জামায়াতের রাজনীতি এবার কোন পথে

নিবন্ধন পেতে জামায়াতের হাতে এখন দুটি সুযোগ আছে। আপিল আবেদনটি পুনরুজ্জীবিত করা, অথবা গঠনতন্ত্রের ত্রুটি সংশোধন করে নতুন আবেদন করা। দলটি কী করবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

ওয়াসেক বিল্লাহবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Nov 2023, 07:05 PM
Updated : 23 Nov 2023, 07:05 PM

শীর্ষস্থানীয় নেতারা ফাঁসিতে ঝুলেছেন, বাকিরা আত্মগোপনে, দলে ভাঙন, বহু বছরের বিতর্কের পর জোট ভেঙে দিয়েছে বিএনপি; সবশেষ নিবন্ধন বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরে মুক্তিযুদ্ধের পর নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় রাজনীতিতে ফেরার পর এতটা দুর্দশায় আর পড়েনি।

নিবন্ধন বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন খারিজের পর জামায়াত এখন অপেক্ষায় আপিল বিভাগের লিখিত রায়ের। সেটি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চায় তারা।

আইনজীবীরা বলছেন, জামায়াতের পক্ষে এখনও নিবন্ধনের জন্য আইনি লড়াই চালানো সম্ভব। পাশাপাশি ‘ত্রুটিগুলো’ সারিয়ে নতুন করে আবেদনও করতে পারে তারা।

জামায়াত কোন পথে যাবে, সেই প্রশ্নে প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপিল বিভাগের লিখিত রায়টা দেখে ফুল বডি (কেন্দ্রীয় কমিটি) সিদ্ধান্ত নেবে কী করবে। এখন কিছু বলা সম্ভব নয়।”

জিয়ার পর এইচ এম এরশাদের সামরিক সরকারের আমলেও জামায়াত রাজনীতি করেছে নির্বিঘ্নে। দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পর খালেদা জিয়ার শাসনেও জামায়াতের সমস্যা হয়নি, বরং তাদের দুই নেতার গাড়িতে জাতীয় পতাকাও উঠেছে।  

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে চাপে পড়ে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দলটি। শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগের মৃত্যুদণ্ড বা আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়।

এরপর দশম সংসদ নির্বাচন বানচালের আন্দোলন এবং সেই নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন থেকে ‘সরকার পতনের’ আন্দোলনে ব্যাপক সহিংসতা হলে মামলা আর গ্রেপ্তারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জামায়াত।

দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এক দশকের বেশি সময় ধরে বলতে গেলে বন্ধ। নেতারা কেউ যান না। একই অবস্থা জেলার কার্যালয়ের। দলের বৈঠকগুলো হয় ভার্চুয়ালি।

২০১৩ সালে ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের আবেদনে হাই কোর্টের রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারায় জামায়াতে ইসলামী। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে এক দশক পর। সর্বোচ্চ আদালতও জামায়াতের আবেদন নাকচ করেছে। 

নিবন্ধন না থাকায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। জোটের শরিক বিএনপি তাদেরকে প্রতীক দেওয়ার পর ধানের শীষে ভোট করতে হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা।

নিবন্ধন বাতিলের আগেই জামায়াতের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ অবৈধ ঘোষণা করে উচ্চ আদালত। কারণ এটি আদালতের ন্যায়বিচারের প্রতীক।

এখন আরো বড় ঝুঁকি হিসেবে ঝুলছে অন্য দুটি আবেদন। জামায়াতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ চেয়ে আপিল বিভাগ একটি রিটের শুনানি নিয়ে আবেদনকারীকে হাই কোর্টে যাওয়ার কথা বলেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের একটি প্রস্তাব আছে তদন্ত সংস্থার।

নিবন্ধনের সুযোগ আর আছে?

এই প্রশ্নে সংবিধান আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নিবন্ধন পেতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু পরে দেখা গেছে, এই শর্তগুলোর ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে।

“এর মানে এই না যে, ভবিষ্যতে তারা (জামায়াত) নিবন্ধন পাবে না। হাই কোর্ট বা আপিল বিভাগ থেকে বলা হয়নি তাদের ভবিষ্যতে নিবন্ধন দেওয়া যাবে না।”

জামায়াত কী করতে পারে- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “ওরা সব শর্ত পূরণ করে আবার আবেদন করতে পারে। তখন নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।”

নিবন্ধন না থাকলেও ভোটে আসার সুযোগ আছে। নিবন্ধিত দলের সঙ্গে জোট করে সেই দলের প্রতীক জামায়াত ব্যবহার করতে পারে।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে অংশ নেয়। ওই নির্বাচনে ২৫টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন জামায়াতের নেতারা। বিএনপি তাদেরকে ধানের শীষ প্রতীক দিতে রাজি হয়।

তাদের ভোটে অংশগ্রহণ চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট আবেদন হলে ভোটের তিন দিন আগে খারিজ করে দেয় হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ।

২০১৩ সালে নিবন্ধন বাতিলের পর উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের একাধিক প্রার্থী স্বতন্ত্র পরিচয়ে ভোটে অংশ নিয়ে নির্বাচিতও হন।

হাই কোর্টের অন্য একজন আইনজীবী বলেন, আপিল বিভাগ জামায়াতের আবেদন খারিজ করলেও আবার সেই আইনি লড়াই শুরু করা সম্ভব।

তিনি জানান, আপিল বিভাগে আবেদনটি খারিজ হয়েছে ‘ডিসমিস ফর ডিফল্ট’ এর কারণে। এর অর্থ হল আপিলকারী পক্ষ শুনানিতে হাজির ছিল না।

সেই আইনজীবী বলেন, “হাই কোর্টে এটি অহরহ হয়। একটা মামলা লিস্ট হয়, আমি টের পেলাম না। তখন এটাকে ডিসমিস ফর ডিফল্ট করে। আবার আমি আমি অন্য কোর্টে ব্যস্ত আছি, এই মামলায় শুনানি করতে পারিনি, তখন আদালত ‘ডিসমিস ফর ডিফল্ট’ করে।

“আইনে আছে, কোনো মামলায় যদি ডিসমিস ফর ডিফল্ট হয় তাহলে পুনরুত্থানের আবেদন করা যায়। এজন্য আদালতে দরখাস্ত করা হয়, আদালত যদি তা গ্রহণ করে তাহলে আমার শুনানি হবে।”

জামায়াত কোন পথে এগোবে- এই প্রশ্নে দলের প্রচার সম্পাদক আইনজীবী মতিউর রহমান আকন্দ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আপিল বিভাগ তো লিখিত আদেশ দেয়নি। মৌখিক একটা অর্ডার দিয়েছে। এখন আমরা লিখিত অর্ডারটা আগে তুলব। এ জন্য ১০/১২ দিন সময় লাগবে। তাকে কী বলা আছে, সেটা দেখে সিদ্ধান্ত নেব।

“যদি রেস্টোর করার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আইনি লড়াই শুরু হবে। আর যদি রেস্টোর না করার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে হলে কীভাবে করব, সে বিষয়টা নেয় দলগতভাবে ভাবা হবে।” 

কী পরিবর্তন আনতে হবে

সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় ২০১৩ সালের ১ অগাস্ট হাই কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ‘অবৈধ ও বাতিল’ ঘোষণা করে রায় দেয়।

যে রিট আবেদনে ওই রায় এসেছিল, সেখানে বলা হয়েছিল, চার কারণে জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসাবে নিবন্ধন পেতে পারে না।

প্রথমত, জামায়াত নীতিগতভাবে জনগণকে সব ক্ষমতার উৎস বলে মনে করে না। সেইসঙ্গে আইন প্রণয়নে জনপ্রতিনিধিদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকেও স্বীকার করে না।

দ্বিতীয়ত, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসারে কোনো সাম্প্রদায়িক দল নিবন্ধন পেতে পারে না। অথচ কাজে কর্মে ও বিশ্বাসে জামায়াত একটি সাম্প্রদায়িক দল। 

তৃতীয়ত, নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের কোনো বৈষম্য করতে পারবে না। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষপদে কখনো কোনো নারী বা অমুসলিম যেতে পারবে না।

চতুর্থত, কোনো দলের বিদেশে কোনো শাখা থাকতে পারবে না। অথচ জামায়াত বিদেশের একটি সংগঠনের শাখা। তারা স্বীকারই করে- তাদের জন্ম ভারতে, বিশ্বজুড়ে তাদের শাখা রয়েছে।

ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই বিষয়গুলো সংশোধন করে জামায়াত যদি নতুন করে আবেদন করতে পারে। আদালত বলেনি যে তারা নতুন করে আবেদন করতে পারবে না।"

