১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আম্মার পদ্ধতি’র শিক্ষাক্রম: প্রাথমিকে চড়, ডাণ্ডাবিদ্যায় অনার্স

“সভ্য সমাজে আইন, বিচারক আর প্রমাণ লাগে—এই 'ভুল' ভেঙে দিয়ে পাঁচ মিনিটে তদন্ত ও দণ্ড কার্যকরের ধন্বন্তরী 'ঘুষিবিদ্যা' আবিষ্কার করেছেন রাবি ছাত্র সংসদের জিএস আম্মার।”

‘আম্মার পদ্ধতি’র শিক্ষাক্রম: প্রাথমিকে চড়, ডাণ্ডাবিদ্যায় অনার্স
বেলচা হাতে রাবি জিএস আম্মার; সন্দেহকেই সাক্ষ্য আর প্রহারকেই শিক্ষা বানানোর এই ধারাটি দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে

চিররঞ্জন সরকার চিররঞ্জন সরকার

Published : 29 Jul 2026, 06:28 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:45 PM

হিন্দু পুরাণে অবতারের ধারণাটি ছিল বড়ই মহৎ। অন্যায় যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, ক্ষমতা যখন উন্মত্ত হয়ে ওঠে, দুর্বলের আর্তনাদ যখন আকাশ ছুঁয়ে ফেলে, তখনই একজন ‘অবতার’ আবির্ভূত হন। অতীতে কেউ রাবণের বিরুদ্ধে, কেউ কংসের বিরুদ্ধে, আবার কেউ জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। অবতারের কাজ হলো অন্যায়ের অবসান ঘটানো এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা।

কিন্তু যুগ বদলেছে; অবতারেরও বিবর্তন ঘটেছে। এখন আর অবতাররা অন্যায় ঠেকাতে আসেন না। এখন তারা অন্যায়কে আরও দ্রুত, আরও আধুনিক, আরও বৈজ্ঞানিক এবং আরও প্রাতিষ্ঠানিক করে তুলতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। আগে অবতাররা অসুর বধ করতেন; এখন তারা আগে কাউকে অসুর ‘ঘোষণা’ করেন, তারপর বধ করেন। আর অসুর নির্ধারণের জন্য লাগে না কোনো তপস্যা, কোনো ঐশী শক্তি কিংবা কোনো প্রমাণ—লাগে একটি মাত্র ‘ট্যাগ।’

মোক্ষম ট্যাগ দিতে পারলেই খেইল খতম। আদালত ছুটি, তদন্ত বাতিল এবং সাক্ষী-প্রমাণ অপ্রয়োজনীয়। বিচারবিভাগকে আর কষ্ট করার দরকার নেই। কপালে একবার ‘নিষিদ্ধ অমুক দলের সমর্থক’ সিল পড়লেই শাস্তি কার্যকর।

‘মাত্র পাঁচ মিনিটে তদন্ত, বিচার, রায় ও দণ্ড কার্যকর’ করার পৃথিবীর সবচেয়ে ধন্বন্তরী বিচারব্যবস্থা আবিষ্কারের মহান স্থপতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের জিএস আম্মার। তাকে শুধু ছাত্রনেতা বললে অন্যায় হবে। তিনি বিচারবিজ্ঞানের আইনস্টাইন, গণপিটুনি দর্শনের সক্রেটিস এবং তাৎক্ষণিক ‘ন্যায়বিচারের’ নিউটন। তিনি বুঝে গেছেন, আইনের দীর্ঘসূত্রতা সভ্যতার সবচেয়ে বড় সমস্যা। আদালতে মামলা চলবে দশ বছর, আপিল চলবে আরও দশ বছর—এত ঝামেলা কেন? অভিযোগ উঠল, পরিচয় ঠিক হলো, তারপর কিল, ঘুষি আর লাথি। পাঁচ মিনিটে তদন্ত, বিচার, রায় ও দণ্ড কার্যকর! এত দক্ষ প্রশাসনিক সংস্কার বিশ্বব্যাংকও কল্পনা করতে পারেনি!

