১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ কী?

“আমরা ১৪ দলীয় জোটগতভাবে কোথাও একত্রিতও হইনি বা কোনো কথাও হয়নি। আমরা স্বাভাবিকভাবে আমাদের দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি,” বলেন জেপি নেতা শেখ শহিদুল ইসলাম।

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ কী?
সবশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নি-সংযোগ করে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা।

কাজী মোবারক হোসেন

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Sep 2025, 01:49 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:19 PM

রাজনীতির ময়দানে জাতীয় নির্বাচনের আলোচনা শুরু হয়ে গেলেও নতুন বাস্তবতায় তা থেকে বহু দূরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা। বরং আওয়ামী লীগ বাদে বাকি শরিকরা রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াবে কীভাবে, কর্মসূচি নিয়ে আবার রাজনীতির মাঠে নামতে পারবে কিনা-এসব প্রশ্নে নিজেরাই সন্দিহান।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের তকমা পাওয়া জাতীয় পার্টিও রাজনীতির জমিন ফিরে পাওয়া আর নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে।

ভাঙনে নাস্তানাবুদ দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও হোঁচট খাচ্ছে বারবার। সর্বশেষ অগাস্টে আরেক দফা ‘ভাঙন’ ধরেছে জাতীয় পার্টিতে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রায় দুই দশকের পথচলায় ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। 

জোটের সমন্বয়ক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

সংস্কার উদ্যোগ বা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার কোনো কিছুতেই ডাকা হয়নি জোটের কোনো শরিক দলকে।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আলোচনায় জাতীয় পার্টি অংশ নিলেও পরে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতার মুখে পরবর্তী সময় আর কোনো উদ্যোগ-আলোচনায় দলটি রাখা হয়নি।

১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (জেপি) এর সাধারণ সম্পাদক শেখ শহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৫ আগস্টের পর থেকে ১৪ দল (জোট) আসলে অকার্যকর। যেহেতু অকার্যকর, সুতরাং এটা নিয়ে এখন কোনো ভাবনাও নাই। ভবিষ্যৎ নিয়ে তো এখন কিছু বলা যায় না।”

গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। 

গত বছরের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড় ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় প্রায় নিষ্ক্রিয় থেকেছে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা।

শেষ মুহূর্তে সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে অগাস্টের প্রথম থেকে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামারও পরিকল্পনা নেয় জোটটি। কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যে সরকারের পতন ঘটলে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারাও গা ঢাকা দেন। 

সরকারের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়াও ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুইজনই আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী।  

জাতীয় পার্টি (জেপি) নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে আটক করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের এই জোটের নেতাকর্মীরাও মামলার ভয়ে চুপসে যান। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরেও পরিস্থিতি প্রায় একইরকম আছে।

১৪ দলের শরিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বছর ধরে হাতে গোনা দু-একটি ছাড়া দলগুলোর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, কোনো কর্মসূচি নিতেও পারছে না। বলতে গেলে তাদের রাজনীতির বাইরেই থাকতে হচ্ছে। 

নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি কোনো কোনো দল প্রায় অস্তিত্বহীন পড়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে রাজনৈতিকভাবেই দলগুলোর অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাদের অনেকে। 

আদালতে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ফাইল ছবি

আদালতে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ফাইল ছবি

জোট নিয়ে যা বলছেন ১৪ দলের শরিক নেতারা

জোটের শরিক অন্তত চারটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো কোনো দলের কিছু নেতা-কর্মী নিজেদের দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছেন। কোনো কোনো দল স্বল্প পরিসরে ও সংক্ষিপ্তভাবে দুই-একটি দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালন করছে।

ওই নেতারা বলছেন, সার্বিকভাবে এখনো তারা পরিস্থিতি প্রতিকূল বলেই মনে করছেন। শিগগির স্বাভাবিক হবে, এমন আশাও তারা দেখছেন না। এই পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।  