তবে এই বিষয়গুলো সংশোধন করা জামায়াতের মৌলিক পরিবর্তনের বিষয়। দলটি সে পথে হাঁটবে কি না, এই প্রশ্নে প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা এখনই বলতে পারব না। আগে আপিল বিভাগের রায়টা প্রকাশ হোক। আদালতের তো একটা ব্যাখ্যা থাকবে। এই ব্যাখ্যাটা দেখেই আমরা ভাবব কী করব।”

বড় ঝুঁকি অন্য দুই আবেদন

ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আদালতে জামায়াত নিষিদ্ধের একটি আবেদন আছে। সেটিতে যদি দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে দলটির আর রাজনীতি করার সুযোগ থাকবে না।

“আবার যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে বিচারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে যদি জামায়াতকে সাজা দেওয়া হয়, তাহলে দলটির সামনে আর কোনো আশা নেই।”

জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন নিয়ে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দলটির মিছিল-সমাবেশসহ সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ কয়েকজন (রিটকারী) আপিল বিভাগে আবেদনটি করেন গত ২৬ জুন। এরপর এই আবেদনে পক্ষভুক্ত হতে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক আপিল বিভাগে আবেদন করেন।

বেশ কয়েকটি তারিখ পেছানোর পর গত ১৯ নভেম্বর রিটকারীদেরকে হাই কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আবেদনের নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ। তবে সেই আবেদন এখনও করা হয়নি।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। এরপর তার মৃত্যুদণ্ড চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে আপিল করে, তাতে জামায়াতকে নিষিদ্ধের আবেদন করা হয়।

সে সময়ের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান ২০১৩ সালের ১২ অগাস্ট সাংবাদিকদের বলেন, “যেহেতু ট্রাইব্যুনাল তাদেরকে (জামায়াত) ক্রিমিনাল সংগঠন হিসাবে উল্লেখ করে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তাই আমরা আবেদনে বলেছি, দলটিকে নিষিদ্ধ করা হোক।

“সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘পরিপূর্ণ ন্যায় বিচারের’ ক্ষমতা আপিল বিভাগের রয়েছে। সেই ক্ষমতার আলোকে আপিল বিভাগ জামায়াত নিষিদ্ধও করতে পারে।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া অন্তত চারটি রায়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তানি সেনাদের ‘সহযোগী বাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধকালীন নৃশংসতার জন্য পাকিস্তানি সেনাদের পাশাপাশি জামায়াতকেও দায়ী করা হয়েছে।

সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয় ২০১৩ সালের অগাস্ট। পরের বছর ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্তও করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

এতে জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ সাত ধরনের অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

২০১৪ সালের ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা, যাতে জামায়াত ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্পদ বাজেয়াপ্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও অবলুপ্তির আবেদন করা হয়।

তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে সংগঠনের বিচার ও শাস্তির বিধানে সুস্পষ্টতার অভাব রয়েছে। আইনের ‘ব্যক্তি’ শব্দের পাশাপাশি ‘সংগঠন’, আরেকটি ধারায় ‘দায়’ শব্দের পাশাপাশি ‘সংগঠনের দায়’ ও অপর আরেকটি ধারায় ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির’ পাশাপাশি ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন’ শব্দ প্রতিস্থাপন করে আইনটি সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে এরপর থেকেই। এসব শব্দ যুক্ত হলে সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার করা সম্ভব হবে বলে মত দিয়ে আনছেন আইনজ্ঞরা।

২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদেরকে বলেন, “এই জামায়াতের বিচার করার জন্য আইনের পরিবর্তন দরকার হবে, সেটা আমি আগেই বলেছি। সেই আইনের যে পরিবর্তন-সংশোধন, সেটা মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হয়েছে। আমরা কিছু দিনের মধ্যেই এই আইনটা পাস করব, তারপর বিচার কার্যক্রম শুরু করব।”

তবে এরপর এক বছরেও এর কোনো অগ্রগতি হয়নি। অতি জরুরি বিষয় ছাড়া একাদশ সংসদ আর বসবে না, আর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় আইন সংশোধনের সুযোগও নেই সরকারের। ফলে বিষয়টি পরের সংসদের জন্য অপেক্ষা ছাড়া বিকল্প নেই।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমেরিকার একটা প্রেশার আছে। তারা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে। তারা ১৯৭১ সালেও জামায়াতকে সমর্থন করেছে। আমাদের সরকার কোনো কারণে হয়ত সেই চাপ উপেক্ষা করতে পারছে না।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনের আশ্বাসের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “আইনমন্ত্রী তো ২০১৪ সাল থেকেই আমাদেরকে এ কথা বলে আসছেন। সামান্য একটা সংশোধনী দরকার। তিনি বলেন, শাস্তি কী হবে? আমরা বলেছি, শাস্তি কী হবে, সেটা বিচারকদের ওপর ছেড়ে দেন। কিন্তু তিনি শোনেননি। আসলে আমাদের বঙ্গবন্ধুর মতো শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে জামায়াতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে।”

