Published : 20 Jan 2026, 05:04 PM
জনতুষ্টিবাদ বা লোকরঞ্জনবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অত্যন্ত একটি চর্চিত বিষয়। নগর রাজ্য থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে দীর্ঘদিন ধরে এর অস্তিত্ব থাকলেও শব্দগত প্রতিষ্ঠা বা আবিষ্কার হয় ১৯ শতকের শেষের দিকে। ১৮৯২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো জনতুষ্টিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, এ সময় দেশটিতে পপুলিস্ট পার্টি নামে একটি দলও গড়ে উঠেছিল। যারা জনগণের আইন ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। তাদের প্রধান শত্রু ছিল ক্ষমতাবান, সম্পদশালী অভিজাতরা।
বহু তাত্ত্বিক নানাভাবে জনতুষ্টিবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন। সংক্ষেপে বললে, এটি এমন একটি ধারণা যা বাস্তব পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ প্রভাবকে বিবেচনা না করে জনগণকে তুষ্ট বা খুশি করার লক্ষ্যে কাজ করে। এটি অনেক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক, আবার অনেক ক্ষেত্রে স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। যেখানে সুচিন্তিত মতামত, যুক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রভাবকে পাশ কাটানো হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদ জনতুষ্টিবাদের বড় উপসর্গ। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য, সামরিক, অসাংবিধানিক, অনির্বাচিত, অজনপ্রিয় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা এই জনতুষ্টিবাদের আশ্রয় নেন। জনতুষ্টিবাদের চর্চায় বিশ্বখ্যাত ছিলেন আর্জেন্টিনার কর্তৃত্ববাদী শাসক জেনারেল হুয়ান ডমিংগো পেরন।
বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ একটি জনতুষ্টিবাদী ধারণা। যার অধীনে জাতিসংঘের বিভিন্ন দাতব্য প্রকল্পে মার্কিন সহায়তা বন্ধ হচ্ছে, অভিবাসীদের নিষ্ঠুরভাবে আমেরিকা থেকে তাড়ানো হচ্ছে, আবার অন্যদিকে চলছে নানা উছিলায় নতুন দেশ ও ভূখণ্ড দখলের তোড়জোড়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারও অনেকগুলো জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছে। খুব সম্ভবত এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্য চুকাতে হচ্ছে বা আগামীতে হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংস্থা। কাগজে-কলমে এতে সরকারের প্রভাব বা হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। কিন্তু সবাই জানে, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ডে রাজনীতি বা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ব্যাপক। নানা মারপ্যাঁচে সরকার-সমর্থিত ব্যক্তিরা এসব বোর্ডের প্রধান নির্বাচিত হন, আবার ঠিক তেমনি সরকারের চাওয়া ও ইচ্ছা মেনেই চলতে হয় বোর্ডগুলোকে।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ড থেকে নির্দেশিত হয়ে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ কোটি কোটি বাংলাদেশিকে আহত করেছে। অনেক ভারতীয়ও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর ত্বরিৎ গতিতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এমনকি তিনি বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের কথা বলেন, যা পরে সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কার্যকর করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই ঘোষণায় আসিফ নজরুল জানিয়ে দেন, বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি... গোলামির দিন শেষ।
আসিফ নজরুলের ওই ফেইসবুক পোস্টের পরপরই বিসিবি ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না। শুরুতেই সরাসরি ঘোষণা। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে কলকাতা নাইট রাইডার্স বা বিসিসিআই কোনো কারণ উল্লেখ করেনি। যদিও ক্রীড়া উপদেষ্টা ও বিসিবি নিরাপত্তাকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হ্যাঁ, বর্তমান বাস্তবতায় নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রশ্ন তোলার বা সহযোগিতা কামনা করার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু এর জন্য সরাসরি বিশ্বকাপ বয়কট! এটা বাড়াবাড়ি। অনেকটা অবিবেচক, আনাড়ি সিদ্ধান্ত। জনতুষ্টিবাদের চূড়ান্ত চর্চা।
শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বড় সহযোগী ছিল আমাদের বৃহত্তর প্রতিবেশী ভারত। এছাড়া পরপর দুটি খুব খারাপ জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সহযোগী ছিল দেশটি। আবার পাঁচ অগাস্টের পালাবদলের পর ভারতই শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে ভারতের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের রাগ-ক্ষোভ অনেকটাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু তাই বলে ভারতকে শত্রুরাষ্ট্র সাব্যস্ত করে আবেগী সিদ্ধান্ত কাম্য নয়। যদিও দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, শেষ সময়ে এসে অন্তর্বর্তী সরকার খুব সম্ভবত এমনই জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্তে অটল থাকছে যাতে বাংলাদেশের ক্রিকেট একটি বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের একজন নামজাদা ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদ। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘নট আউট নোমান’ শিরোনামে অনেক বিশ্লেষণমূলক সংবাদ তৈরি করেন। অতি সম্প্রতি তিনি একটি পর্বে বলেছেন, এই সরকার হয়তো বেশিদিন থাকবে না, বর্তমান বোর্ড হয়তো বেশিদিন থাকবে না, কিন্তু এই সরকার ও বোর্ড বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মূল্য বাংলাদেশ ক্রিকেটকে বহু দিন দিতে হবে।
একটা ভিন্ন তথ্য দিয়ে আলোচনাটা শেষ করা যাক। ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বলা হয়েছিল, সরকার ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করবে। তার ফলাফল কী?
বাংলাদেশের পণ্য আমদানির প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ভারত থেকেই গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে এবং তা ৭.৮৩ শতাংশ। টাকার হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের পণ্য। (বণিক বার্তা, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬)
বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে দাদাগিরি করে এটা সত্য। ভারতের অনেক নীতি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী সেটাও সত্য। কিন্তু ভারতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ও প্রায় শত্রুরাষ্ট্র জ্ঞান করে ক্রিকেটকেন্দ্রিক জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্ত—বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কট একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা হিসেবে আসিফ নজরুল হয়তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। সেসবের জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ বয়কট নিয়ে তিনি ও অন্তর্বর্তী সরকার যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার প্রভাব মারাত্মক। এর মূল্য অনেক দাম দিয়ে চুকাতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে।