Published : 08 Feb 2026, 12:51 PM
বাঙালি নারীর কাছে অতি প্রিয় পোশাক শাড়ি। আর শাড়ির সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে পাড় ও আঁচলের ওপর।
শাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও এই দুই অংশই বেশি গুরত্ব পায়। তবে নিয়মিত ব্যবহারে শাড়ির নিচের অংশ বা পাড়ই সব থেকে দ্রুত নষ্ট হয়, ময়লা লাগে বা ছিঁড়ে যায়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা হয় ফলস।
শাড়ির পাড়ে পাতলা কাপড়ের ফলস লাগানো রীতি বেশ পুরানো। এক সময়ে দাদি, নানি, মা, খালাদের নিজের হাতে সেলাই করেই পাড়ে ফলস লাগাতে দেখা যেত।
যদিও এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা দর্জি দোকানের মাধ্যমে ফলস লাগানো যায়।
ফলস কী?
ফলস হল শাড়ির নিচের পাড় বরাবর ভেতরের দিকে সেলাই করে লাগানো একটি আলাদা কাপড়ের অংশ। সাধারণত এটি শাড়ির কাছাকাছি বা নিরপেক্ষ রংয়ের কাপড় দিয়ে তৈরি হয়, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না কিন্তু শাড়ির নিচের অংশকে অনেকটাই সুরক্ষা দেয়।

শাড়ির পাড় রক্ষা করে
শাড়ির সবচেয়ে বেশি ময়লা লাগে নিচের অংশে, কারণ এটি মেঝে, ধুলো বা জুতার সঙ্গে ঘষা খায়। ফলে পাড় দ্রুত ক্ষয়ে যায় বা ছিঁড়ে যেতে পারে। ফলস থাকলে এই অংশের চাপ মূল কাপড়ের ওপর পড়ে না বরং ফলস সেই চাপ নেয়। ফলে শাড়ির আসল কাপড় দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
শাড়ির আয়ু বাড়ায়
দামী শাড়ি অনেকেই বহু বছর ব্যবহার করতে চান। তবে নিচের পাড় নষ্ট হয়ে গেলে পুরো শাড়ির সৌন্দর্য নষ্ট হয়। ফলস লাগানো থাকলে ক্ষয় হলে শুধু ফলস বদলালেই চলে; পুরো শাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাই শাড়ির মেয়াদ অনেকটাই বেড়ে যায়।
বিয়ের শাড়িতে যে জন্য ফলস ব্যবহার করা উচিত
এক সময়ে বিয়ের কনের শাড়ি কেনার পরেই পাড়ে হাতে সেলাই করে ফলস লাগানো হতো। সে সময়ে ফলস লাগনোও ছিল বিয়ের আনন্দের একটি অংশ।
মিরপুর বেনারসি পল্লীর ‘বেনাসরি কুঠি’র ব্যবস্থাপক মুমতাজ আশরাফি বলেন, “বিয়ের শাড়ি সাধারণত ভারী কাজ থাকে ও কাপড় হয় দামি। বিয়ের দিন দীর্ঘ সময় পরে থাকেন কনে। এই সময় শাড়ির নিচের অংশ মাটিতে লেগে যায়, ধুলো-ময়লা লাগে এবং বারবার পায়ের সঙ্গে ঘষাও খায়। ফলে শাড়ির পাড় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
“ফলস লাগানো থাকলে এই ক্ষয় সরাসরি শাড়ির মূল কাপড়ে লাগে না, বরং ফলস কাপড় সেই চাপ নেয়। এতে শাড়ির আসল কাপড় দীর্ঘদিন ভালো থাকে” ব্যাখ্যা করেন এই শাড়ি ব্যবসায়ী।
এছাড়া বিয়ের দিন কনের চলাফেরা, ওঠা-বসা, ছবি তোলা— সব কিছুতেই শাড়ির নিচের অংশ বারবার নড়ে ও টান পড়ে। ফলস থাকলে শাড়ির নিচে সামান্য ভার তৈরি হয়, ফলে শাড়ি সুন্দরভাবে পড়ে এবং কুঁচি বা পাড় এলোমেলো হয়ে যায় না। এতে কনেকে আরও পরিপাটি ও রাজকীয় দেখায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথাও বলেন এই শাড়ি বিক্রেতা। সেটা হল- শাড়ি পরিষ্কার রাখা। বিয়ের অনুষ্ঠানে মেঝে, কার্পেট বা বাইরের পরিবেশের কারণে শাড়ির নিচে সহজেই ময়লা লাগে। ফলস থাকলে ময়লা সরাসরি শাড়ির আসল কাপড়ে লাগে না। প্রয়োজনে ফলস আলাদা করে ধুয়ে বা বদলে নেওয়াও যায়।
এছাড়া অনেক সময় বিয়ের শাড়ি পরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, হাঁটতে হয়। ফলস থাকলে শাড়ি নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পা জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কিছুটা কমে। ফলে চলাফেরা সহজ হয়।