জোট নেই, মৈত্রী অটুট

সামরিক শাসক জিয়ার হাত ধরে যখন বিএনপির জন্ম হয়েছিল, তখন থেকেই দলটির সঙ্গে জামায়াতের সখ্য। জিয়াই জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া জামায়াতকে নিয়ে গঠন করেছিলেন সরকার।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর নানা ঘাত প্রতিঘাতেও সেই বন্ধন টিকে ছিল। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর নানা মহল থেকে আহ্বান জানানো হলেও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়েনি বিএনপি। চার দলীয় জোট থেকে ১৮ দল, পরে ২০ দলীয় জোট হলেও জামায়াতই ছিল সব জোটে বিএনপির প্রধান মিত্র।

গত কয়েক বছর ধরে দুই দলের মধ্যে দূরত্বের আলোচনার মধ্যে ২০২২ সালের অগাস্টে দলীয় এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপির সঙ্গে তাদের জোট ভেঙে গেছে।

তিন মাসের মাথায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই কথা বলেন। ওই বছর ৮ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল বলেন, তাদের কোনো জোট এখন আর নেই। তবে সমমনা দলগুলো তাদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকছে।  

এরপর কয়েক মাস জামায়াত ছিল ‘দূরে দূরে’। তবে গত ২৮ অক্টোবর থেকে জামায়াত গত কয়েক মাস ধরে আবার চাঙা হতে চাইছে। জোটে না থাকলেও বিএনপির মত একই দাবিতে একই দিনে একই কর্মসূচি দিয়ে আসছে দলটি।

২০১৩ ও ২০১৫ সালে জামায়াত-বিএনপির মিলিত হরতাল-অবরোধে যেমন ব্যাপক মাত্রায় নাশকতা দেখা গিয়েছিল, সেই স্মৃতি ফিরে আসছে এবারের নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনে। 

দলে ভাঙন

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর থেকেই ৭১ এর ভূমিকায় ক্ষমা চাওয়া প্রশ্নে জামায়াতে বিভেদের খবর আসছিল গণমাধ্যমে।

এর মধ্যে দলের ‘সংস্কারপন্থিরা’ ২০২০ সালে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেয়।

সেই দলের ২২২ সদস্যের প্রথম কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগকারী এএফএম সোলায়মান চৌধুরী, যিনি একজন সাবেক সচিব। আর ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জু ছিলেন সদস্য সচিব।

সংস্কারের কথা বললেও তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে অন্যান্য দলের সন্দেহ ছিল। বলা হচ্ছিল, এরা হয়ত জামায়াতের ‘বি টিম’। দলটি এবার নিবন্ধনের আবেদন করলেও নির্বাচন কমিশন তাতে সাড়া দেয়নি।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের দল ত্যাগ জামায়াতের জন্য বড় ক্ষতি। তিনিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়টি দেখতেন। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইও চালাতেন। তার দলত্যাগের পর আইনজীবী প্যানেলের অন্যরাও সম্পর্ক ত্যাগ করেছে দলটির সঙ্গে। 

জামায়াতের ভোটের হিসাব

পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনের ফল বিবেচনা করে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর ভোট পাঁচ থেকে সাত শতাংশের মধ্যেই ছিল। আর জামায়াতের ভোট চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও ও কক্সবাজারের কিছু এলাতেই কেন্দ্রীভূত।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে তারা কেবল সিরাজগঞ্জের একটি, পিরোজপুরের একটি ও কুমিল্লার একটি আসনে ভোট বাড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে আসার মত শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৬ শতাংশ ভোট পাওয়া জামায়াত স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ হলেও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রাজনীতিতে ফেরে।

এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে জামায়াত ভোট পায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আসন পায় ১০টি।

বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতায় ভোটের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব পড়ে, সেটি বোঝা গেছে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে।

ওই নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমানের লেখা একটি বইয়ের তথ্য বলছে, পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জামায়াতকে অঘোষিতভাবে ৩৫ আসনে সমর্থন দেয় বিএনপি। আর বিএনপিকে শতাধিক আসনে ভোট দেয় দলটি।

