তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে। ১৯৫৬ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং ১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে তিনি যোগ দেন। তার হাত দিয়েই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয়।
ষাটের দশকে প্রকাশিত তার তিনটি বই সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৬), সংস্কৃতির সংকট (১৯৬৭) ও সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা (১৯৬৯) বাঙালি জাতীয়তাবাদের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯৬৮ সালে শিক্ষকতার কাজে ইস্তফা দিয়ে সরাসরি রাজনীতি ও সার্বক্ষণিক লেখালেখিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী।
এক সময় পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। ২০০৩ সালে তিনি জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নামে একটি সংগঠন গড়ে সভাপতির দায়িত্ব নেন।
অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য বদরুদ্দীন উমরকে মনোনীত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ফরিদা পারভীন
যার নাম হয়ে গিয়েছিল লালনের গানের সমার্থক, সেই সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের জীবনাবসান হয় গত ১৩ সেপ্টেম্বর; তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
শেষ বয়সে নানা রোগ সয়েও লালন চর্চায় নিবেদিত ছিলেন তিনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লালন চর্চা ছড়িয়ে দিতে ১৬ বছর আগে ঢাকার তেজকুনি পাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'অচিন পাখি সংগীত একাডেমি। তার চাওয়া ছিল লালনের গান বেঁচে থাকুক সংগীতের এই পাঠশালার মাধ্যমে।
রাজশাহী বেতারে নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে ফরিদা পারভীন গান গাইতে শুরু করেন ১৯৬৮ সালে। গেয়েছেন আধুনিক ও দেশের গানও।
তরুণ বয়সে লালনের গান একরকম ‘উপেক্ষিতই’ ছিল তার কাছে। তবে পরে সংগীতের অন্য সব ধারাকে পাশে সরিয়ে তিনি লালনের গানে নিজেকে বিলিয়ে দেন।
সংগীতাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। ২০০৮ সালে জাপান সরকারের ‘ফুকুওয়াকা এশিয়ান কালচার’ পুরস্কার পান তিনি। সেরা প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯৩ সালে।

সাহিনা শিকদার বনশ্রী
নব্বই দশকের ‘সোহরাব রুস্তম’ সিনেমার নায়িকা সাহিনা শিকদার বনশ্রী গত ১৬ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের শিবচরে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর।
‘সোহরাব-রুস্তম’, ‘মহা ভূমিকম্প’, ‘নেশা’, ‘প্রেম বিসর্জন’, ‘ভাগ্যের পরিহাস’সহ আলোচিত কয়েকটি সিনেমার নায়িকা ছিলেন বনশ্রী।

নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন
সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও নরসিংদী-৪ আসনের সাবেক সাংসদ নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন গত ২৯ সেপ্টেম্বর কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশান থেকে নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নরসিংদী-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নূরুল মজিদ হুমায়ূন। ২০০৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ওই আসনে নির্বাচিত হন।
২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়ের পর তাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বানানো হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি নরসিংদী-৪ আসনের এমপি নির্বাচিত হন এবং দ্বিতীয়বারের মত শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণসহ তৎকালীন সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

আহমদ রফিক
ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিকের জীবনাবসান হয় গত ২ অক্টোবর; তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।
ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর গ্রামে। মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর রসায়নে পড়তে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ফজলুল হক হলের আবাসিক সুবিধা না পাওয়ায় পরে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে।
১৯৫২ সালে তৃতীয়বর্ষে পড়ার সময় ফজলুল হক হল, ঢাকা হল এবং মিটফোর্ডের ছাত্রদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলার কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি সভা-সমাবেশ মিছিলে ছিলেন নিয়মিত।
১৯৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আন্দোলনকারী ছাত্রদের মাঝে একমাত্র তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
১৯৫৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসে পড়াশোনায় ফেরেন আহমদ রফিক। এমবিবিএস ডিগ্রি নিলেও চিকিৎসকের পেশায় যাননি।
১৯৫৮ সালেই আহমেদ রফিকের প্রথম প্রবন্ধের বই ‘শিল্প সংস্কৃতি জীবন’ প্রকাশ হয়। তারপর লেখালেখিতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, রবীন্দ্রত্ত্বাচার্য উপাধিসহ অনেক সম্মাননা।

