Published : 26 Apr 2026, 06:20 PM
২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে এগিয়ে আনার যে ইঙ্গিত শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন দিয়েছেন, তা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষাও এগিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য হিসেবে সেশনজট নিরসন, দ্রুত ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং শিক্ষাজীবনে অপ্রয়োজনীয় বিরতি কমিয়ে আনার কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবতার বিচারে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর ও যৌক্তিক—সেই প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি।
যৌক্তিক হোক বা না হোক, শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই আলোচনা-সমালোচনার তুঙ্গে থাকছেন। ‘নকল করা যাবে না’—এই অতি সাধারণ এবং নৈতিক দাবিটিকে তিনি যেভাবে অনন্য এক কৃতিত্ব হিসেবে জাতির সামনে পেশ করেছেন, তা সচেতন মহলে হাসির খোরাক জোগানোই স্বাভাবিক। কারণ, একটি রাষ্ট্রের শিক্ষামন্ত্রী যখন মৌলিক শৃঙ্খলাকে নিজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে জাহির করেন, তখন বুঝতে হবে মূল কাঠামোগত উন্নয়নের ঝুলিটি আসলে শূন্য।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এগিয়ে আনার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, তা বাস্তবতাকে উপহাস করার শামিল। শিক্ষা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয় যে, সুইচ টিপলেই তার গতি বাড়িয়ে দেওয়া যায়। একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যক্রম শেষ করতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যে সময়ের প্রয়োজন হয়, তাকে আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে কমিয়ে আনা স্রেফ অদূরদর্শিতা। মন্ত্রীর এই ‘অ্যাডভান্স’ নীতি আদতে শিক্ষার্থীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং শিক্ষাক্যালেন্ডারের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছে।
নিঃসন্দেহে সেশনজট বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বিলম্ব, ফল প্রকাশে দেরি এবং একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অসামঞ্জস্য শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময় কেড়ে নেয়। এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক চিন্তা। কিন্তু যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। হঠাৎ করে পরীক্ষার সময় ৩-৪ মাস এগিয়ে আনার মতো বড় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে তার বহুমাত্রিক প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে—যা এই ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে হয় না।
বর্তমান দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা ইতোমধ্যে একাধিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। নতুন কারিকুলামের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, পরে আবার পুরোনো কারিকুলামে ফিরে আসা এবং পাঠ্যবই প্রাপ্তিতে বিলম্ব—এসব কারণে তাদের শিক্ষাজীবনে স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। এই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই পায়নি; ফলে তাদের শেখার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই পিছিয়ে ছিল। এই বাস্তবতায় আবার যদি পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা হয়, তাহলে সিলেবাস সম্পন্ন করা এবং পর্যাপ্ত পুনরালোচনার সুযোগ পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
শিক্ষা তো শুধুমাত্র পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক শিখন প্রক্রিয়া। শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক গভীরতা অর্জন, বিশ্লেষণ ক্ষমতা গড়ে তোলা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই পরীক্ষা নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে ‘দ্রুত শেষ করার’ মানসিকতায় পড়াশোনা করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এমনকি এতে কোচিংনির্ভরতা আরও বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না—অথচ শিক্ষামন্ত্রী নিজেই কোচিং বাণিজ্য কমাতে চান বলে ঘোষণা দিচ্ছেন।
এছাড়া প্রশাসনিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একটি পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন করা একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। নির্বাচনি পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ, ফরম পূরণ, প্রবেশপত্র ইস্যু, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব ধাপ সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। এই প্রক্রিয়াগুলো তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন করতে গেলে ভুলের আশঙ্কা বাড়বে, যা পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক চাপ। শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে পরিবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক অস্থিরতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের কারণে মানসিক চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় হঠাৎ করে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এর প্রভাব শুধু ফলাফলের ওপর নয়, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে। একটি সুস্থ ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে না; বরং তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ তৈরি করে।
অভিভাবকদের উদ্বেগও এখানে উপেক্ষা করার মতো নয়। তাঁরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তিত। তাঁদের মতে, বছরের মাঝামাঝি সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এতে অপ্রস্তুত অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষানীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ শিক্ষাব্যবস্থা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি, যেখানে সকল পক্ষের অংশগ্রহণ জরুরি।
তবে সরকারের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিক—এমন বলা যাবে না। সেশনজট কমানো, দ্রুত ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং শিক্ষাজীবনের সময় অপচয় রোধ করা—এসব লক্ষ্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা উল্টো সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সুতরাং প্রয়োজন ধাপে ধাপে, পরিকল্পিত ও পরামর্শভিত্তিক সংস্কার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো অভিভাবক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞের মতামত চোখে পড়ে। এক অভিভাবক লিখেছেন, “সপ্তম শ্রেণি (২০২৩ সালে) নতুন পদ্ধতি দিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দিয়ে (গিনিপিগ ব্যাচ)।” এটি একটি কঠিন বাস্তবতা। প্রতিটি সরকারই নিজেদের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র বানিয়ে ফেলছে। একবার ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষা, একবার এপ্রিলে, আবার ডিসেম্বরে—এই অনিশ্চয়তার চক্রে শিক্ষার্থীরা যেন পিংপং বল হয়ে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের কয়েকটি সুপারিশ প্রণিধানযোগ্য। প্রথমত, পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন করতে হলে তা কমপক্ষে এক-দুই বছর আগে ঘোষণা করা উচিত, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যাচ সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, সময়মতো পাঠ্যবই সরবরাহ, সিলেবাস কাভারেজ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা উচিত নয়। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করে একটি সমন্বিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা যেতে পারে, যাতে সেশনজট কমানো সম্ভব হয়। চতুর্থত, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে কাউন্সেলিং ও সহায়ক ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে। একটি প্রজন্মকে ‘পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা কখনোই কাম্য নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে একটি টেকসই শিক্ষানীতি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।
তাই, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বর মাসে নেওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। প্রয়োজন হলে এটি পরবর্তী ব্যাচের জন্য পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, মানসিক সুস্থতা এবং শিক্ষার গুণগত মানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই হবে একটি দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।
মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষামূলক প্রাণী নয়; তারা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের মেধা ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং সবার অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।