Published : 22 Dec 2025, 02:09 PM
চরম স্বৈরশাসন বা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রেও সাধারণত সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে কেউ আগুন দেওয়ার সাহস করে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে অবশ্য এমনটা নজিরবিহীন নয়। আগেও একবার এমনটা ঘটেছিল–১৯৭১ সালে, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ওই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাক কার্যালয় পুড়িয়ে দিয়েছিল।
ইতিহাস বলছে, ২৫ মার্চ মধ্যরাতের ক্র্যাকডাউন শুরুর পর দুই দফায় দৈনিক ইত্তেফাকে ব্রাশফায়ার করা হয়। যাতে শহীদ হন ইত্তেফাকের ক্যান্টিন ব্যবস্থাপকের ভাতিজা। পরদিন ২৬ মার্চ সকালে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় ইত্তেফাক অফিসের নিচতলায়। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে অফিস ছাড়েন সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ অন্যান্য সাংবাদিক ও কর্মীরা। পরে অবশ্য সিরাজুদ্দীন হোসেন রেহাই পাননি। বুদ্ধিজীবীনিধনের অংশ হিসেবে তাকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের চারদিন পর ৩১ মার্চ দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে দৈনিক সংবাদ পত্রিকার কার্যালয়ে। ওই আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান সংবাদ অফিসে ঘুমন্ত সাংবাদিক শহীদ সাবের।
৫৪ বছর পরে ওই নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো স্বাধীন বাংলাদেশে। গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে দেশের দুটি সংবাদপত্র ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে যখন দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়, তখনও পত্রিকা দুটির ভেতরে অনেক কর্মী কাজ করছিলেন। এর মধ্যে ডেইলি স্টার ভবনে দেওয়া আগুন ছিল ভয়াবহ। কর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে ভবনের ছাদে চলে যান। কিন্তু সেখানেও প্রচণ্ড ধোঁয়ায় তাদের জীবন বিপন্ন হয়। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে; আমরা মরে যাচ্ছি—এরকম কথাও ওই সময়ে ডেইলি স্টারের কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখে বাঁচার আকুতি জানান। যদি সত্যিই তাদের উদ্ধার করা না যেত তাহলে হয়তো ১৯৭১ সালে ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকার অফিসেরই পুনরাবৃত্তি হতো আরও করুণভাবে।
কারা কার বা কাদের উসকানিতে এই ঘটনা ঘটালেন সেটি সম্ভবত এখন আর গোপন নেই। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এখন যে কোনো অপরাধের ফুটপ্রিন্ট থাকে। অবশ্য প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা-ভাঙচুর-আগুন ও লুটপাট চালানো হয়েছে রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা দিয়ে। এই ঘোষণা ও নির্দেশের পরে কারা দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আক্রমণ করল, তার ভিডিও ফুটেজ ও স্টিল ছবি এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। অসংখ্য মানুষের মোবাইলে ফোনেও এর প্রমাণ রয়েছে। শুধু তাই নয়, হামলাকারীরা সগৌরবে নিজেরা প্রচার করেছেন তাদের কাণ্ডকীর্তি। একজনকে তো দেখছিলাম, প্রথম আলোর সামনে দাঁড়িয়ে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ পুড়িয়ে মারার ‘কৃতিত্ব’ও জাহির করছেন।
সুতরাং আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনী চাইলেই তাদের প্রত্যেককে ধরতে পারে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী অবশ্য, হামলার ঘটনায় ৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে, সরকার চাইলে এই ঘটনা শুরুতেই প্রতিহত করতে পারত। ডিএমপি বলছে, হামলার ভিডিও বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত ৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। কাজেই অনুমান করা যায়, হামলাকারীরাই শনাক্ত হয়েছে, হামলার উস্কানিদাতারা নিজ নিজ সংগঠনের ছায়াতলে নিরাপদেই আছেন এবং থাকবেন হয়তো।
যখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম আলোতে আক্রমণের ঘোষণা দেওয়া হলো বা যেহেতু প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে টার্গেট করে বেশ কিছুদিন ধরেই হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর এই আন্দাজ করা উচিত ছিল যে, প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রান্ত হতে পারে। কেননা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এর আগেও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার আক্রমণের শিকার হয়েছে। সুতরাং হাদির মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরই যখন শাহবাগে লোকজন জড়ো হতে শুরু করলেন, তখনই সরকারের বোঝা উচিত ছিল এরকম কিছু ঘটতে পারে। এ বিষয়ে যদি গোয়েন্দা তথ্য না থেকে থাকে তাহলে সেটিও গোয়েন্দা ব্যর্থতা। অর্থাৎ ঘটনা আঁচ করতে পেরে যদি আইনশৃঙ্খলা ও সেনাবাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা হতো, তাহলে এই ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে সামনে ‘মব’ চলেছে। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র কারওয়ান বাজারে সেনাবাহিনী ও পুলিশের পৌঁছাতে কত সময় লাগে? কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথারীতি বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো ঘটনা ঘটার পরে হাজির এবং এসে বলেছে, ‘কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না’! কিন্তু ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মরিয়া গেল’।
