Published : 21 Feb 2026, 04:46 PM
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে ‘জয়ধ্বনি’ বের হবে। ‘জয়ধ্বনি’ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একুশের প্রকাশনা। অর্থাৎ প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের একুশ তারিখ প্রকাশনাটি বের হয়। একুশের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের সম্পর্ক নিবিড়। ছাত্র ইউনিয়ন একুশেরই সন্তান। একুশকে ধারণ করার এবং একুশের তাৎপর্য বিনির্মাণ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই সংগঠনটির জন্ম।
‘জয়ধ্বনি’তে লেখা দিতে হবে— একুশ নিয়ে। এজন্য ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে লেখা কয়েকটি বই উল্টানো-পাল্টানো শুরু করলাম। সবশেষে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ বইটি পেলাম। এটি একুশের প্রথম সংকলন। সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান, প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান, পুথিপত্র প্রকাশনী।
পুথিপত্র ছিল মার্কসবাদী বইয়ের দোকান। মোহাম্মদ সুলতান ও এম আর আখতার মুকুল মিলে শুরু করেছিলেন প্রকাশনাটি, যার কার্যালয় ছিল বকশীবাজারে। এতে পরামর্শদাতা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। এম আর আখতার মুকুল অবশ্য বেশিদিন যুক্ত ছিলেন না প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে।
একুশের প্রথম সংকলনে যাদের লেখা ছাপা হয়েছিল, তারা হলেন আলী আশরাফ, শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম, আতোয়ার রহমান, মুর্তজা বশীর, সালেহ আহমদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন, কবিরউদ্দিন আহমদ।
সংকলনটির প্রিন্টার্স লাইনে লেখা ছিল, পুথিপত্র প্রকাশনীর পক্ষ থেকে মোহাম্মদ সুলতান এটি প্রকাশ করেছেন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন আমিনুল ইসলাম। রেখাঙ্কন করেছেন মুর্তজা বশীর ও অন্যান্য। পাইওনিয়ার প্রেসের পক্ষে এম এ মুকিত ছেপেছেন। ব্লক তৈরি করেছে এইচম্যান কোম্পানী, বাদামতলী, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ মার্চ ১৯৫৩। দাম দুই টাকা আট আনা।
বইটির উৎসর্গপত্রে রয়েছে, “যে অমর দেশবাসীর মধ্যে থেকে জন্ম নিয়েছেন একুশের শহীদেরা, যে অমর দেশবাসীর মধ্যে অটুট হয়ে রয়েছে একুশের প্রতিজ্ঞা—তাদের উদ্দেশ্যে।” সেটা ছিল আনিসুজ্জামানের হাতের লেখা। পুথিপত্রের লোগোটি তৈরি করেছিলেন মুর্তজা বশীর। বইটি ছিল ক্রাউন সাইজে। পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৮৩।
প্রিন্টার্স লাইনে রেখাঙ্কনের স্থানে মুর্তজা বশীরের সঙ্গে যে ‘অন্যান্য’ ব্যবহার করা হয়েছে, সেই অন্যান্য হচ্ছেন বিজন চৌধুরী। একুশে ফেব্রুয়ারির ওই সংকলনে মুর্তজা বশীরের সঙ্গে স্কেচ করেছিলেন শিল্পী বিজন চৌধুরী। এ ব্যাপারে মুর্তজা বশীর জানিয়েছেন, প্রথম যে লিনোকাটটি তিনি এঁকেছেন, সেটি একুশের স্মৃতি দগ্দগে থাকার সময়টিতেই। অন্যগুলো করা হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির সংকলনের জন্য পরে। বিজন চৌধুরীর নাম দেওয়া সম্ভব হয়নি সম্ভবত এ কারণে যে তখন কমিউনিস্ট, অমুসলমান ইত্যাদি বিষয়গুলো ছিল খুবই স্পর্শকাতর।
একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। মোহাম্মদ সুলতানের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক লিখছেন, “ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে একুশের চেতনাধৃত কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি নিয়ে মুর্তজা বশীরের স্কেচশোভিত এ সংকলন নানা দিক বিচারে ঐতিহাসিক মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। আর এ সংকলনের প্রতিবাদী চরিত্রের কারণে, সম্ভবত প্রকাশক হিসাবে যুবলীগ নেতার সংশ্লিষ্টতার কারণে, সর্বোপরি এর পাঠকপ্রিয়তার কারণে যথারীতি প্রকাশকের আস্তানায় পুলিশের তল্লাশি এবং শেষ পর্যন্ত সংকলনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।”
‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ বইটি পড়লাম। পড়ে এই বইটি নিয়ে কমরেড আসলাম উদ্দিন ও শামসুল আলম সজ্জনের সঙ্গে আলোচনা করলাম। তারা বইটি সম্পর্কে বললেন, এটিই একুশের প্রথম সংকলন। আরো অনেকের সঙ্গে বইটি নিয়ে কথা হয়েছিল তখন। কেউ একজন আমাকে বলেছিল একুশের প্রথম সংকলনের প্রথম প্রবন্ধটি লিখেছেন খুব সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলার নেতা কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তী, আলী আশরাফ তার ছদ্মনামে। ওই সময় পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় অধিকাংশ কমিউনিস্ট নেতা ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন।
যাই হোক একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে দুই পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত এই বই থেকে নিয়েছিলাম। লেখাটির সুবাদে বেশ ভালো করেই বইটি পড়া হয়েছিল।
২০১৪-১৫-১৬ সালের বইমেলায় বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনাতে একুশ নিয়ে কোনো বই না থাকায় পাঠকদের কাছে থেকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। কথার যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য ভাষা-আন্দোলন নিয়ে ২০১৭ সালের বইমেলায় বই প্রকাশ করার উদ্যোগ নিই। কিন্তু ভাষা-আন্দোলন নিয়ে তো অনেক কাজ ইতোমধ্যে হয়েছে। নতুন করে আর কী কাজ! আর যে কাজ হয়নি সে কাজ যারা ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন—কেবল তারাই সম্পূর্ণ করতে পারেন। ভাষা-আন্দোলনের বাদ পড়া ইতিহাস নিয়ে আহমদ রফিক লিখিত ‘ভাষা-আন্দোলনে ইতিহাস বিকৃতি: তমদ্দুন মজলিস ও কমিউনিস্ট পার্টি’— এই বইটি প্রকাশ করছে বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা।
‘সকল ভাষার সমান মর্যাদা’ একুশের প্রথম সংকলনের প্রথম প্রবন্ধ, যার লেখক আলী আশরাফ— এটি ছদ্মনাম। কিন্তু ভাবনার বিষয় এই আলী আশরাফ কে? তাই পূর্বে শোনা ‘খুব সম্ভবত’ বিষয়টি, প্রবন্ধটি লিখেছেন জ্ঞান চক্রবর্তী, নিয়ে খোঁজা শুরু হলো। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে লেখা বইগুলোতে কোথাও খোঁজ মিলল না। সাপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকার পুরানো সংখ্যাতেও পেলাম না কোনো তথ্য। ফোনে কথা বললাম মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে (নভেম্বর ২০১৬)। তিনিও বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেন না।
তারপর কামাল লোহানী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, অজয় রায়, এম এম আকাশ, মোজাম্মেল হোসেন, অজয় দাশগুপ্ত, নূর মোহাম্মদ, রাজেকুজ্জামান রতন, আনিসুর রহমান মল্লিক, রাশেদ খান মেনন, শেখর দত্ত, নূহ-উল আলম লেলিন, সফিউদ্দিন আহমেদ, তাইবুল ইসলামসহ আরো অনেকের সঙ্গে কথা বললাম—কিন্তু কেউই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারলেন না।
অবশেষে কথা বললাম ‘প্রথম আলো’র সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে। তিনি বললেন “এই প্রবন্ধটি কমরেড খোকা রায়ের লেখা। একবার ভাষা-আন্দোলনের প্রথম সংকলন নিয়ে কথা প্রসঙ্গে কমরেড খোকা রায় বলেছিলেন যে, পার্টি নিষিদ্ধ থাকার কারণে তিনি আলী আশরাফ নামে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। এ নামটি ওই সময়ে তার ছদ্মনাম ছিল। তারপরও তুমি এই বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আনিসুজ্জামান ও আহমদ রফিকের সঙ্গে কথা বলে নিও।”
এরপর কমরেড মনজুরুল আহসান খান ও আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতনের সঙ্গে কথা হয়। তারা দুজনই লেখাটি খোকা রায়ের বলে জানান। তাদের কাছে এই লেখাটির নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র কোথা পেতে পারি জানতে চাওয়া হলে—মনজুরুল আহসান খান বললেন তিনি নিজে কমরেড খোকা রায়ের কাছ থেকে শুনেছেন।
