বিএনপির ‘বর্জনের ভোটে’ স্বতন্ত্র ও দলছুটদের ভিড়

নৌকা, লাঙ্গল ও স্বতন্ত্রের এবারের ভোটের সঙ্গে বিএনপির বর্জনের দশম সংসদ নির্বাচনের বেশ কিছু পার্থক্য আছে। ১০ বছর আগের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ছিল ১২টি; এবার সেটি ৩২, সে সময় মনোনয়নপত্র জমা পড়ে এক হাজারের কিছু বেশি, এবার তা পৌনে তিন হাজার।

মঈনুল হক চৌধুরীকাজী মোবারক হোসেনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Nov 2023, 07:50 PM
Updated : 30 Nov 2023, 07:50 PM

বিএনপি ও তার সঙ্গে থাকা দলগুলো শেষ পর্যন্ত আসেনি, পাল্টায়নি ভোটের তফসিল। ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যারা মনোনয়নপত্র জমা দেননি, তাদের জন্য পুনর্ভাবনার সুযোগ শেষ হয়ে গেছে। ফিরে এসেছে দশম সংসদ নির্বাচনের স্মৃতি।

এক দশক আগের ভোট বর্জনের পুনর্মঞ্চায়নের মধ্যে দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্যে সংখ্যা ও ‘চরিত্রগত’ বেশ কিছু পার্থক্যও আছে।

২০১৪ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি ও তার মিত্রদের বর্জনের ডাকের মধ্যে নির্বাচন হয়েছিল। এবারও তাই।

ভোট বর্জনের পাশাপাশি তা প্রতিহতের চেষ্টায় হরতাল অবরোধ হয়েছে তখনও। সেসব কর্মসূচিতে ব্যাপক সহিংসতায় প্রাণ গেছে শতাধিক মানুষের। এবারও হরতাল অবরোধ চলছে টানা, তবে সহিংসতার মাত্রা কম।

দশম সংসদ নির্বাচনের অংশগ্রহণ প্রশ্নেও জাতীয় পার্টিতে ছিল নানা নাটকীয়তা, এবারও সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রেখে শেষ দিকে এসেছে ভোটে আসার ঘোষণা। তবে দলের মধ্যে বিভেদ কাটেনি। রওশন এরশাদ ও তার অনুসারী নেতারা নির্বাচন থেকে দূরে।

দশম সংসদ নির্বাচনের চিত্রটা ছিল উল্টো। রওশন ও তার অনুসারীরা ছিল ভোটে। জি এম কাদের ও এরশাদ অনুসারীদের অনেকেই ছিলেন ভোট থেকে দূরে।

দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ১২টি দল, তবে এবার দলের সংখ্যা অনেক বেশি। নিবন্ধিত ৪৪টি দলের মধ্যে ভোটে এসেছে ৩২টি। নিবন্ধিত এসব দলের সঙ্গে জোট করে আছে অনিবন্ধিত আরও বেশ কিছু দল।

সেই নির্বাচনে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাই ভোট থেকে দূরে ছিল। তবে এবার বিএনপির বেশ কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য, নির্বাহী কমিটির নেতা এমনকি একজন ভাইস চেয়ারম্যান দল ছেড়ে আওয়ামী লীগে এসে ভোটে অংশ নিচ্ছেন।

দশম সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। এর কারণ কেবল বেশি দলের অংশগ্রহণ নয়, আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিলেও নৌকার বিরুদ্ধে দলের নেতাদের স্বতন্ত্র ভোট করতে বাধা না দেওয়ার নীতি নিয়েছে। এ কারণে আবার অবরোধ-হরতালের মধ্যেও আসনে আসনে নির্বাচনি আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছে নানাভাবেই।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ঘোষণার দিন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বলেছেন, কোনো আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত দেখতে চান না তিনি। এমনটি হওয়ার চেষ্টা হলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। এরপর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া নেতারা উৎসাহের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাইছেন।

এমনকি তিনবারের সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকও নৌকার বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়ার মানসে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

কত মনোনয়নপত্র জমা

বৃহস্পতিবার মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে ৩০০টি আসনেই প্রার্থী হওয়ার আবেদন জমা পড়েছে, সব মিলিয়ে সংখ্যাটি ২ হাজার ৭৪১ জন।

সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে বগুড়া-৭ আসনে। সেখানে প্রার্থী হতে চাইছেন ২৫ জন। সবচেয়ে কম চারজন মনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ১২টি আসনে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গোপালগঞ্জ-৩ আসনে আরও সাত জন প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন এখন পর্যন্ত।

এবার জমা পড়া প্রার্থীদের মধ্যে স্বতন্ত্র কত জন, সেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও নির্বাচন কমিশন দিতে পারছে না।

শুক্র থেকে সোমবার পর্যন্ত এসব মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই চলবে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল চলবে ৫ থেকে ৯ ডিসেম্বর। সেগুলো নির্বাচন কমিশনে নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপরই জানা যাবে চূড়ান্ত প্রার্থী কারা।

বিএনপি-জামায়াতের বর্জনের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল মোট ১ হাজার ১০৭টি, বাছাইয়ের পর টিকে ছিলেন ৮৭৭ জন। সেবার ১৫৩টি আসনে একজন প্রার্থী ছিল বলে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান।

শেষ পর্যন্ত প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৬১ জন। তাদের মধ্যে দলীয় ১ হাজার ৭৩৩ জন; বাকি ১২৮ জন ছিলেন স্বতন্ত্র।

অংশগ্রহণমূলক একাদশ সংসদ নির্বাচনে মধ্যে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী সংখ্যা এবারের চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল। ওই বছর দলীয় মনোনয়নপত্র ছিল ২ হাজার ৫৬৭টি, স্বতন্ত্র মনোনয়ন ছিল ৪৯৮টি।

বর্জনের ভোট নতুন নয়

১৯৮৬ সালে বিএনপি, ১৯৮৮ সালে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত, ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ভোট হয়।

১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের আয়োজন করে জাতীয় পার্টির সরকার, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আয়োজন করে বিএনপির সরকার।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও তার মহাজোটের বর্জনের মধ্যে একতরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে গিয়েছিল বিএনপির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

Also Read: পিটার হাস ‘সীমা মেনে’ চলবেন, আশা কাদেরের

Also Read: রোববার থেকে ফের ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ ডাকল বিএনপি

Also Read: স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে নির্দেশনা শিগগিরই: নওফেল

সেই নির্বাচনের ১১ দিন আগে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে জারি হয় জরুরি অবস্থা। তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব ছাড়েন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। শপথ নেয় ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তিন মাস নয়, সেই সরকার দায়িত্বে থাকে প্রায় ‍দুই বছর।

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়কের শেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জাসদের জোট দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করে।

আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্রের মিছিল

কিশোরগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে বর্তমান সংসদ সদস্য জাকিয়া নুর লিপিকে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের মেয়ে।

এই আসনে সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের উপনির্বাচনে ছোট বোন লিপিকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ।

তার আরেক ভাই অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ শাফায়াতুল ইসলাম, চাচাত ভাই সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটো এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব শরীফ আহমেদ সাদীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

গত রোববার দলের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগে গণভবনে গিয়েছিলেন তাদের তিন জনই।

আপনাদেরকে কী বলা হয়েছে, এই প্রশ্নে শরীফ আহমেদ সাদী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নেত্রী দুটি কথা বলেছেন। প্রথমত বলেছেন, ‘আপনারা একটা ডামি ক্যানডিডেট রাখবেন। কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করবেন না। তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

“আরও বলেছেন, ‘যদি কেউ প্রার্থী হয়, তাদের কাউকে ডিস্টার্ব করবেন না কেউ। নির্বাচনটা হবে অংশগ্রহণমূলক। জনগণ বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে অংশগ্রহণ করবে।’ নেত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমি প্রার্থী হয়েছি। তিনি যেভাবে বলেন সেভাবেই হবে।”

মনোনয়ন ঘোষণার পর প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাতদের কর্মী সমর্থকরা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। এবারও শুরুতে মনোনয়ন না পেয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপরেই শেখ হাসিনার নির্দেশনার কথা প্রচার হয়ে যায়। ফলে মনোনয়ন না পাওয়া নেতারা তুমুল উৎসাহে মনোনয়নপত্র তুলতে শুরু করেন।

Also Read: আর কতবার নির্বাচনের বাইরে থাকব: শাহজাহান ওমর

Also Read: শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে ৩০টি দল, প্রার্থী পৌনে ৩ হাজার

