Published : 31 May 2026, 09:10 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী; দুইশর বেশি প্রার্থী দেওয়ায় তাদের মোট এ ব্যয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী সীমার মধ্যেই আছে।
কিন্তু গোল বেঁধেছে সোয়া দুইশ প্রার্থীর বিপরীতে চার কোটি টাকা ব্যয় দেখানো নিয়ে। যেখানে প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা দেওয়ার সুযোগ ছিল সেখানে আরও ৬০ লাখ টাকা বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয়ের বিষয়ে আরপিওতে বলা হয়েছে, যে দল দুই শতাধিক প্রার্থী দিয়েছে, তারা সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে পারবে।
আর প্রত্যেক প্রার্থীকে দল থেকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া যাবে। কিন্তু জামায়াত অনেক প্রার্থীকে দুই লাখ টাকা করেও দিয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ৫ টি দল। ভোটের ফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে (১৩ মে ছিল নির্ধারিত সময়) জামায়াতসহ ২৭টি দল ব্যয় রিটার্ন জমা দেয়।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী ১২ মে ইসি সচিব আখতার আহমেদের কাছে জমা দেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
সেখানে মোট ব্যয় দেখানো হয় ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা। এর মধ্যে অন্তত ২২৫ জন প্রার্থীকে অনুদান হিসাবে দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি টাকা। গড়ে প্রত্যেক প্রার্থী দল থেকে প্রায় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা পেয়েছেন।
বাকি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে নির্বাচনি ইশতেহার ডিজাইন ও ছাপা, সংবাদ সম্মেলন আয়োজন, আপ্যায়ন, নির্বাচনি সামগ্রী পরিবহন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সফর এবং বিজ্ঞাপনের খরচ বাবদে।
নির্বাচনি প্রচারে ২০ লাখ ৯০ হাজার ৮২৭ টাকা, পরিবহন খাতে ৮ হাজার ৭০০ টাকা, জনসভা ও সফর বাবদ ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৫৯৯ টাকা, স্টাফ খরচ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯০২ টাকা এবং আবাসন ও প্রশাসনিক খাতে ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪৪ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে দলটি। এছাড়া বিবিধ খরচ হিসাবে আরও ২ লাখ টাকা।
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন রোববার বলেন, মোটামুটি অর্ধেক দল নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী জমা দিয়েছে, বাকি ২৩টি দলকে এক মাস সময় (১৪ জুন পর্যন্ত) দেওয়া হয়েছে।
যেসব ব্যয় বিবরণী জমা পড়েছে, সেগুলো আরপিও অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কমিশনে উপস্থাপন করা হবে বলে মনির হোসেন জানান।
জামায়াতের নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে ‘গড়মিলের’ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এ কর্মকর্তা বলেন, “প্রার্থীপ্রতি সর্বোচ্চ এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে পারে দল। এখন ব্যয় রিটার্ন এর কাগজপত্র পর্যালোচনা করার পর করণীয় বিষয়ে বলা যাবে।”

কী বলছে জামায়াত
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলছেন, প্রার্থীদের দলীয় অনুদান বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি ইসির পক্ষ থেকে তাদের নজরে আনা হয়নি।
অনেক প্রার্থীকে ২ লাখ টাকা করে অনুদানের বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার তিনি বলেন, “বিষয়গুলো তো উনারা প্রথম বলেনি, বলেছে আরপিওতে আছে। কোনো নোটিস দেয়নি সর্বোচ্চ কত, সর্বনিম্ন কত। নিয়মের কোনো ধার ধারে না মনে হয়। এখন আমরা দিয়েছি (ব্যয় রিটার্ন) আমাদের জিজ্ঞেস করছে। আর যারা ব্যয় রিটার্ন দেয়নি, সময়ও চায়নি তাদের জন্য খোলা রয়েছে–এই অবস্থা আর কি।”
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, প্রার্থীদের যে খরচ দেখানো হয়েছে তা দলের অন্যখাতেও দেখানো যায়। এ বিষয়ে এখনও ইসির সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি, কোরবানির ঈদের ছুটির কারণে যোগাযোগও হয়নি। সার্বিক বিষয়ে দলে আলোচনা করে দেখা যাবে।
ভোটের খরচ নিয়ে দলগুলো ও প্রার্থীরা যে বাস্তবভিত্তিক হিসাব দেখায় না, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নানা আলোচনায় তা তুলে ধরার কথা বলেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
“ইসিকে আগেও বলেছি, ব্যয়সীমা ধরে দিলেও এভাবে রাখঢাক করার দরকারটা কী? বাস্তবে একজন প্রার্থী খরচ করে অনেক বেশি, রিটার্ন যা দেখায় তার আলোকে ব্যবস্থা রাখবে, যত বেশি ব্যয় করবে ততবেশি ট্যাক্সের আওতায় আনতে হবে। আমরা যতটুকু খরচ করি সেটাই দেখাই, আমাদের তো আনলিমিটেড টাকা নেই।”
তিনি অভিযোগ করেন, কোনো কোনো দল ব্যয় দেখাচ্ছে শূন্য, কোনো কোনো দল বরাবরই অপেক্ষাকৃত কম ব্যয় দেখায়।
“আমরা এসব বিষয় নিয়ে পরামর্শ দিয়েছি। আমরা বলেছিলাম এসব আরেকটু খোলামেলা হওয়া উচিত, বাস্তবভিত্তিক হওয়া উচিত। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে দেখতে হবে। সব কিছুর সংস্কার, পরিবর্তন, পরিবর্ধন দরকার।নির্বাচনী ব্যয়, অডিট রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। স্বচ্ছতায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে।”

