Published : 27 Jun 2026, 03:34 PM
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ‘জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়’ মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে সংসদে ‘ফতোয়া’ প্রসঙ্গ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।
তিনি বলেন, “আমাদের চট্টগ্রামের আরেক কৃতি সন্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আজকে আমাদের চট্টগ্রামে একটা কথা এসেছে, কয় যে ফতোয়ার জন্য আর মাদ্রাসায় যেতে হবে না। আমি জিজ্ঞাস করলাম কেন? কয় যে, ফতোয়াতো আপনারদের এই পার্লামেন্টে দেওয়া হয়।
“ফতোয়া কী রকম, ফখরুল ইসলাম মাননীয় মন্ত্রী, উনি যেমন ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামী কে জানতে হলে একশ’ বছরের ইতিহাস জানতে হবে। জামাতে ইসলামী কি ইসলামী দল না অন্য কিছু সেটা আর ফতোয়া দেওয়ার দরকার নাই।”
তার বক্তব্যের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, ইসলাম নিয়ে কথা বাড়িয়ে সংসদ ‘উত্তপ্ত’ করতে চান না; তবে ১৯৭১ সালের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শনিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় এ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
গত ৯ জুন সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, “ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের জনাব মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়।”
সেদিন তিনি বলেছিলেন, “সুতরাং সবকিছুতে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না, দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।”
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সেই বক্তব্যের জবাব দেন। তার বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংক, জামায়াতের রাজনৈতিক পরিচয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং একাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক বিতর্ক একসঙ্গে উঠে আসে।
তিনি বলেন, “আমাদের চ্ট্টগ্রামে এখন বলতেছে, হাউজ অব অনার, মুক্তি যিনি, আরেকটা বললাম না। আলিফ, বা, তা জানে না।
“আমরা ফতোয়ার জন্য আর হাটহাজারী যাব না। ফতোয়ার জন্য পটিয়াও যাব না। ফতোয়ার জন্য লালবাগেও যাব না। আমাদের এই মহান পার্লামেন্টে জামাত ইসলামীকে ইসলামী দল নয় বলে যিনি বলেন, তার কাছ থেকেই আমরা ফতোয়া নেব।”
জামায়াতের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে শাহজাহান দাবি করেন,
“জামায়াত ইসলামীর ইতিহাস গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস। জামায়াত ইসলামীর ইতিহাস ইসলামের উপরে যখন আঘাত এসেছে, জামায়াত ইসলামী বজ্রকণ্ঠে রাজপথে প্রতিবাদ করেছে।”
তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ কায়েম করার জন্যই জামায়াতে ইসলামী।”
নির্বাচনের আগে জামায়াতের বক্তব্য ছিল ‘ন্যায়, ইনসাফ, বৈষম্যহীন কল্যাণময় রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা, বলেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি গত ১৮ বছরের ‘নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম-খুনের’ কথা বলেন।
জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ডের’ মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াতের এই এমপি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যের প্রশংসা করেন শাহজাহান। তার ভাষ্য, নির্বাচনের আগে দেওয়া ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানের প্রতিফলন বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে দেখা গেছে।

ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গ
বিরোধী দলের সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংকের প্রসঙ্গ আসে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম ইসলামী ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াতের এই সংসদ সদস্যের অভিযোগ করে বলেন, “এস আলমের মাসুদ, বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিয়েছেন, এস আলমের মাসুদের বিচার আপনারা করতে পারেন নাই।
“আমার ইসলামী ব্যাংকের ৮৫ হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর তার বোন শেখ রেহানা ২ লাখ ৬৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে, সেগুলোর কথা বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী আপনি উল্লেখ করেন নাই।”
ইসলামী ব্যাংকের অর্থ লোপাটের অভিযোগ তুললেও এ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
তবে বাজেট বক্তৃতায় দুর্নীতি দমনের বিষয়ে যথেষ্ট বক্তব্য নেই দাবি করে অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “আপনি আজকে বাংলাদেশে দুর্নীতি কীভাবে দমন করবেন সেটার কথা বলেন নাই।”
দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনে বিলম্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শাহজাহান বলেন, “চার মাসে এখনো পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন আপনারা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না।”
এর আগে ৯ জুন ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ব্যাংকটির শেয়ার মালিকানা, ঋণ বিতরণ, নিয়োগ-পদোন্নতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তের কথা বলেছিলেন।
ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে অস্থিরতার মধ্যে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে এক দল লোক ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনের কয়েক দিন বিক্ষোভ করে।
এমন প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি তুলে সেদিন কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ অনুযায়ী নোটিস দেন বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
ওই আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামী ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা দাবি করেনি; তারা ব্যাংকটিকে ন্যায়নীতির পথে ফেরানোর কথা বলেছে।
সালাহউদ্দিন সেদিন বলেছিলেন, “ওই ন্যায়নীতির পথে ফেরত আসার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
তিনি আরও বলেছিলেন, ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত শেয়ার মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
ইসলামী ব্যাংক ঘিরে অর্থপাচার, ঋণ বিতরণ, শেয়ার মালিকানা, সিএসআরের অর্থ ব্যবহার, নিয়োগ-পদোন্নতি ও চাকরিচ্যুতির অভিযোগ তদন্তের কথাও সেদিন বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘৭১ সালে কোথায় ছিলেন’
শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যের পর নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের বক্তব্যে ধর্ম ও জামায়াত প্রসঙ্গ আবার আসে।
ইসলাম নিয়ে বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “তর্ক উত্থাপন করে সংসদকে উত্তপ্ত করতে চাই না। শুধু একটা বলতে চাই, নিজের কথা নিজেরাই বিচার করেন, আপনারা ৭১ সালে কোথায় ছিলেন, নিজেরাই বিচার করেন। আমাকে বলা দরকার নাই।”
মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, “স্বাধীনতার একদিন আগে কারা সংগঠিত করেছে হত্যা, কারা বুদ্ধিশূন্য করতে চেয়েছিল বাংলাদেশকে, এ বিষয়টা একটু নজরে নিয়ে আসেন।”
জয়নুল আবদিন বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে রেডিওতে যুদ্ধের আহ্বান শুনেছি, ঘোষণা শুনেছি। আমরা তখন এই দলও ছিল না। দলের সদস্যও ছিলাম না, আমরা সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, “আমরা যখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে রেডিওতে যুদ্ধের আহ্বান শুনেছি, ঘোষণা শুনেছি, আমরা তখন এই দলও ছিল না। এ দলের সদস্য ছিলাম না। আমরা সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে সেদিন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি।”
বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আছে, সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর কথা বলেননি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও আহত হয়েছেন তাদের মনে রাখতে হবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “কিন্তু একাত্তরকে ভোলা যাবে না। একাত্তরের স্বাধীনতার যুদ্ধে যারা আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে, আজকে মাননীয় অর্থমন্ত্রী যে বাজেট দিয়েছেন, স্বাধীনতা পাওয়ার কারণেই।”
মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানোর জন্য অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, “অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতাটা বাড়িয়ে দেন, যাতে বাংলাদেশে স্বর্ণাক্ষরে আপনার নামটা লেখা থাকে।”