Also Read: সর্বোচ্চ ২৫ প্রার্থী বগুড়া-৭ আসনে, ৪ জন করে ১২টিতে

মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বরিশাল-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথও। এই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদকে।

পঙ্কজ নাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রত্যেকটা আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পাশাপাশি ড্যামি প্রার্থী রাখতে বলেছেন। কিন্তু আমাদের আসনে কোন ড্যামি প্রার্থী দিতে পারেননি শাম্মী।”

শাম্মীর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে দাবি করে তিনি বলেন, “সে জন্য শেষ মুহূর্তে নেতাকর্মীদের অনুরোধে আমার স্বাক্ষর নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা, এখানে শাম্মীর লোকজনও ছিল।”

ফরিদপুর-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দুইবার জয় পাওয়া যুবলীগ নেতা নিক্সন চৌধুরী এবারও নৌকার বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্লাহকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন তিনি।

মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনে তিনটি নির্বাচনে নৌকা নিয়ে জয় পাওয়া মোয়াজ্জেম হোসেন রতনও। এমন আরও আছে।

মনোনয়ন না পেলে ভোট করবেন না ঘোষণা ছিল হাই কোর্টের আলোচিত আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনের। তবে প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত বদল হয় তার। হবিগঞ্জ-৪ আসনে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে লড়তে চাইছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর সঙ্গে।

চট্টগ্রাম- ৮ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নৌকার প্রার্থী নোমান আল মাহমুদের সঙ্গে, স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম।

ঢাকার বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থীর হিড়িক কতটা, তা বোঝা যায় নরসিংদীতে। জেলার ৫টি আসনের প্রতিটিতেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পাওয়া নেতারা ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নরসিংদী-৪(মনোহরদী-বেলাব) আসনে টানা তিনবারের সংসদ সদস্য শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে লড়তে পাঁচ বারের উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান বিরু তার পদ ছেড়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এবার দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে আর বাধা নেই। তাই আমি জনমত যাচাই করার একটা সুযোগ পেয়েছি। তৃণমূলে আমার জনপ্রিয়তা রয়েছে। আমি আশাবাদী বিজয়ী হব।” 

স্বতন্ত্র নিয়ে আসলে কী চিন্তা আওয়ামী লীগে?

আসনে আসনে নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে দলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, এমন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো চেয়ারম্যান ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকে তো মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষ হলো মাত্র। কোন কোন আসনে কারা কারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে, আর তাদের মধ্যে আমাদের দলের কারা, সেই বিষয়গুলো জানতে হলে পুরো তালিকা পেতে হবে। আশা করি শুক্রবার দুপুরের মধ্যে পেয়ে যাব। তালিকা পাওয়ার পর আমরা এটা নিয়ে বসব, সেখানে আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা ঠিক করব।” 

বিএনপির শীর্ষ নেতার চমক

মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগে আগে ঝালকাঠি-১ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন শাহজাহান ওমর, যিনি ৪৫ বছর ধরে জড়িত ছিলেন বিএনপির রাজনীতিতে। তিনি দলটির ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলেন।

নাটকীয় এই দলবদলের পর সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, “আর কতবার আমরা নির্বাচনের বাইরে থাকব? বিএনপির দোষ-গুণ বিবেচনার সামর্থ্য আমার নাই। আমি মনে করি, বিএনপির ২০১৪ সালে নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। ২০১৮ সালে যাওয়া মিসটেক ছিল এবং এবার যাওয়া উচিত ছিল।

‘‘নির্বাচনে গিয়ে দেখতাম কত প্রকার কারচুপি হয়, জালিয়াতি হয়… সেটা পরীক্ষা হতো। জনগণ দেখত বিএনপি নির্বাচনে আসছিল ভোট সুষ্ঠু হয়নি, কারচুপি হয়েছে।”

গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপি-পুলিশের সংঘর্ষের পর বাসে আগুনের মামলায় ৫ নভেম্বর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শাহজাহান, যিনি ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০০১ সালে ঝালকাঠি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আটক হওয়ার ২৪ দিনের মাথায় বুধবার তিনি জামিনে ছাড়া পান। পরের দিন সকালে গণভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বিকালেই জোটে যায় তার মনোনয়ন, অথচ গত রোববার সেই আসনে আওয়ামী লীগ তিনবারের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের টিকেট নিশ্চিত করে দেয়।

ভোটে আসার আলোচনা ছিল বিএনপিতে?