তোফায়েল আহমেদ
স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ মারা যান গত ৮ অক্টোবর; তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। এ ছাড়া নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেরও সদস্য ছিলেন। ২০০৬-২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠিত 'স্থানীয় সরকার কমিশনের'ও সদস্য ছিলেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ‘খ’ গ্রুপ লোকপ্রশাসন থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা তোফায়েল আহমেদ পরে যুক্তরাজ্যের ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের সোয়ানসি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন।
১৯৮১ সালে কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির অনুষদ সদস্য (শিক্ষক ও গবেষক) হিসেবে ১৪ বছর কাজ করে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে। ২০০০ সালে তিনি অধ্যাপক হন।
১৯৯৬ থেকে সিভিল সোসাইটির সদস্য হিসেবে দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ স্থানীয় শাসন উপদেষ্টা হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে ছয় বছর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ইউএনডিপি) কাজ করেন।
তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও দর্শন বিভাগেও অধ্যাপনা করেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) বোর্ড অব গভর্নরের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
এমিরেটাস অধ্যাপক ও সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মারা যান গত ১০ অক্টোবর। ৭৫ বছর বয়সী এ অধ্যাপক সেদিন বিকালে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৮১ সালে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইয়েটস-এর কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের দর্শনের প্রভাব বিষয়ে পিএইচডি করেন তিনি।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে অবসরের পর যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে। ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৮ সালে একুশে পদক পান।
তার বইয়ের মধ্যে রয়েছে—পুস্তক প্রকাশনা ও সম্পাদনা প্রসঙ্গ, থাকা না থাকার গল্প, কাচ ভাঙ্গা রাতের গল্প, অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প, আধখানা মানুষ্য, দিনরাত্রিগুলি, আজগুবি রাত, তিন পর্বের জীবন, নন্দনতত্ত্ব, কতিপয় প্রবন্ধ, অলস দিনের হাওয়া।

রাকিব হাসান
গত শতকের নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশের অগণিত কিশোর-কিশোরীর সবুজ মনকে রোমাঞ্চে রাঙানো লেখক, তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা রকিব হাসানের জীবনাবসান হয় গত ১৫ অক্টোবর; তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
রবার্ট আর্থারের ‘থ্রি ইনভেস্টিগেটরস’ সিরিজ থেকে বাংলায় তিন গোয়েন্দার সূচনা হলেও রকিব হাসানের লেখনিতে তা ভিন্ন মাত্রা পায়। সেবা প্রকাশনী ১৯৮৫ সালে তিন গোয়েন্দা সিরিজ শুরু করার পর এ পর্যন্ত সাড়ে চারশর বেশি বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে দেড়শর বেশি বই লিখেছেন রকিব হাসান।
গোয়েন্দা কাহিনীর বাইরেও তিনি বহু ক্লাসিক ও কিশোর সিরিজও উপহার দিয়েছেন। সব মিলিয়ে তার লেখা বইয়ের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।
১৯৭৭ সালে তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ছদ্মনামে। অনুবাদগ্ৰন্থ ‘ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা’ তার নিজের নামে প্রকাশিত প্রথম বই।
তিনি সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত রহস্যপত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ
একাত্তরের আকাশযুদ্ধের অকুতোভয় যোদ্ধা, ঐতিহাসিক ‘অপারেশন কিলো ফ্লাইটের’ সদস্য ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ বীর উত্তম গত ১৬ অক্টোবর মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।
১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ ছিলেন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বৈমানিক। ২৫ শে মার্চের গণহত্যার সময় তিনি বুঝতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। তখন তিনি ঢাকায়।
৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী বোমা ফেলে পুরো চুয়াডাঙা শহর ভস্মীভূত করে দেয়। ওই সময়ে ভারতীয় কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন কলকাতায় পাড়ি জমান। এরই মধ্যে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিইএ) আরও কিছু বৈমানিক সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় চলে যান। তাদের নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।
৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে হেলিকাপ্টার নিয়ে ঢাকার নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর জ্বালানি ডিপোতে এবং অটার দিয়ে চট্টগ্রামে জ্বালানি তেলের আরেক ডিপোতে আক্রমণ করা হয়। সেই অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপরেশন কিলো ফ্লাইট’।
ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং তার সহযোদ্ধারা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান বিমানবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত করেছিলেন। তাদের আক্রমণের পর ভারতীয় বিমানবাহিনী বাংলাদেশের প্রধান প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে আক্রমণ শুরু করে।
৫ ডিসেম্বর বাংলার আকাশ পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়। সে সময় হেলিকাপ্টার দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর ৫০টি আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছিল, যার ১২টিতে অংশ নিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য হাতে গোনা যে কয়জন বেসামরিক ব্যক্তি বীর উত্তম খেতাব পেয়েছেন, তিনি তাদেরই একজন।

