Published : 24 Jul 2026, 06:18 PM
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ক্ষোভের মুখে লেখা হয়েছিল মাত্র ছয়টি শব্দ, “সব কাকরোচ যদি এক হয়ে যায়, তবে কী হবে?”
মাত্র ৩০ বছর বয়সী রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকের লেখা এই পোস্টটিই এখন ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতে গড়ে ওঠা সবচেয়ে বড় রাজপথ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
১৬ মে দেওয়া ওই পোস্টটি মূলত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের এক মন্তব্যের জবাবে লেখা একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া ছিল, যেখানে বিচারপতি দেশের বেকার যুবকদের 'কাকরোচ' বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
যদিও পরবর্তীতে বিচারক জানান, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে ততক্ষণে দিপকের পোস্টটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায়।
দ্রুতই আত্মপ্রকাশ করে ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম, যা উচ্চ বেকারত্ব ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ কোটি কোটি ভারতীয় তরুণের প্রধান প্রতিবাদী মঞ্চে পরিণত হয়।
গত তিনদিন ধরে রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ সমবেত হয়ে আন্দোলন চালাচ্ছেন।
মে মাসে অনুষ্ঠিত মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট)-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে এবং দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এই বিক্ষোভ চলছে।
এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লি ছাড়াও দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই পুরো আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন অভিজিৎ দিপকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরে মাস্টার্স কোর্সে অধ্যয়নরত দিপকে আন্দোলন গড়ে তুলতে গত ৬ জুন ভারতে ফিরে আসেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরুর পর, বিশেষ করে গত সোমবার বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি দমনাভিযানের পর থেকে, তিনি এই আন্দোলনের অবিসংবাদিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
দাড়ি ও টি-শার্ট-জিন্স পরিহিত দিপকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শত শত তরুণকে শান্ত থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর বেশ কয়েকজন সংগঠক থাকলেও দিপকই এখন সবচেয়ে পরিচিত মুখ।
আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছেন, তেমনি আক্রমণের শিকারও হয়েছেন।
গত সপ্তাহে মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার সময় এক নারী তার মুখে নীল কালি ছিটিয়ে দেন এবং অভিযোগ করেন যে সিজেপি শ্রীরামকে অবমাননা করেছে।
অভিজিৎ দিপকে মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহরের এক সাধারণ দলিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থান তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
দিপকে জানান, তার বাবা অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন এবং তার ঠাকুরদা ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক।
গত ৬ জুন যখন তিনি দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছান, তখন তার হাতে ছিল ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধানের রচয়িতা ও দলিত অধিকার আন্দোলনের পথিকৃৎ বি আর আম্বেদকরের লেখা “মাই অটোবায়োগ্রাফি” বইটি।
মুখে নীল কালি ছেটানোর পরও দিপকে দমে যাননি, উল্টো আম্বেদকরবাদী আন্দোলনের প্রতীকী রঙের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “নীলই আমার রঙ।”
এর আগে ২০২০ সালে আম আদমি পার্টির (আপ) সোশ্যাল মিডিয়া টিমে কাজ করার সময় মিম, হাস্যরস ও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে রাজনৈতিক বার্তা তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেন দিপকে।
বর্তমানে আম আদমি পার্টি (আপ)-সহ একাধিক বিরোধী দল এই আন্দোলনকে সমর্থন জানালেও, দিপকে এখন কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। ২০২৩ সালে তিনি জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করতে বোস্টন চলে যান।
সামাজিক মাধ্যমে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল দিল্লিভিত্তিক ইউটিউবার মেঘনাদ এস-এর।
দিপকের পোস্ট দেখার পর তিনি ও তার এক বন্ধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’-র একটি ব্যঙ্গাত্মক ওয়েবসাইট তৈরি করেন।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা ২২ মিলিয়নে পৌঁছায়, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ মিলিয়নে।
হুমকি ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভারতে ফিরে আসা দিপকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তিনি রাজপথ ছাড়বেন না।
বুধবার মঞ্চ থেকে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমরা জয়ী না হওয়া পর্যন্ত থামব না।”