শাহজাহান ওমর সংবাদ সম্মেলনে জানান, কারাগারে থাকার সময় সেখানে আটক বিএনপি নেতাদের ভোট আনতে চেষ্টা করেন তিনি।

এও জানান, তিনটি শর্তে ভোটে আসতে রাজি ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

Also Read: দলের ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বরাদ্দের সুপারিশ টিআইবির

Also Read: পতাকাশোভিত গাড়িতে এসে মনোনয়নপত্র দিলেন হুইপ সামশুল

Also Read: ‘নৌকায় চড়া’ শাহজাহান ওমরকে বিএনপির বহিষ্কার

তিনি বলেন, ‘‘আমি মহাসচিব (মির্জা ফখরুল), মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান সরোয়ার কেরানীগঞ্জে (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার) একসঙ্গে ব্রেক ফাস্ট করলাম। সেখানে আমি বলেছি, নির্বাচনে যাওয়া উচিত।

“মহাসচিব (ফখরুল) বললেন, ‘হ্যাঁ যাব, তিন কন্ডিশন। ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার, ফ্রি ফেয়ার নির্বাচনের একটা অঙ্গীকার বা প্রেক্ষাপট’।

‘‘আমরা এগ্রি করেছি। পরে আমি, আলাল (মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল), আলতাফ চৌধুরী (আলতাফ হোসেন চৌধুরী) কাশিমপুরে (কারাগার) গেলাম। এরপর আমরা আলাদা আলাদা, উনারা কী করেছে জানি না।”

তবে বিএনপি ২৯ অক্টোবর থেকে সপ্তাহে একদিন বিরতি দিয়ে প্রতিটি কর্মদিবসে অবরোধ বা হরতাল চালিয়ে যাচ্ছে, দলের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ভোট করতে দেবেন না তারা। 

আলোচনায় বিএনপির দলছুট নেতারা

এবার বিএনপি ভোটে না এলেও তাদের বেশ কজন কেন্দ্রীয় নেতা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

এদের একটি অংশ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন স্বতন্ত্র হিসেবে, কেউ কেউ গেছেন নতুন দল বিএনএমে, কেউ গেছেন তৃণমূল বিএনপিতে। আর শাহজাহান ওমরের আওয়ামী লীগে যাওয়া এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চমক।

তৃণমূল বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা শমসের মবিন চৌধুরী ও তৈমুর আলম খন্দকার-দুজনই ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্ট।

এদের মধ্যে শমসের সিলেট-৬ ও তৈমুর নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন।

এই দলের প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যরা হলেন মৌলভীবাজার-২ আসনের এম এম শাহীন, লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এম এ আউয়াল, সাতক্ষীরা-৪ আসনের এইচ এম গোলাম রেজা, ঝিনাইদহ-২ আসনে নুরুদ্দিন আহমেদ, মেহেরপুর-২ আসনে আবদুল গণি।

শেরপুর-২ আসন থেকে তৃণমূল বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন শেরপুর বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মো. জায়েদুর রশীদ শ্যামল।

বিএনপির নামের সঙ্গে মিল থাকা নতুন দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট বা বিএনএম- এ যোগ দিয়ে দলটির প্রার্থী হয়েছেন অন্তত ছয় জন সংসদ সদস্য। এবার হলেন ফরিদপুর-১ আসনের শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, বরগুনা-২ আসনের আবদুর রহমান, সাতক্ষীরা–৪ এইচ এম গোলাম রেজা, নীলফামারী–১ জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, জামালপুর–৪ মামুনুর রশিদ এবং সুনামগঞ্জ-৪ দেওয়ান শামসুল আবেদিন।

শেরপুর-১ আসনে বিএনএম থেকে প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসন থেকে নির্বাচনে লড়বেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ এ কে ইকরামুজ্জামান। তিনি মনোনয়নপত্র তোলার পর তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি।

ঝালকাঠি-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার আবুল কাশেম ফখরুল। টাঙ্গাইল-৫ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির বহিষ্কৃত নেতা খন্দকার আহসান হাবিব।

গত ১৫ নভেম্বর এই দুই নেতা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তাদের দল ভোটে না এলেও তারা নির্বাচন করবেন। এরপর বিএনপি তাদের বহিষ্কার করে।