তোপখানা রোডে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কার্যালয়টির সামনে আড্ডা দিচ্ছেন। কথা বলতে বলতে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করে দেখা যায়, আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে সময় দিচ্ছেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে, আর সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা চলে গেছেন আত্মগোপনে। দলটি চলছে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে।

জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ বকুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের পার্টির সভাপতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই মাহমুদুল হাসান মানিককে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আমাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। আমরা আমাদের পার্টি অফিসে প্রয়োজন অনুযায়ী বসছি। আর দলীয় সকল কর্মসূচি পালন করছি।”

১৪ দলের সবশেষ অবস্থা কি, জোটের সাথে কীভাবে আছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “৫ অগাস্টের পর থেকে তো ১৪ দলের কার্যক্রম নেই। জোট বর্তমানে অকার্যকর, কোনো কর্মসূচি গত এক বছরে ছিল না, ভবিষ্যতে আসলে কী হবে জোটের ও দলের, সেটা এখনই বলা যাবে না। 

“১৪ দলের বিষয়টা এখন আর সেইভাবে নেই। সুতরাং সেটা নিয়ে এখন তো কোনো কথাও নেই।”

গত এক বছরে কয়েকটি দলীয় কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় পার্টি (জেপি)। ৯ অগাস্ট জাতীয় পার্টির অপর একটি অংশের সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন জেপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। 

তার আগে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে দলের একাংশের স্মরণ সভায় যোগ দিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও শেখ শহিদুল ইসলামসহ দলের নেতাকর্মীরা।

জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা ১৪ দলীয় জোটগতভাবে কোথাও একত্রিতও হইনি বা কোনো কথাও হয়নি। আমরা স্বাভাবিকভাবে আমাদের দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।”

আদালতে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। ফাইল ছবি

আদালতে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। ফাইল ছবি

রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদ (ইনু) কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় মধ্যম সারির কয়েকজন নেতাসহ বিভিন্ন স্তরের দলীয় নেতাকর্মীরা বসে আছেন।

দলের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের দলীয় দিবসভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যেই আছি। আমাদের দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ভাইয়ের মামলা সংক্রান্ত বিষয়াদির তদারকি, পাশাপাশি দলের অন্যান্য নেতাকর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টায় আছি।”

জোট শরিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর ন্যাপ) এর এক নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিলতার দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। পার্টি কোনোরকম টিকে আছে। প্রকাশ্য কার্যক্রম নেই, ভেতরে ভেতরে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। আমাদের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি শিগগির অনুকূল হবে বলে মনে হচ্ছে না। 

“দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে আমরা কী করব।”

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতাদের বৈঠক। ফাইল ছবি

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতাদের বৈঠক। ফাইল ছবি

১৪ দলীয় জোটের পূর্বাপর

বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার গুলিস্তানে তখনকার আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়।

এ ঘটনার পর ২৩ দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সে বছরই রাজনীতির মাঠে আসে ১৪ দলীয় জোট। সে হিসাবে জোটটির বর্তমান বয়স ২১ বছর। 

‘মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িকতার’ আদর্শে যাত্রা শুরুর পর গণঅভ্যুত্থানের মুখে ছত্রভঙ্গ এ জোটে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জাতীয় পার্টি (জেপি), ন্যাপ (মোজাফফর) ছাড়াও আছে- গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল (দিলীপ বড়ুয়া), তরিকত ফেডারেশন, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, বাসদ (রেজাউর রশিদ)। অর্থাৎ ১৪ দলীয় বলা হলেও জোটে আছে ১২ দল।

বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলনের পর নানা ঘটনাপ্রবাহে ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বড় বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে ১৪ দল ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে গড়া মহাজোট। 

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

১৪ দল ও জাতীয় পার্টির মহাজোট

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনে ২৬২ আসে জিতে সরকার গঠন করে, সেই মন্ত্রিসভায় শরিক জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাম্যবাদী দল যোগ দেয়।

বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে জাতীয় পার্টি অংশ নেয়। দশম সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেও সরকারে যোগ দেয় জাতীয় পার্টি। ১৪ দলীয় জোটের জাতীয় পার্টি (জেপি), ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ নেতাদের কয়েকজন মন্ত্রিত্ব পান। সেবার বাদ পড়েন সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া।

তবে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে গঠিত সরকারে আওয়ামী লীগ আর শরিকদের জায়গা দেয়নি। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন বণ্টনে উদাসীনতা দেখায় আওয়ামী লীগ। শেষ পর্যন্ত জোটের সঙ্গে ৬ আসনে সমঝোতা হয় দলটির। কিন্তু এসব আসনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় জোট শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা এ কে এম রেজাউল করিম ছাড়া কেউ জয় পাননি।

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিকদের নিবন্ধন বাতিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আবেদন দেয় গণঅধিকার পরিষদ। ফাইল ছবি

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিকদের নিবন্ধন বাতিলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আবেদন দেয় গণঅধিকার পরিষদ। ফাইল ছবি

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিকদের ‘নিষিদ্ধের’ দাবি

সরকারবিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। সেই সংসদ বিরোধী দলে ছিল দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টি। 

অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর ক্ষমতাচ্যুত ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলকে ‘ট্যাগ’ দিয়ে নিষিদ্ধ করার ও বিচারের দাবি ওঠে।

জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল যে পাঁচ দফা দাবি আাদায়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়ে মাঠে নেমেছে, সেখানে এই দাবিটিও আছে।

তার আগে গত বছরের অক্টোবরে একদল লোক ঢাকার বিজয়নগরে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এ বছর রংপুরে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাড়িতে হামলা হয়। 

সবশেষ ৩০ অগাস্ট এবং ৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে দুই দফা হামলা, ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা। সে সময় জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি নতুন করে আলোচনায় আসে। 

এসব ঘটনায় চাপের মধ্যে থাকা দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কয়েকজন আলাদা সম্মেলন করে আরেকটি কমিটি করেছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে আলাদা হয়ে যাওয়া এরশাদপত্মী রওশন এরশাদের অনুসারীরা। 

এ বছর মে মাসে আওয়ামী লীগ ও তার সকল সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের অন্যান্য শরিক দলগুলোর বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ওঠে।

আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উকিল নোটিস পাঠানো হয়। নোটিসে এসব দলকেও ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

১৮ মে লক্ষ্মীপুর জেলার বাসিন্দা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হোসাইন মো. আনোয়ারের পক্ষে আইনজীবী সালাহ উদ্দিন রিগান এ নোটিস পাঠান।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছাড়াও এই নোটিস পাঠানো হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবের কাছে।

জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিতের দাবিতে সোচ্চার অবস্থানে রয়েছে গণঅধিকার পরিষদ।

আগামী সংসদ নির্বাচনে এসব দল যাতে অংশ নিতে না পারে, সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন।

আগে ১২ মে জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদন করে গণঅধিকার পরিষদ।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও তার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। ফাইল ছবি

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও তার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। ফাইল ছবি

যা বলছে জাতীয় পার্টি

বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ২০১৪ সালে আলাদা নির্বাচন করে দশম সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি।

সে সময় হতে শেখ হাসিনা সরকারের টানা তিন মেয়াদে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টির জিএম কাদের অংশের মহাসচিব শামীম পাটোয়ারী আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা না থাকার চেয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়াটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপি তো ১৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৯৬) একতরফা নির্বাচন করেছিল। সেজন্য বিএনপিকে তো আর পরবর্তী ভোটে কেউ বয়কট করেনি। তাহলে ২০২৪ সালের পরে জাতীয় পার্টিকে কেন ‘দোসর’ তকমা দেওয়া হচ্ছে?” 

