সরকারি চাকরিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমায় উদ্বেগ মহিলা পরিষদের, কোটা পুনর্বহালের দাবি
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নারী কোটা বাতিল করা হয়।
সরকারি চাকরিতে গত কয়েক বছরে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমেছে তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
নারীর জন্য কোটা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার পরিষদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “মহিলা পরিষদ মনে করে সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ কমে যাওয়া কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়, এটি নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার এবং অর্ন্তভূক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ।”
২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ পদে কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ ছিল। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, জেলাভিত্তিক ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত ছিল।
ওই বছর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা সংস্কারের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের মুখে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করা হয়। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে কোটা ব্যবস্থা আগের মতই বহাল রেখে জারি করা হয় পরিপত্র।
সর্বশেষ ৩৯তম বিসিএসে ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল ছিল বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন সরকারি কর্ম কমিশন-পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম মতিউর রহমান।
২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাই কোর্ট বেঞ্চ কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়।
পরে জুলাই মাসে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সরকার, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরির সব গ্রেডে মেধার ভিত্তিতে ৯৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার রায় দেয়।
আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং ৫ শতাংশ পদে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ কোটা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা রেখে সে বছরের ২৩ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
১০ শতাংশ নারী কোটা বহাল থাকা অবস্থায় ৩৪তম, ৩৫তম, ৩৬তম এবং ৩৭তম বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারি কর্ম কমিশনের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ৩৪তম বিসিএসে ২ হাজার ১৭৬ জন চূড়ান্ত উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৭৭৫ জন, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের শতকরা হিসাবে ৩৫ দশমিক ৬২ শতাংশ।
সর্বশেষ গত ২৮ জুন ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হয়, তাতে বিভিন্ন ক্যাডার পদে ১ হাজার ৩৩৪ জনকে নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ করে পিএসসি। সেখানে নারী প্রার্থী ২২ শতাংশ।
পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মতিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ বিসিএসে ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি নারী প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাডার পদে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে নারী ২৯৪ জন। আর পুরুষ ১ হাজার ৪০ জন।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিল।
সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানুর সই করা বিবৃতিতে বলা হয়, “দেশে এখনো উচ্চ শিক্ষায় কম অংশগ্রহণ, পরিবার ও সামাজিক দায়িত্বের অসম বণ্টন, নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্যমূলক সামাজিক প্রথা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতিকে সীমিত করে।
“ফলে নারীরা এখনও সমান প্রতিযোগিতার অবস্থানে পৌঁছতে পারে না। এ ক্ষেত্রে মহিলা পরিষদ মনে করে, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় নারীর জন্য কোটা পুনর্বহাল করা খুবই জরুরি, যা আর্ন্তজাতিকভাবেও স্বীকৃত এবং জাতিসংঘ সিডও সনদে উল্লেখ আছে।
“নারীর জন্য কোটা বহাল রাখা কেবল নারীর অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও অর্ন্তভূক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের পূর্ব শর্ত।”
যতদিন নারীরা সরকারি চাকরি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব অর্জন না করবে, ততদিন তাদের জন্য কোটাসহ বিশেষ ইতিবাচক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে মহিলা পরিষদ।