বগুড়া-৪ (নন্দীগ্রাম-কাহালু) আসনে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মোল্লা। তিনি ১৯৯৬ সালে ওই আসন থেকে ধানের শীষ নিয়ে জিতেছিলেন।

কুমিল্লা-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ। অবশ্য তিনি আট মাস ধরেই নিজ দলে অপাংক্তেয়। গত মার্চে জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি নামে একটি সংগঠনে জড়িয়ে বিএনপির পদ হারিয়েছেন তিনি।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুটি নির্বাচনে জেতা এই নেতাকে বিএনপি প্রার্থী করে ২০০১ ও ২০১৮ সালেও। পরে বিএনপির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। 

ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন ২০০১ সালে ধানের শীষ নিয়ে জয়ী দেলোয়ার হোসেন খান দুলু। তিনিও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। 

‘ভালো মানের নির্বাচন হবে না’

আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ ৩২টি নিবন্ধিত দল ভোটে এলেও একে ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন বলতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিএনপির অংশগ্রহণ করা বা না করার বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক মানসিকতার বিষয়। দলগুলোর তৈরি রাজনৈতিক সংকট আবার তারাই এ সংকটের জন্য পরস্পরকে সমালোচনা ও দায়ী করছেন।

“এমন পরিস্থিতিতে এটা সামনে মানের নির্বাচন হবে না। বড় কথা হচ্ছে-বিরাট একটা অংশ ভোট দিতে যাবে না বা নির্বাচনে খেলছে না। তাদেরও (বিএনপি) ৩০ শতাংশের এর কাছাকাছি সমর্থক রয়েছে, আরও কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল রয়েছে। তাদের তো চান্সই দিল না।”

তার মতে, এবারের নির্বাচনে দলের সঙ্গে দল নয়, লড়াই হবে বড় দলের নিজেদের নেতাদের মধ্যে, যেখানে ক্ষমতা আর অর্থের প্রভাব থাকবে।

“অন্য ছোটদলের কাউকে ছাড় দিলে হয়ত জায়গা পাবে তারা। তাতে হয়ত কয়েকটা সিট পাবে ছোট দল”, বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগে স্বতন্ত্রের মিছিল নিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভনিতা হলো। এতে দলের মধ্যে বিরোধ বাড়বে, অসহিষ্ণুতা দেখা যাবে, দলীয় কোন্দল হবে, যাতে সহিংতার আঁচও বাড়বে, যা দলের জন্য ভীষণ ক্ষতি হবে।”

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনে ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছে। সেসব নির্বাচনে ৭০-৮০ শতাংশ ভোটও পড়েছে। কিন্তু যে নির্বাচনগুলোয় কোনো বড় দল অংশ নেয়নি সেখানে ভোটারও কম এসেছে, গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও এক ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।”

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, “কিছু দলছুট নিয়ে বা নতুন দল নিয়ে অংশগ্রহণ করার চেষ্টা চলছে। এভাবে অংশগ্রহণমূলক বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

আওয়ামী লীগের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’র কৌশল নিয়ে এই নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “আন্তর্জাতিকমহলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি খুব সমালোচনা হয়। এ থেকে বাঁচার জন্যে এ কৌশল নেওয়া হয়েছে। এটা সাজানো প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নতুন প্যাটার্ন। এটার ভালো দিকও থাকতে পারত যদি ভেতরে ভেতরে বলা হতো। কিন্তু ঘোষণা দিয়ে ডামি প্রার্থী করাটা দৃষ্টিকটূ।”

ভোট বর্জনের মধ্যে সহিংতার শঙ্কাও দেখছেন আব্দুল আলীম।

“ভোটে যাচ্ছে না আবার বসে থাকবে তা ভাবা যায় না। এখন অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে তারা প্রতিরোধ করার মানসিকতায় যেতে পারে।”

ভোটে কোন কোন দল

নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী এবার যেসব দল ভোটে এসেছে সেগুলোর মধ্যে আছে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে আছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল।

ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি-জেপি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাকের পার্টিও ভোটে এসেছে।

সংসদে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পাশাপাশি আছে নতুন দল তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপিও ভোটে অংশ নিচ্ছে।

বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সঙ্গে জোট করে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।

অন্য দলগুলো হলো গণফোরাম, গণফ্রন্ট, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ কংগ্রেস জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।