তবু মতিউর রহমানের কথা অনুসারে ভাষাসংগ্রামী আনিসুজ্জামান ও ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সঙ্গে কথা বলি। তারা দুজনই একবাক্যে বলেন—‘সকল ভাষার সমান মর্যাদা’ একুশের প্রথম সংকলনের প্রথম প্রবন্ধটি কমরেড খোকা রায় লিখেছেন—আলী আশরাফ তার ছদ্মনাম। আনিসুজ্জামান আরও জানান এ বিষয়টি তিনি তার একটি প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম একুশের লেখা ও স্মৃতিচারণ নিয়ে বই প্রকাশ করার। তার ধারাবাহিকতায় ‘২১ (প্রথম খণ্ড)’ বইটি বিপ্লবীদের কথা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়।
আমার কাছে ‘আলী আশরাফ’ নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কমরেড খোকা রায়ের পরিচয় উদ্ঘাটনের অনুসন্ধান শুধু একটি নাম খুঁজে পাওয়ার গল্প নয়; ভাষা-আন্দোলনে কমিউনিস্টদের নেপথ্য ভূমিকার দলিল খুঁজে পাওয়াও।
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক লিখিত ‘ভাষা-আন্দোলনে ইতিহাস বিকৃতি: তমদ্দুন মজলিস ও কমিউনিস্ট পার্টি’ বই তিনি লিখেছেন, “বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলা চলে যে এ আন্দোলনে নেপথ্যবাসী কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে যতটা সম্ভব ততটা ভূমিকা তারা রেখেছে কিছুটা প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রধানত পরোক্ষভাবে। বিশেষ বিচারে দেখা যাবে যে এ আন্দোলনের ছাত্র-যুব নেতৃত্বের একটি বড়সড় অংশ হয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত বা আদর্শিকভাবে তাদের সহযাত্রী। সাধারণভাবে কমিউনিজম বিরূপতার কারণে মহল বিশেষ আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা নাকচ বা অবমূল্যায়নের চেষ্টা করেছে অথবা যুক্তিতথ্যহীন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।”
আহমদ রফিক আরো লিখেছেন, “আরো একটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য যে একুশে ফেব্রুয়ারি বিকেলে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদেশিক কমিটির সদস্য শহীদুল্লা কায়সার মেডিকেল ব্যারাক প্রাঙ্গণে ছাত্রজমায়েতের পরবর্তী করণীয় বিষয় সম্পর্কে বক্তৃতা করছেন এবং পরবর্তী দু’তিন দিন হোস্টেলে থেকে সক্রিয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন, ছাত্রকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন। অবশ্য আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে মিছিলে যোগ দেওয়া যে তার পক্ষে সম্ভব ছিল না সে কথা বলাই বাহুল্য। কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপনে থাকা দু’একজন জ্যেষ্ঠ নেতাও সন্ধ্যার পর হোস্টেলে এসে ছাত্র-যুব নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। যেমন জ্ঞান চক্রবর্তী, সুনীল ঘোষ, খোকা রায় প্রমুখ।”
খোকা রায় ১৯০৭ সালের মার্চে ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন এবং পরে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তরের আন্ডারগ্রাউন্ড শাখায় কাজ করেন। তিনি আনন্দমোহন কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৩৩ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পান; এক পর্যায়ে তাকে আন্দামান সেলুলার জেলে পাঠানো হয়, যেখানে মার্কস-লেনিনের ভাবধারায় প্রভাবিত হন তিনি।
১৯৩৮ সালে মুক্তি পেয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সম্পাদক হন এবং দীর্ঘদিন গোপনে পার্টির কাজ পরিচালনা করেন। ১৯৪৩ সালে প্রাদেশিক নেতা নির্বাচিত হন এবং দেশভাগের পর ঢাকায় থেকে সংগঠন পরিচালনা অব্যাহত রাখেন। তিনি ‘সংগ্রামের তিন দশক’ গ্রন্থের রচয়িতা। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পর ১৯৯২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় তার মৃত্যু হয়।