আমরা এতদিন ভুল বুঝে এসেছি। ভাবতাম, সভ্য সমাজে আইন লাগে, বিচারক লাগে, সাক্ষ্য লাগে, প্রমাণ লাগে। কী ভয়াবহ ভুল! এসব যে কেবল রাষ্ট্রের সময়, অর্থ আর জনগণের ধৈর্যের অপচয়, তা জাতিকে হাতে-কলমে শিখিয়ে দিলেন আম্মার। তিনি এক নতুন যুগের অবতার; এমন এক যুগের, যেখানে সংবিধানের চেয়ে শক্তিশালী সন্দেহ, আর আদালতের চেয়ে দ্রুতগামী ঘুষি।

দেশের উচিত তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া; কারণ তিনি শুধু বিচারক নন, তিনি একজন মহান শিক্ষকও। এমন শিক্ষক যুগে যুগে জন্মায় না। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের মাথায় যুক্তি ঢোকানোর সবচেয়ে কার্যকর রাস্তা কান নয়, পিঠ। বই পড়ে মানুষ হওয়ার ধারণা তিনি বাতিল করেছেন। তার মতে, মানুষকে পড়াতে হলে বই নয়, মানুষকেই খুলতে হয়। তার শিক্ষাদর্শনের মূলমন্ত্র—‘যুক্তি নয়, ডাণ্ডাই শিক্ষা।’

আজকের মব সংস্কৃতির এই সোনালি সময়ে আম্মার নিছক একজন ছাত্রনেতা নন; তিনি একজন দার্শনিক, একজন সমাজসংস্কারক, একজন নৈতিক প্রশিক্ষক। আদালত যেখানে বছর ধরে বিচার করে, তিনি সেখানে মিনিটে মানুষকে শিক্ষা দিয়ে দেন। এমনকি প্রক্টরের সামনেও তিনি ক্লাস নিতে দ্বিধা করেন না। এটাকেই বলে শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতা। শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়েও পড়াতে না পারেন, তবে তিনি কিসের শিক্ষক?

আমরা এতদিন ভুল করে বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ভাবতাম। কী হাস্যকর ধারণা! আম্মার এসে বুঝিয়ে দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আসলে একটি চরিত্র সংশোধনাগার। এখানে লাইব্রেরি মানে বই পড়ার জায়গা নয়, ব্যবহারিক শৃঙ্খলা শিক্ষার ল্যাবরেটরি। রিডিং রুমে আগে শিক্ষার্থীরা বই পড়ত; এখন তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। প্রশ্ন একটাই, ‘তুই কোন দল?’ উত্তরটি যদি পরীক্ষকের মনমতো না হয়, তাহলে শুরু হয় ব্যবহারিক মূল্যায়ন। এটিই প্রকৃত ‘আউটকাম বেজড এডুকেশন’। এখানে সিজিপিএ নয়, শরীরের নীল দাগই শেখার প্রমাণ।

আম্মারের সবচেয়ে বড় অবদান অবশ্য শিক্ষাবেষ্টনীতে। এতদিন আমরা ভাবতাম, শিক্ষক বোঝান, উপদেশ দেন ও অনুপ্রাণিত করেন। কী সেকেলে চিন্তা! আম্মার প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা মানেই প্রহার। যুক্তি মানুষ ভুলে যায়, কিন্তু পাঁজরের ব্যথা, ফোলা চোখ আর ছেঁড়া জামা দীর্ঘদিন মনে থাকে। শিক্ষার স্থায়িত্ব বাড়াতে এর চেয়ে কার্যকর পদ্ধতি আর কী হতে পারে?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, দ্রুত ‘আম্মার পদ্ধতি’ জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকবে চড়ের প্রাথমিক কোর্স, মাধ্যমিকে ঘুষির ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং উচ্চমাধ্যমিকে লাথির তত্ত্ব ও প্রয়োগ। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে উন্নত ডাণ্ডাবিদ্যায় অনার্স ও গণপিটুনি তত্ত্বে মাস্টার্স। পিএইচডির বিষয় হতে পারে—‘রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণে কিল-ঘুষির কার্যকারিতা: একটি তুলনামূলক গবেষণা।’

তবে শুধু শিক্ষা কেন? দেশের আইনশৃঙ্খলার পুরো দায়িত্বও আম্মারের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এত পুলিশ, আদালত, বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তা রেখে রাষ্ট্রের লাভ কী? একজন আম্মারই যথেষ্ট। তাকে কয়েকজন যোগ্য সহযোগী দিন। তিনি সন্দেহভাজনের ফেইসবুক, মেসেঞ্জার, কললিস্ট, গ্যালারি, পুরোনো এসএমএস, এমনকি দশ বছর আগের লাইক পর্যন্ত ঘেঁটে বের করে ফেলবেন—কে ফ্যাসিবাদের দোসর, কে রাষ্ট্রবিরোধী, কে সন্দেহজনক, আর কে শুধু ভুল মানুষের সঙ্গে একবার সেলফি তুলেছিল। তারপর আর তদন্তের দরকার কী? দেশীয় প্রযুক্তিতে, দেশীয় হাতিয়ারে এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনায় শত্রু নিধন!

