Published : 13 Dec 2025, 08:06 PM
১৯৭১ সালের অক্টোবরের শুরুতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমার পিতা খান মো. মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করে। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন আমার চাচা নূর মোহাম্মদ খান এবং একই গ্রামের আব্দুর রহমান খান। পাশাপাশি পাশের গ্রামের দুই সহোদর আতাউর রহমান খান ও সিরাজুল ইসলাম খানও আটক হন। তারা সবাই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ছোট পলাশী ও বড় পলাশী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, অর্থসহায়তা ও প্রশিক্ষণে সমর্থন দেন। এ অভিযোগের সত্যতা ছিল। কারণ, আমাদের বাড়িতে ওই সময় ২৫ থেকে ৩০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন রাজশাহী শহর থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা পাঁচ-ছয়টি পরিবার।
আমার পিতা ছিলেন পেশায় শিক্ষক-কৃষক। চাচা কৃষক। আব্দুর রহমান খান শিক্ষক ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। আতাউর রহমান খান ও সিরাজুল ইসলাম খান ছিলেন জনপ্রতিনিধি ও কৃষক ছিলেন। পাঁচজনের মধ্যে আজ কেবল আতাউর রহমান খান ও সিরাজুল ইসলাম খান বেঁচে আছেন।
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সেনারা অভিযুক্তদের রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় দেখা করতে বলেন। সেখানে গেলে তাদের রাজশাহী সদরের বোয়ালিয়া থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। বোয়ালিয়া থানায় গেলে তাদের গ্রেপ্তার করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে বন্দি করা হয়।
১৯৭১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ শামসুজ্জোহা হল ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে এনে সেখানে বন্দি রাখা হতো। তাদের তথাকথিত বিচার এবং হত্যা করা হতো। উল্লেখ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল সংলগ্ন এলাকা একাত্তরের বড় বধ্যভূমিগুলোর একটি।
সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (তৎকালীন রিডার) ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। মোহাম্মদ শামসুজোহা স্মরণে ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এ হলটি চালু হয়।
পাকিস্তানি সেনারা শামসুজ্জোহা হলকে কেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে ঘোষণা করল ওই প্রশ্নের উত্তরে (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) একজন ইতিহাসবিদ বলছিলেন, জোহা হলকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে ঘোষণা করা ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর অত্যন্ত সচেতন সিদ্ধান্ত। এর পেছনে কাজ করেছে মূলত অধ্যাপক জোহার আত্মত্যাগকে তুচ্ছ করে দেখানোর মানসিকতা। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার পর বেশিরভাগ সময় জোহা হল নিয়ন্ত্রণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি। এই হলটি সবসময় ছাত্র শিবিরের শক্তিশালী ঘাটি হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। এই ইতিহাসবিদ আরও বলেন, জোহা হল নিয়ন্ত্রণে ইসলামিস্টদের ভূমিকা গবেষণার দিক থেকে খুব ইন্টারেস্টিং জায়গা।
এ জোহা হলের দমবন্ধ করা পরিবেশে আমার পিতা, চাচা ও স্বজনদের ৩৫ দিন কাটাতে হয়েছে। হলের তিন তলার একটি কক্ষে তাদেরকে বন্দি করে রাখা হয়। সেখানে অনেকে বন্দি ছিলেন। প্রতিদিন বন্দির সংখ্যা কমত। কারণ প্রতিরাতে বন্দিদের সারদা পুলিশ একাডেমি সংলগ্ন পদ্মা নদীর চরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হতো।
আমাদের স্বজন বন্দিরা তাদের দুঃসহ অভিজ্ঞতা উত্তরপ্রজন্মের কাছে জমা রেখে গেছেন। কেমন ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বন্দি শিবিরে কাটানো ওই ৩৫টি দিন।
আতাউর রহমান খানের বক্তব্য অনুযায়ী, তাচ্ছিল্য দিয়ে শুরু হলো তাদের বন্দি জীবন। গ্রেফতার হওয়া পাঁচজনেরই পদবি ছিল খান। কিন্তু খান মো. মোজাম্মেল হক ও নূর মোহাম্মদ খানের গায়ের রং কালো এবং উচ্চতা কিছুটা কম হওয়ায় পাকিস্তানি সেনারা তাদের খান মানতে রাজি ছিলেন না। তারা তাদের ‘লেবড়ি’ খান হিসেবে অভিহিত করেন। অন্য তিনজনের গায়ের রং ফর্সা ও উচ্চতা ভালো হওয়ার তাদের খান সম্বোধন করতে পাকিস্তানি সেনাদের বাধেনি। এ অভিব্যক্তির মধ্যে পাকিস্তানি হানাদারদের বর্ণবাদী মনোভঙ্গি স্পষ্ট হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম খান বলেন, জানালার শিকের ভেতর দিয়ে খাবার ছুড়ে দেওয়া হতো। নূর মোহাম্মদ খান ও আতাউর রহমান খান ওই খাবার খেতে পারতেন না। অন্য তিনজন তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেতেন। আতাউর রহমান খান বলেন, তার টয়লেটে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করতেন। বন্দিদের মধ্যে কথা বলা যেত না। কোনো কথা-বার্তা হচ্ছে কিনা তা শোনার জন্য রাতের বেলায় জানালার পাশে প্রহরীরা কান পেতে বসে থাকত।