সেই নির্বাচনে বিএনপি আসন পায় ১৪০টি, জামায়াত পায় ১৮টি। আর আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন।

ওই নির্বাচনে দুই প্রধান দলের ভোট ছিল একেবারেই কাছাকাছি। ধানের শীষ নিয়ে বিএনপি পায় মোট ভোটের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। আর নৌকা নিয়ে আওয়ামী লীগ পায় ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ।

জামায়াতের বাক্সে পড়ে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ ভোট। দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বাভাবিক হারের দ্বিগুণের বেশি ভোট পাওয়াতেই এটা স্পষ্ট হয়, জোটের সুফল তারা পাচ্ছে।

১৯৯৬ সালে যে দুইবার ভোট হয়, তার মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোট আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মত বর্জন করে জামায়াতও। ওই বছরের ১২ জুন সব দল একক শক্তিতে যে নির্বাচন করে, তাতে জামায়াতের ভোট কমে হয় ৮.৬১ শতাংশ। আসন পায় তিনটি।

ওই বছর মোট ভোটের ৩৭ দশমিক ৪০ শতাংশ পড়ে আওয়ামী লীগের বাক্সে। আসন পায় ১৪৬টি। বিএনপি ১১৬টি আসন পায়। মোট ভোটের ৩৩ দশমিক ৬০ শতাংশ পায় দলটি।

অর্থাৎ এই নির্বাচনেও যদি বিএনপি ও জামায়াতের সমঝোতা থাকত, তাহলে তারা আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ভোট ও আসন পেতে পারত।

২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ফের জোট বাঁধে বিএনপি ও জামায়াত। শুরুতে সঙ্গে ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। জাতীয় পার্টি সেই জোট থেকে বের হয়ে গেলে তার দলের একটি অংশ এবং কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলগুলোর মোর্চা ইসলামী ঐক্যজোট মিলে লড়াই করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে।

সেই নির্বাচনে বিএনপি একাই পায় ১৯৩টি, জামায়াত পায় ১৭টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বা বিজেপি চারটি, ইসলামী ঐক্যজোট পায় দুটি আসন।

ওই বছর আওয়ামী লীগ আসন পায় ৬২টি। এর মধ্যে উপনির্বাচনে দলটি আরও চারটি আসন হারিয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত আসন দাঁড়ায় ৫৮তে।

সেই নির্বাচনে বিএনপি ভোট পায় ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর আওয়ামী লীগ পায় ৪০ দশমিক ০২ শতাংশ। জামায়াতের ভোট ছিল ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তৈরি হয় নতুন সমীকরণ। ওই বছর আওয়ামী লীগও ভোটে নামে জোটের শক্তি নিয়ে। জাতীয় পার্টির একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট যোগ হওয়ার পর বিএনপির জোট আর পাত্তা পায়নি।

সেই নবম সংসদ নির্বাচনে ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ আসন পায় ২৩০টি। এই ভোটের মধ্যে জাতীয় পার্টি ও অন্য শরিকদের সমর্থকদের অংশগ্রহণও ছিল।

আর বিএনপির ধানের শীষে ভোট পড়ে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আসন হয় ৩০টি।

জোটের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জাতীয় পার্টিও পায় ২৭টি আসন। আওয়ামী লীগের ভোটাররাও লাঙ্গলে সিল দেয়ার পর দলটির ভোট দাঁড়ায় ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা ছিল আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশি।

ওই নির্বাচনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় ভোট পড়ে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশি, তবে আসন কমে হয় দুটি।

নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় এরপর আর দলীয়ভাবে নির্বাচন করতে পারেনি জামায়াত। 

আরও পড়ুন:

Also Read: নিবন্ধন বাতিলের রায় বহাল, নির্বাচনে অযোগ্যই থাকল জামায়াত

Also Read: জামায়াতের ‘আদালত অবমাননা’: হাই কোর্টে যেতে বলল আপিল বিভাগ

Also Read: বিদেশ থেকে অপপ্রচার: কীভাবে ব্যবস্থা, খতিয়ে দেখছে সরকার

Also Read: জামায়াতের ‘সংস্কারপন্থিদের’ নতুন দল এবি পার্টি

Also Read: বহিষ্কৃত জামায়াত নেতা মঞ্জুর নেতৃত্বে নতুন মঞ্চ

Also Read: একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াত ছাড়লেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক

Also Read: ব্যারিস্টার রাজ্জাকের জন্য জামায়াত ‘ব্যথিত, মর্মাহত’