এটাই তো প্রকৃত ডিজিটাল রূপান্তর; আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নয়, ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস; মেশিন লার্নিং নয়, মব লার্নিং!

আম্মারের জন্য আলাদা একটি মন্ত্রণালয়ও গঠন করা উচিত—‘গণপ্রহার ও তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার মন্ত্রণালয়।’ মন্ত্রণালয়ের মূলমন্ত্র হবে, ‘সন্দেহই সাক্ষ্য, মারই বিচার।’ আদালতের পরিবর্তে থাকবে খোলা মাঠ, বিচারকের বদলে কয়েকজন বলিষ্ঠ অনুগত যুবক, আর রায় ঘোষণার পরিবর্তে সমস্বরে উচ্চারিত হবে, ‘ধর ধর... ও অমুক দলের সমর্থক!’

বিচারবিজ্ঞানে তার অবদান এতটাই বিপ্লবী যে আন্তর্জাতিক আদালতগুলোরও উচিত তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া। এতদিন মানুষকে অপরাধী প্রমাণ করতে হতো; এখন আগে অপরাধী ঘোষণা করা হয়, পরে সুবিধামতো কারণ বানিয়ে নেওয়া হয়। প্রমাণের আগে শাস্তি—এ এক অনন্য দার্শনিক উচ্চতা।

ঘরে ঘরে এমন আম্মার তৈরি হোক। সন্তান পড়তে না বসলে বোঝানোর দরকার নেই, দুটো কিল দিন। প্রতিবেশী ভিন্নমত পোষণ করলে আলোচনার দরকার নেই, কয়েকটা লাথি দিন। অফিসে মতবিরোধ? ডাণ্ডা। সংসদে বিতর্ক? ডাণ্ডা। সাংবাদিক প্রশ্ন করেছে? ডাণ্ডা। বাসে সিট নিয়ে ঝগড়া? ডাণ্ডা। ফেসবুকে ভিন্নমত? ডাণ্ডা। সাহিত্য উৎসবে মতপার্থক্য? ডাণ্ডা। এভাবেই বাংলাদেশ খুব দ্রুত বিশ্বের সবচেয়ে শান্ত দেশে পরিণত হবে; কারণ শেষ পর্যন্ত কথা বলার মতো কেউই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

আম্মারের এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে ‘আম্মার স্বর্ণ ডাণ্ডা পদক’ চালু করা উচিত। যে ব্যক্তি সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশি মানুষকে আদালতের ঝামেলা ছাড়াই শিক্ষা দিতে পারবেন, তিনিই হবেন এই পদকের যোগ্য।

আমরা এতদিন ভুল করে ভাবতাম, আইনের শাসন মানে আদালতের শাসন। আম্মার এসে সেই ভ্রান্তি দূর করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন, যার হাতে বেশি লোক, তার হাতেই আইন। সংবিধান কেবল একটি মোটা বই; আসল সংবিধান হলো মুষ্টিবদ্ধ হাত, আর তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ হলো বাঁশের লাঠি।

রাষ্ট্রের প্রতি তাই শেষ একটি বিনীত আবেদন—আর সময় নষ্ট করবেন না। বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ ও তদন্ত সংস্থা—এসব বন্ধ করে দিন। দেশের প্রতিটি থানায় একজন করে আম্মার নিয়োগ দিন। আদালতের এজলাসে বিচারকের চেয়ারের বদলে একটি মজবুত বাঁশ রাখুন। মামলার শুনানি শুরু হবে একটি মাত্র প্রশ্ন দিয়ে, ‘মোবাইলটা দাও দেখি।’ যদি ইতিহাসে কোনো লাইক, কোনো কমেন্ট, কোনো পুরোনো ছবি কিংবা কোনো সন্দেহজনক পরিচিতি পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে রায় কার্যকর। আপিলের দরকার নেই; কারণ যেখানে ডাণ্ডাই সংবিধান, সেখানে যুক্তি কেবল বিচার বিলম্বিত করে।

এমন মহান শিক্ষাগুরুকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, বই পড়ে মানুষ বানানোর যুগ শেষ; এখন মানুষ বানানো হয় পিটিয়ে। আর যে সমাজে ঘুষি যুক্তির চেয়ে বেশি সম্মান পায়, সেখানে আম্মারের মতো অবতারদের ভবিষ্যৎ শুধু উজ্জ্বল নয়, প্রায় অবধারিত!

চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com