তহুরা আলী
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সদস্য বেগম তহুরা আলী গত ২৩ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
তহুরা আলী ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল এবং ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ছিলেন।
হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজের সাবেক শিক্ষক তহুরা আলী সিটিজেন মার্কেটিং লিমিটেডের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তিনি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের মা।

রেজাউর রহমান
আণবিক বিজ্ঞানী রেজাউর রহমানের জীবনাবসান হয় গত ২৬ অক্টোবর।তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
১৯৬৬ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন। সাভারের আণবিক শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিদ্যা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন তিনি।
রেজাউর রহমানের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল কীটপতঙ্গের উপর তেজস্ত্রিয়ার প্রভাব।
লেখালেখিতেও যুক্ত ছিলেন তিনি বিজ্ঞানবিষয়ক পাঠ্যবইসহ কিছু বিজ্ঞান গ্রন্থ এবং বিজ্ঞানবিষয়ক অনেক প্রবন্ধও লিখেছেন। লিখেছেন কিছু উপন্যাস ও গল্পও।
লেখালেখিতে অবদান রাখার জন্য ২০২৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান রেজাউর রহমান।

কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী
সাবেক বিএনপি সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করা কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী মৃত্যুবরণ করেন গত ৩ নভেম্বর।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়া কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতির এক মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাকেও অভিযুক্ত করা হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চলতি বছরের শুরুতে খালেদা জিয়াসহ ওই মামলার আট আসামির সবাইকে বেকসুর খালাস দেয় আদালত।

জ্ঞানশ্রী মহাথের
বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু, সমাজসেবায় একুশে পদক পাওয়া সংঘরাজ জ্ঞানশ্রী মহাথের প্রয়াত হন গত ১৩ নভেম্বর। তার বয়স হয়েছিল ১০০ বছর।
বাল্যকালে লোকনাথ বড়ুয়া নামে পরিচিত এ ধর্মগুরু ১৯৪৪ সালে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। তখন তার নাম রাখা হয় শ্রমণ জ্ঞানশ্রী।
২৫ বছর বয়স থেকে সমাজসেবায় নিয়োজিত থেকে তিনি মোট আটটি অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
১৯৬৪ সালে গঠিত ত্রিপিটক প্রচার বোর্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহামন্ডলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার উপ-সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন তিনি।
২০০৭ সালের থাইল্যান্ডের মহাচুলারংকর্নরাজা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানশ্রী মহাথেরকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়। ২০২৩ মিয়ানমার সরকার তাকে ‘অগ্রমহাপণ্ডিত’ উপাধি দেয়।
দ্বাদশ সংঘরাজ ভদন্ত ধর্মসেন মহাস্থবিরের প্রয়াণের পর ২০২১ সালের ২৫ শে মার্চ বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার অধিবেশনে সংঘের সর্বসম্মতিক্রমে ত্রয়োদশ সংঘরাজ পদে অভিষিক্ত হন জ্ঞানশ্রী মহাথেরকে।
সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০২২ সালে তিনি একুশে পদক পান।

আবুল হাসান মাহমুদ আলী
একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর জীবনাবসান হয় গত ৬ নভেম্বর। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দিনাজপুর-৪ থেকে টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত সাংসদ আবুল হাসান মাহমুদ আলী সর্বশেষ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তার আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী এবং এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সমুদ্রসীমা নির্ধারণী মামলার নিষ্পত্তি এবং ছিটমহল বিনিময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সময়ই হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে এমএ করার পর আবুল হাসান মাহমুদ আলী নিজের শিক্ষায়তনে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে যোগ দেন তৎকালীন পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে।
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তিনি তখন পাকিস্তানের নিউ ইয়র্ক মিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তিনি পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন এবং ওই বছর মে মাসে মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত হন।
মাহমুদ আলী মুজিবনগর সরকারের বিদেশ প্রতিনিধি প্রধান এবং ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান বিচারপতি আবু সায়িদ চৌধুরীর নির্বাহী সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের হয়ে বিভিন্ন মিশনে কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন মাহমুদ আলী। বেইজিংয়ে রাষ্ট্রদূতের পদমর্যাদায় উপমিশন প্রধান; ভুটান, অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক, জার্মানি ও নেপালে রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যে হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত।
১৯৯২ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে তিনি ভারতের সাথে তিন বিঘা করিডোর বাস্তবায়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। একই বছর মিয়ানমারের শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের আলোচনায় যোগ দেন।
২০০১ সালের এপ্রিল মাসে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর মাহমুদ আলী আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