খরচে নজরদারি নেই, ব্যয় তদারকি কবে
সবশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই হাজার ২৮ জনের মত প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ভোটে ছিলেন। তাদের ব্যয় রিটার্ন জমার শেষ সময় ছিল ১৪ মার্চ।
পরে তাদের ৬ মে পর্যন্ত সময় দেয় ইসি। এ সময়ের মধ্যেও ২১ জন রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ব্যয় বিবরণী জমা দেননি । তাদের আরও এক মাস সময় দেওয়া হয়।
ভোটে থাকা দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী সাড়ে ৪ কোটি টাকা, জাতীয় পার্টি ৫ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে। আর বিএনপি, এনসিপিসহ ২৩টি দল নির্ধারিত সময়ে ব্যয় রিটার্ন জমা না দেওয়ায় তাদের ১৪ জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছে ইসি।
এর আগে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৮ দলের মধ্যে ১০টি দল কোনো খরচই দেখায়নি। দলগুলো হল–বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-এনডিএম, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ কংগ্রেস, ইসলামী ঐক্যজোট, গণফ্রন্ট, গণফোরাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বিকল্পধারা, ন্যাপ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ পৌনে তিন কোটি টাকা, জাতীয় পার্টি ৪৫ লাখ টাকা, জাসদ ৩০ লাখ টাকা ভোটের খরচ দেখিয়েছিল।
তার আগে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৪১টি দলের মধ্যে সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, জাগপা, গণফোরাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাসদ, বিকল্পধারা, এলডিপি কোনো ব্যয় দেখায়নি। সেবার আওয়ামী লীগ ১ কোটি ৫ লাখ টাকা, বিএনপি ১ কোটি ১১ লাখ টাকা, জাতীয় পার্টি সাড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছিল।
নবম সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আইন সংস্কারের মধ্যে ২০০৮ সালে প্রার্থী সংখ্যা বিবেচনায় দলের ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের জন্য ব্যয়সীমা বরাবরই নির্ধারিত ছিল। এখন সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা ও ভোটার অনুপাতে ১০ টাকা করে করে ব্যয়ের সীমা রয়েছে।
প্রধান দলগুলো প্রার্থীর অনুদান দিয়ে থাকে। আর যেসব দলের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের কোনো আর্থিক সহযোগতা দেওয়া হয়নি, তাদের খরচের খাতায় শূন্য দেখানো হয়।
নির্বাচনি আইনে দল ও প্রার্থীর ব্যয়সীমা নির্ধারিত থাকলেও তা মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই ইসির। এ নিয়ে নানা ধরনের সুপারিশ এলেও লোকবল সঙ্কটের মধ্যে ভোটের সময় তা তদারিক করা হয় না।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “এটা বাস্তব যে অনেক প্রার্থীই ব্যয়সীমার চেয়ে বেশি খরচ করে; কিন্তু খরচ দেখায় আইনে যা আছে তার মধ্যে। বাস্তবসম্মতভাবে ব্যয় নির্ধারণের বিষয়টি যেমন জরুরি, তেমনি ব্যয়সীমার মধ্যে খরচ রাখাও জরুরি। এটা সঠিকভাবে মনিটরিং করা মুশকিল।”
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ব্যয়সীমার বাইরে বেশি খরচের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখার মতো লোকবলও ভোটের সময় পাওয়া যায় না।
“দলের অডিট রিপোর্ট, দলের ব্যয় রিটার্ন ও প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় রিটার্ন ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিষয়ে এখনও আলোচনা হয়নি। এ ধরনের বিষয় কমিশনে আলোচনা হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, প্রার্থী ও দলের জন্য নির্বাচনি ব্যয় সীমা আরপিওতে নির্ধারিত রয়েছে।
“ভোটের সময় এ ব্যয় তদারকি করা খুবই দরকার। শুধু ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে দিলেই হবে না; স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তদারকির জন্য নির্দিষ্ট কমিটি করে দেওয়া উচিত। সময়ে সময়ে তা মনিটরিং করা উচিত এবং ব্যয়সীমা লঙ্ঘন করলেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সামনে স্থানীয় নির্বাচনও রয়েছে, তাতে যেন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায় সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।”
অর্থায়নে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রতি পঞ্জিকা বছরে দলের আয়-ব্যয়ের অডিট রিপোর্টও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার পক্ষে মত দেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক এ সদস্য।
পুরনো খবর-
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ব্যয় সাড়ে ৪ কোটি টাকা
ব্যয় রিটার্ন: ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যানের ভোটের খরচ ২৩ লাখ টাকা
দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব নিলেও প্রকাশে নারাজ ইসি
রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতায় বাংলাদেশের অবস্থান মধ্যম পর্যায়ে: টিআইবি
ব্যয়সীমা বেঁধে দিয়েই খালাস ইসি
৩ কোটি টাকা খুইয়েছেন জামানত হারা ১৪৫৬ প্রার্থী
নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব যথাসময়ে না দেওয়ায় সাইফুরের বিরুদ্ধে মামলা