দেখার সৌন্দর্য বাড়ায়
ভালোভাবে লাগানো ফলস শাড়িকে ভারী ও গোছানো দেখায়। বিশেষ করে সিল্ক, জর্জেট বা হালকা কাপড়ের শাড়িতে ফলস দিলে পরার পর শাড়ির গঠন সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে পুরো শাড়ির সৌন্দর্য বাড়ে।
যেভাবে শাড়িতে ফলস লাগানো হয়
সাধারণত শাড়ির ভেতরের দিকে নিচের অংশ বরাবর ফলস সেলাই করা হয়। প্রথমে ফলস কাপড়টি মাপ অনুযায়ী কেটে নেওয়া হয়। এরপর শাড়ির পাড়ের সঙ্গে মিলিয়ে ভেতরের দিকে সোজা করে রেখে মেশিন বা হাতে সেলাই করা হয়।
“ভালোভাবে সেলাই করলে বাইরে থেকে ফলস দেখা যায় না” মন্তব্য করেন তানহা টেইলার্সের প্রধান কাটিং মাস্টার হান্নান হোসেন।
ফলসের জন্য কেমন কাপড় ব্যবহার হয়
ফলসের কাপড় সাধারণত একটু শক্ত ও টেকসই হয়। সুতি কাপড় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি মজবুত এবং সহজে ক্ষয় হয় না। তবে পাতলা শাড়িতে মোটা ও ভারি পাড়ের শাড়িতে পাতলা সুতি কাপড় ব্যবহার করা ভালো। বর্তমানে রং মিলিয়ে তৈরি ফলস কাপড়ও বাজারে পাওয়া যায়, যা দেখতে পরিপাটি লাগে।

সব শাড়িতে কি ফলস দরকার?
সব শাড়িতে ফলস বাধ্যতামূলক নয়। তবে ভারী, দামি বা নিয়মিত ব্যবহারের শাড়িতে ফলস লাগানো ভালো। বিশেষ করে সিল্ক, জামদানি, কাতান বা পার্টির শাড়িতে ফলস থাকলে তা দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
ফলস কবে বদলাতে হয়
যদি দেখা যায় ফলস কাপড় ক্ষয়ে গেছে বা ময়লা হয়ে গেছে, তখন সেটি খুলে ধুয়ে ফেলা যায় বা নতুন ফলসও লাগানো যায়। এতে শাড়ির আসল কাপড় আবার নতুনের মতো সুরক্ষিত থাকে।
কোথায় ফলস করানো যায়
নিজের হাতে শাড়ির ফলস সেলাইয়ের সময় না থাকলে ‘ক্যালকাটা ড্রাই ক্লিনার্স’-সহ, যে কোনো পোশাক পরিষ্কারক প্রতিষ্ঠান, বড় শাড়ির শোরুম বা টেইলার্স থেকে শাড়ির পাড়ে ফলস করানো যায়। এতে ৫শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়তে পারে।
আরও পড়ুন