১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানের পরের বছরের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণে কেউ বাধা দেয়নি তুলে ধরে সাবেক এই এমপি বলেন, “৯১ সালেও তো আমাদেরকে কেউ নিষিদ্ধ করেনি বা সে অভিযোগও আসেনি। আমাদেরকে কেউ দোসর বলেনি।” 

শামীম হায়দার বলেন, “রাজনীতিতে আমাদের ভোটাররা আমাদের ভোট দিবে, অন্যদের ভোটাররা অন্যদেরকে ভোট দেবে। তবে একজন আরেকজনকে গালিগালাজ করা, দোসর বলা, এগুলো বললে রাজনৈতিক ঐক্যটা নষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় ঐক্যের যে সম্ভাবনা সেগুলো বিনষ্ট হয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে এই পারস্পরিক সম্মানবোধ, শ্রদ্ধাবোধটা থাকা প্রয়োজন।”

জাতীয় পার্টি মহাসচিব বলেন, “অনেকে আমাদের স্বৈরাচারের দোসর বা গৃহপালিত বিরোধী দল বলেছিল, প্রতিপক্ষরা আমাদের বিরুদ্ধে বলবেই। আমরা আওয়ামী লীগের আমলে অনেক অত্যাচারিত ছিলাম, আমাদের পার্টির চেয়ারম্যানকে অনেক নির্যাতন করা হয়েছিল। দলের নেতাকর্মীরা নির্যাতিত হয়েছিল। 

“বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা আওয়ামী লীগের নির্যাতনের প্রতিবাদও করেছি। সংসদে, টকশোয়ে, সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ করেছি।”

তার ভাষ্য, “আমরা আওয়ামী লীগের দোসর কখনোই না, আমরা ভোটে গিয়েছিলাম, এটা সত্য। সে কারণে যারা ভোটে যায়নি, তারা আমাদের দোষারোপ করেছে। এই অধিকার তাদের আছে। তবে কাউকে দোসর ‘গালি’ দেওয়া, সহযোগী ‘গালি’ দেওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। 

“আর আমাদের দেশ একটাই। যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি করতে হয়, যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোট করতে হয় সবাইকে নিয়েই ভোট করতে হবে।” 

দল ‘হাতছাড়া’ দিলীপ বড়ুয়ার 

গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল) এর নেতা দিলীপ বড়ুয়াকে।

তবে তার দলের একটি প্রতনিধিদল ১৩ অগাস্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসির সঙ্গে বৈঠক করেন।

ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে বৈঠক শেষে নিজেকে সাম্যবাদী দলের সভাপতি পরিচয় দিয়ে হারুন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “আমি সাম্যবাদী দল মার্কসবাদী লেনিনবাদীর প্রেসিডেন্ট। 

“আমাদের দলে পরিবর্তন হয়েছে, আমাদের আগে ছিল সেক্রেটারিয়েট পার্টি (সম্পাদক দিয়ে পরিচালিত দল)। সেক্রেটারি ক্ষমতার মালিক, আর পলিটব্যুরো। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সম্মেলন করে আবার প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারিশিপ চালু করছি।”

এ বিষয়ে জানতে দিলীপ বড়ুয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

হারুন চৌধুরী বলেছেন, তারা ভোটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নানা কারণে বিতর্কিত দলটির ‘সাবেক সাধারণ সম্পাদক’ দিলীপ বড়ুয়া কোথায় আছেন, জানেন না তারা।

তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারিতে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসার বিষয়টিসহ হালনাগাদ কমিটি নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে। তাদের নিবন্ধন নম্বর ৩, প্রতীক চাকা।

পুরনো খবর:

১৪ দল ও জাপার নিবন্ধন বাতিলের দাবি গণঅধিকার পরিষদের

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন

শুধু কি আমরাই হাসিনার নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছি: জি এম কাদের

ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের বিরুদ্ধে ববি হাজ্জাজের অভিযোগ