রুহুল আমিন বাবুল
ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক রুহুল আমিন বাবুল রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গত ৬ ডিসেম্বর।
প্রযোজনা-পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়াও বাবুল ছিলেন ঢাকাই সিনেমার অভিনেতা জসিমের গড়ে তোলা ফাইটিং দল 'জ্যাম্বস' গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। যা গড়ে তোলা হয়েছিল ১৯৭৪ সালে।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে সিনেমা প্রযোজনা শুরু করেছিলেন রুহুল আমিন বাবুল। প্রায় ৩০টি সিনেমা প্রযোজনা করেছেন বাবুল। তার প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘দোস্ত দুশমন’, ‘বারুদ’, ‘চাঁদ সুরজ’, ‘কাবিন’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমা।
তার স্ত্রী নূতনও জনপ্রিয় চলচিত্র অভিনেত্রী।

কাজী ফজলুর রহমান
প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা কাজী ফজলুর রহমান গত ১৩ ডিসেম্বর ৯৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।
পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া ফজলুর রহমান স্বাধীনতার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১ সালে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা রাডডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান ব্র্যাক ও পিকিএসএফের প্রতিষ্ঠাকালীন গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। তিনি আহছানিয়া মিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন।

শরীফ ওসমান বিন হাদি
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির জীবনাবসান হয় গত ১৮ ডিসেম্বর।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গেলে চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করে মোটরসাইকেলে আসা আততায়ী। গুলিটি লাগে হাদির মাথায়।
প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় হাদিকে। পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার জীবনাবসান হয়।
২০ ডিসেম্বর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এ তরুণ নেতার জানাজায় অংশ নেয় লাখো মানুষ। ওইদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
এক সময় ইংরেজি শেখার কোচিং সেন্টার সাইফুরস এ শিক্ষকতা করেছেন হাদি। সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতা করছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওসমান হাদির হাত ধরে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। ‘সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ’ সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য।

এ কে খন্দকার
মুক্তিযুদ্ধের উপ সেনাপতি, সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান ও সাবেক মন্ত্রী এ কে খন্দকার বীরউত্তমের জীবনাবসান হয় গত ২০ ডিসেম্বর। তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৬ বছর।
মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে এইচ এম এরশাদের আমলে পরিকল্পনামন্ত্রী হন।
এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের টিকিটে পাবনা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর পাঁচ বছর শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন এ কে খন্দকার।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য ২০১১ সালে এ কে খন্দকারকে স্বাধীনতা পদক দেয় সরকার।

খালেদা জিয়া
বছরের একেবারে শেষে এসে, ৩০ ডিসেম্বর মারা যান বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া; তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী; আর বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুইবার।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ।
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জীবনে প্রথমবার ভোট করেন খালেদা জিয়া। পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পাঁচটিতেই বিজয়ী হন। আর বিএনপি এ নির্বাচনে সংসদের বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধিকাংশ দলের বর্জনে এক তরফা নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও সেই সরকারের মেয়াদ ছিল এক মাসেরও কম।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সঙ্গে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া এবং তার বড় ছেলে তারেক রহমান। এক বছর পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান বিএনপি চেয়ারপারসন।
তারেকও মুক্তি পেয়ে লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন পায়। সেই ভরাডুবির পর আর কখনো ক্ষমতায় যেতে পারেনি খালেদা জিয়ার দল।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায়, রাজপথই হয় দলটির ঠিকানা।
রাজনৈতিকভাবে সেই চাপের সময়ে খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় একের পর এক মামলা। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তাকে কারাগারে পাঠায় আদালত।
এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তার সাজার রায় হয়। মহাবিপদে পড়া বিএনপি লন্ডনে থাকা তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়।
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ অনেকটা আকস্মিকভাবেই আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি দেয় খালেদা জিয়াকে। শর্ত অনুযায়ী তাকে থাকতে হয় গুলশানের বাসায়, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও তার ছিল না।
ফলে মুক্তি পেয়েও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন একপ্রকার বন্দি জীবন কাটতে থাকে বিএনপি চেয়ারপারসনের। এর মধ্যে কয়েকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কয়েক দফা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারও হয়।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই বছর ৭ অগাস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। পরে উচ্চ আদালত তাকে দুই মামলা থেকেও খালাস দেয়। ফলে তার দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হওয়ার কালিমা ঘোচে।
কিন্তু নানা ধরনের অসুস্থতা তাকে ততদিনে অনেকটাই কাবু করে ফেলেছে। মুক্তি মিললেও দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি আর সশরীরে অংশ নেননি।
খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে রাজপথের আন্দোলনে। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো তিনি হারেননি।