একই সময়ে নাজেহাল হয়েছেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীর। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে তিনি ডেইলি স্টারে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি দেখতে। কিন্তু সেখানে তাকে ঘিরে মব তৈরি করা হয়। তাকে নাজেহাল করা হয়। প্রসঙ্গত, বিগত সরকারের আমলে কয়েকজন ব্যক্তির ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের ‘অ্যালার্জি’ ছিল। যেমন নূরুল কবীর, আসিফ নজরুল, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। তাদেরকে টেলিভিশনের টকশোতে আনা যাবে না, এরকম একটা অলিখিত নির্দেশ ছিল। ওই আমলেও কেউ কখনো নূরুল কবীরের মতো মানুষের গায়ে হাত তোলার সাহস করেনি। কিন্তু একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের একজন খ্যাতিমান সাংবাদিককে এরকম একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হতে হলো!
দেশের দুটি জাতীয় দৈনিক এবং নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীরের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটল বা ঘটানো হলো, সরকার কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত শুক্রবার ডেইলি স্টার ভবন পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, হামলাকারীদের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ না থাকলে এই ধরনের ঘটনা ঘটানো সহজ হত না। কারা এই ঘটনায় জড়িত ছিল, তা চিহ্নিত করে সরকারকেই জনগণের সামনে উন্মোচিত করতে হবে। নাহিদ বলেন, এই ঘটনা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি ব্যর্থতা হিসেবে উল্লিখিত হয়ে থাকবে।
ঘটনার পরে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় পত্রিকা দুটির সম্পাদকদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনাদের প্রতিষ্ঠান ও সংবাদকর্মীদের ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যক্কারজনক হামলা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। আপনাদের এই দুঃসময়ে সরকার আপনাদের পাশে আছে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর এই হামলা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার শামিল। এই ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে এক বিরাট বাধা সৃষ্টি করেছে। টেলিফোনে আলাপকালে সম্পাদকদের ও সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধান উপদেষ্টা। খুব শিগগিরই এই সম্পাদকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও এ বিষয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, বৃহস্পতিবার হামলার সময় দুই সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকেরা ফোন করে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন। সব বন্ধুর কাছে আমি গভীরভাবে দুঃখিত যে কিছু করতে পারিনি। প্রেস সচিবের দাবি, সাহায্যের জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে অসংখ্যবার ফোন করেছেন। কিন্তু সাহায্য সময়মতো পৌঁছায়নি।
দেখা যাচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টার তরফে পাঠানো বিবৃতিতে ‘সম্পাদকদের ও সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতার আশ্বাস’ দেওয়া হলেও অপরাধীদের বিচারের আওতার আনার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। এমনকি প্রেস সচিবও এই ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করলেও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। এটি অনেকটা স্বজন হারানো ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো। যে চলে গেছে সে আর ফিরবে না। কিন্তু লোকেরা তাকে সান্ত্বনা দেয় যাতে সে না কাঁদে। মনে রাখতে হবে, কাউকে সান্ত্বনা দেওয়া বা বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানানো সরকারের দায়িত্ব নয়। সরকারের দায়িত্ব ব্যবস্থা নেওয়া। সরকার কেন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে উচ্ছৃঙ্খল জনতার আক্রমণ প্রতিহত করল না বা করতে পারল না—ওই ব্যাখ্যা তাদেরকে দিতে হবে।
এই ঘটনায় দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, যে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা গণবিরোধী কর্মকাণ্ড ও নীতির কড়া সমালোচনা করেছে; আওয়ামী লীগ আমলে যে পত্রিকা দুটি গণভবনে ‘নিষিদ্ধ’ ছিল; ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা যে প্রথম আলোকে আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্র ও দেশের শত্রু বলে আখ্যা দিয়েছিলেন—শেখ হাসিনার পতনের পরে ওই পত্রিকা দুটিতেই কী করে হামলা হয়? ওই পত্রিকা দুটিতেই কী করে অগ্নিসংযোগ করা হয়?
দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা ঘটল অধ্যাপক ইউনূসের মতো এমন একজন ব্যক্তি সরকারপ্রধান থাকা অবস্থায়, যার সঙ্গে এই পত্রিকা দুটির সুসম্পর্কের কথা সর্বজনবিদিত। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার আগে আসিফ নজরুল নিয়মিত কলাম লিখতেন প্রথম আলোতে। একইভাবে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং সদ্য বিদায়ী জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ, উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও প্রথম আলোর নিয়মিত লেখক। এর বাইরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সঙ্গে উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, ফরিদা আখতার, শারমিন মুরশিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও সবার জানা।
যখন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের অধিকাংশই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ঘনিষ্ঠ, ওই সময়ে কী করে এই দুটি পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ করা সম্ভব হলো? বিগত সরকার এই পত্রিকা দুটিকে ‘জাতির শত্রু’ মনে করলেও আওয়ামী লীগ বা তার কোনো সংগঠনের নেতাকর্মীরা এখানে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট বা অগ্নিসংযোগের সাহস করেনি। এখন কারা এত সাহসী হয়ে উঠল এবং তাদের এই সাহসের উৎস কোথায়—সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু এর উত্তরও অজানা নয়। বরং এবারের আক্রমণকারীরা এতটাই বেপরোয়া ও শক্তিশালী যে, তারা সেনাবাহিনীর সামনে আঙুল উঁচিয়ে বলেছে তারা ডেইলি স্টার ভাঙতে এসেছে এবং তাদেরকে ভাঙতে দিতে হবে। শুধু বাংলাদেশ নয় বরং এই ঔদ্ধত্য পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। যে বা যারা এই ধরনের ঔদ্ধত্য ও সাহস দেখাল, তাদের ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
বাস্তবতা হলো, সংবাদমাধ্যম সব আমলেই সরকারের প্রতিপক্ষ। সংবাদমাধ্যমের কাজই যখন ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা আর ক্ষমতায় থাকা লোকজন যেহেতু প্রশ্ন নয় বরং প্রশংসা শুনতেই বেশি পছন্দ করে, ফলে প্রকৃত সংবাদমাধ্যমের পক্ষে কখনোই কারও বন্ধু হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বন্ধুর অপরাধের খবরও গোপন রাখে না। ফলে ওই সংবাদমাধ্যম এক সরকারের আমলে গণন্ত্রের শত্রু তকমা পায় তো পরের সরকারের আমলেই সে আক্রান্ত হয়।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকায় আক্রমণের পরদিন উদীচী অফিসে হামলা হতে পারে–এটা বুঝতে ১৮ ডিসেম্বরের রাতজাগা মানুষের অনেকেরই অসুবিধে হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান স্পষ্টই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘বাম, শাহবাগি, ছায়ানট, উদীচীকে তছনছ করে দিতে হবে।’ যদিও পরে তিনি তার ফেইসবুকে ‘তছনছ’ শব্দটি কোনো ভৌত অবকাঠামো বা ভবন ভাঙচুর করার অর্থে ছিল না বলে দাবি করেন। ফেইসবুকের ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আমার বক্তব্য স্পষ্ট করে বলেছি, শুধু রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয় না। শহীদ ওসমান হাদি ভাই ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আওয়ামী প্রক্সি উদীচী, ছায়ানটের কালচারাল হেজেমনির বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছিল, সেই লড়াই জারি রাখতে হবে। তাদের সকল আধিপত্যবাদী বয়ানকে তচনচ করে দিতে হবে। ইট, পাথরের দেয়াল ভেঙে আধিপত্যবাদকে মোকাবিলা করা যায় না, সেটা হাদি আমাদের শিখিয়েছে...।’
তবে তার বক্তব্যের পরদিন তছনছ হয়েছে উদীচীও এবং এই তছনছের ঘোষণা প্রতিরোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি রাষ্ট্রের তরফের। এই নীরবতা রাষ্ট্রকে কার্যত নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতেই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিলপরবর্তী সমাবেশে দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে বলে ঘোষণা দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) ও শিবির নেতা মোস্তাকুর রহমান। ওই দুই নেতার বক্তব্যের ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে এখনও ছড়িয়ে আছে।
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা চালাতে রাকসুর ভিপি ও শাখা শিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছে ছাত্রসংগঠনটি। সংবাদমাধ্যমে পাঠানো সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এক যৌথ বিবৃতিতে এ দুজনের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এসব হামলার দায় শিবিরের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে দাবি করে তারা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
প্রতিবাদে এই দুই নেতার ‘ব্যক্তিগত’ অবিমৃষ্যকারিতায় সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা তার উল্লেখ নেই বলে জানতে পেরেছি।