নূর মোহাম্মদ খান বলতেন, অদ্ভুত ছিল পাকিস্তানি সেনাদের বিচারিক প্রক্রিয়া। কোনো যুক্তিতর্ক ছিল না। প্রত্যেক বন্দির নামে আলাদা আলাদ ফাইল ছিল। প্রতিদিন বন্দিদের বিচারের মুখোমুখি হতে হতো। কিছু বন্দিকে পাকিস্তানি সেনারা হাতের ডান দিকে, কিছু বন্দিকে বাম দিকে এবং কিছু বন্দিকে মাঝ বরাবর বসাত। যাদের হাতের ডানে বসানো হতো তারা ছাড়া পেতেন। আর যাদের বামে বসানো হতো তাদের হত্যা করা হতো, যাদের মাঝ বরাবর বসানো হতো তাদের বিচার চলত। আমার স্বজনদের ৩৫ দিন পর্যন্ত মাঝ বরাবর বসানো হয়েছিল অর্থাৎ তাদের বিচার কাজ ছিল চলমান।
বন্দিদের দিয়ে নিম্নমানের কাজ করানো হতো। আব্দুর রহমান খান উত্তরপ্রজন্মকে শুনিয়েছেন, আতাউর রহমান খান ও সিরাজুল ইসলাম খানকে দিয়ে মাঠের প্রেমকাঁটা বা চোরাকাঁটা নামেও পরিচিত ঘাস পরিষ্কার করানো হতো। তারা ছিল বিত্তশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। এ কাজ তাদের জন্য ছিল কঠিন। হাত রক্তাক্ত হয়ে যেত। আব্দুর রহমান খান পাকিস্তানি সেনাদের নানা নির্যাতনের ঘটনা দেখার সুযোগ পেয়েছেন। যেমন, বালতির ভেতর বালি ও পানি মিশিয়ে তাতে বন্দিদের মুখ ঠেসে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার রোমহর্ষক দৃশ্য।
বন্দিরা কোথায় আছেন, কেমন আছেন ওই সম্পর্কে পরিবারের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। পরিবারের সদস্যরা কেবল জানতেন পাকিস্তানি সেনারা তাদের ধরে নিয়ে গেছে। এ সময়গুলো ছিল ভিষণ দুর্বিষহ। আশপাশের গ্রামের শান্তি কমিটি ও মুসলিম লীগ সমর্থকেরা বন্দিদের বাড়িতে আসতেন স্ত্রী ও সন্তানদের সান্ত্বনা দিতেন। জানাতেন তাদের ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
একটি বিশেষ ঘটনা বন্দিদের মুক্তির পথ খুলে দেয়। তা হলো আব্দুর রহমান খানের ভূমিকা। আব্দুর রহমান খান নিভৃত পল্লিপরিসরে জন্ম নেওয়া এক অসামান্য উচ্চতার বুদ্ধিজীবী। গৌরবর্ণের আলোকময় ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রায় ছয় ফিট লম্বা ছিলেন। চলাফেরা, পোশাক-আশাকে কেতাদুরস্ত ছিলেন। বুকের ওপর চেইনসমেত ঘড়ি ঝুলিয়ে রাখতেন। ১৯৪৭ সালে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, ফার্সি ও আরবিতে তার সমান দখল ছিল। কোরান, বাইবেল, ক্রিপিটক, গীতাসহ সাহিত্য ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। জ্ঞানভিত্তিক যে কোনো আলোচনায় তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। তার আলোচনা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত।
বন্দি অবস্থায় তিনি পাকিস্তানি সেনাদের অনুমতি নিয়ে তার বড় মেয়ের কাছে উর্দুতে একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠি পড়ে পাকিস্তানি সেনারা মুগ্ধ হয়ে পড়েন। এত ভালো উর্দু লেখা তাদের কল্পনায় ছিল না। পাকিস্তানি সেনারা আব্দুর রহমান খানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করে। আব্দুর রহমান খানের আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষতা দেখে পাকিস্তানি সেনারা পুলকিত হয়। একদিন শুক্রবার জুমার নামাজে নির্ধারিত ইমাম উপস্থিত না থাকায় পাকিস্তানি সেনারা আব্দুর রহমান খান নামাজ পড়াতে পারবেন কি না জিজ্ঞেস করে? উত্তরে তিনি বলেন, পারবেন। এরপর তাকে ইমামতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে সুরা ইনশিরাহ্র ৫ ও ৬ নম্বর আয়াত ব্যাখ্যা করতে বলা হয় যেখানে উল্লেখ রয়েছে ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে’। এবং ‘নিঃসন্দেহে কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে’। তিনি দারুণভাবে তা ব্যাখ্যা করেন। এরপর আব্দুর রহমান খানকে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তি দেন। এসময় তিনি দোভাষীরও কাজ করতেন।
আব্দুর রহমান খানের পাণ্ডিত্যে পাকিস্তানি সেনারা মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের পক্ষে আর অস্ত্র তাক করা সম্ভব হয়নি। ওই সুবাদে অন্য চার জন বন্দিও বেঁচে যান। আব্দুর রহমান খানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তবে কি তিনি আত্মসমর্পন করেছিলেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘না যুদ্ধের কৌশল বদলে ফেলেছিলাম। আরবিতে নামাজ পড়াতাম আর বাংলায় দোয়া করতাম।’ কী বলতেন দোয়ায় জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ পাকিস্তানি সেনাদের বাংলার জমিন থেকে ধ্বংস করে দাও। ওরা পেছন থেকে বলত, আমিন।’
আব্দুর রহমান খান ১৯৯১ সালে প্রায় ৬২ বছর বয়সে মারা যান। আব্দুর রহমান খানের বৃদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও কৌশলে হায়েনার খাঁচা থেকে পাঁচটি জীবন ফিরে আসে। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে তারা মুক্তি পান। বীর মুক্তিযোদ্ধারা কেবল অস্ত্রে নয়, সম্মুখ সমরে নয়, নানা কৌশল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন, পরাজিত করেছেন।
সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।