Published : 05 Jul 2026, 06:38 PM
আওয়ামী লীগ আমলে প্রণীত আইনেই দলটি নিষিদ্ধ হতে পারে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সন্ত্রাসের অভিযোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে আওয়ামী লীগেরই প্রণীত আইনের বিধান অনুযায়ী দলটি নিষিদ্ধ হতে পারে এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।
রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি এ কথা বলেন।
আগের দিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে শিগগিরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
“রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, আপনারা দাবি করেছেন; তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে, ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে—সেই রাজনৈতিক দলকে বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। সংবিধানের ৪৭ আর্টিকেল অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে, রাজনৈতিক দলের সংগঠনের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।”
আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং ট্রাইব্যুনাল আইনে সংগঠন হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলে রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করতে পারে। এছাড়া আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত হলে ব্যক্তির সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংগঠন হিসেবে তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট’ করা হয়। এ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে বিচারের আওতায় আনা এবং স্বাধীনভাবে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ পরিচালনার বিধান যুক্ত করে ২০০৯ সালে আইনে কিছু সংশোধনী আনা হয়।
এর ভিত্তিতেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের যুদ্ধাপাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির একজনের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হয়।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনালকেই বেছে নেয়। সেখানে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল আইনে আরেক দফা সংশোধনী আনা হয়।
ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর ইতোমধ্যে ছয়টি মামলার রায় এসেছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল বলেন, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রণয়ন করে এবং ২০১৩ সালে তারাই ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অর্গানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করে।
তিনি বলেন, একইভাবে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান এবং ২০১১ সালে সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদে সংশোধনীও তারা আনে। এই আইনের ১৮-ধারা ব্যবহার করেই আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল।
জুলাই আন্দোলনের মধ্যে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াত এবং এর সব অঙ্গ সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই মাসেরই ২৮ তারিখে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকার।
আইনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, “আইন কখনো খারাপ হতে পারে না এবং এটি চ্যালেঞ্জও হয়নি। তবে আইন প্রণয়ন করে তা যদি অপপ্রয়োগ বা লঙ্ঘন করা হয়, তবে সেটি অপরাধ ।”
সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের অতীত তুলে ধরতে গিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল কায়েম, সকল রাজনৈতিক দল ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে মাত্র চারটি পত্রিকা রাখা, রক্ষীবাহিনী গঠন করে মানুষ হত্যা এবং স্বৈরশাসনকে সহায়তার মতো কর্মকাণ্ড করেছে দলটি।”
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ টানা সাড়ে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিল।
সেই সময় দেশে ‘ফ্যাসিবাদ কায়েম’ করা হয়েছিল মন্তব্য করে আমিনুল ইসলাম বলেন, গত ১৬ বছর মানুষের কোনো স্বাভাবিক জীবন বা রাজনৈতিক চর্চা ছিল না। তারা সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে এবং ‘দিনের ভোট রাতে’ বা ‘আমি-ডামি-তুমি’ মার্কা প্রহসনের নির্বাচন করেছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। সে অনুযায়ী ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই।
বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হয়ে যান। সেই সংসদকে ‘বিনা ভোটের সংসদ’ আখ্যা দেয় ভোট বর্জন করা বিএনপি।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। অধিকাংশ ভোট আগের রাতে হয়ে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যে বিরোধীরা মাত্র সাতটি আসনে জয় পায়। সে নির্বাচনের নাম হয় ‘নীশিরাতের নির্বাচন’।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারিতে বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখাতে শরিক ও বিরোধীদল জাতীয় পার্টির জন্য আসন ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে দলের বিদ্রোহীদের। এ নির্বাচনের নাম হয় ‘আমি আর ডামি’ নির্বাচন।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, জুলাই আন্দোলনে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও যুবলীগ জনগণের ওপর আক্রমণ চালিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে। এছাড়া অর্থপাচার এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়গুলোও একটি সংগঠন নিষিদ্ধের উপাদান হিসেবে আসতে পারে।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে আমিনুল বলেন, ২০১০ সাল থেকে শুরু করে গুম, অপহরণ ও ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। জুলাই বিপ্লব ও ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেখ হাসিনার ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আইনি মোকাবিলা করা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দেশে ফেরালে তার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থার দরকার নেই। তার শাসনামলেই তিনি যেসব জেলখানা বা জায়গা তৈরি করে রেখে গেছেন, আইন অনুযায়ী তাকে সেখানেই রাখা হবে।”
শাপলা চত্বর মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ শুরু থেকেই প্রসিকিউশনের হাতে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ইনুর নির্দেশনায় দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ, লাইসেন্স বাতিল ও কার্যালয়ে হামলা হয়েছিল, যা তিনি নিজেই সংসদে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছিলেন।”
জুলাই আন্দোলনে স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার নিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, পুলিশের অস্ত্রগুলো মিথ্যা বরাদ্দের মাধ্যমে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশের পাশাপাশি তারা তা ব্যবহার করেছে।
তদন্তের আওতা নিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে শুধু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেও তদন্তে ১৪ দলীয় জোট বা অন্য কোনো দলের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে উঠে আসবে।
ট্রাইব্যুনালে আসা প্রতিটি অভিযোগই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “এখানে কোনোটি কম বা বেশি অগ্রাধিকার পায় না। তদন্ত কার্যক্রমে সরকারের বা অন্য কারও কোনো হস্তক্ষেপ নেই এবং তদন্ত সংস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে।”
জুলাই আন্দোলন দমনে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত দায় এবং সংগঠনের আলাদা দায়—উভয়ই তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
গত অক্টোবরে ট্রাইব্যুনালের তখনকার প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ বিচারের জন্য আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।