Published : 17 Mar 2026, 05:22 PM
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ কেবল আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এ যুদ্ধ এখন বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের চিরাচরিত সমীকরণ—যেখানে কেবল সরাসরি অংশগ্রহণকারীরাই জয়-পরাজয়ের হিসাব কষে—তা এখন অতীত। আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরোক্ষ লাভ-ক্ষতির জটিল অঙ্ক। বিস্ময়কর হলেও সত্য, রণক্ষেত্রে সরাসরি না থেকেও অনেক পক্ষ যেমন মুনাফা লুটছে, তেমনি যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে থেকেও অনেক রাষ্ট্র অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হচ্ছে এবং এটা ঘটছে বিশ্বজুড়ে।
এই সংঘাতের ভয়াবহতা বোঝা যায় যখন দেখি, ইরান কেবল তার মূল প্রতিপক্ষের ওপর পাল্টা আঘাত হেনে ক্ষ্যান্ত হয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত মানচিত্রজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, বাহরাইন, জর্ডান, সিরিয়া, কুয়েত, আজারবাইজান, সাইপ্রাস, ওমান ও তুরস্কের মতো ১০টি দেশ অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই যুদ্ধের বৃত্তে ঢুকে পড়েছে। এটি এখন আর কোনো দ্বিপাক্ষিক লড়াই নয়, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এক বিপজ্জনক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে রুশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ৩০ দিনের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ৩০টি স্থানে সমুদ্রে রাশিয়ার প্রায় ১২ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের সরবরাহ ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে প্রায় ৫-৬ দিনের তেলের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে। এই ঘোষণার পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও রাশিয়ার মুনাফার তুলনায় তা নগণ্য। কারণ দুই সপ্তাহ আগে ব্যারেল প্রতি তাদের তেলের ভিত্তিমূল্য ছিল ৫৯ ডলার, এখন তা প্রায় ১০০ ডলার বা তারও বেশি হয়েছে।
সুতরাং ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, হরমুজ প্রণালি যতদিন বন্ধ থাকবে রাশিয়ার অবস্থান ততই সুবিধাজনক হবে এবং অর্থনৈতিকভাবে তারা লাভবান হবে। ইউক্রেইন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তি তাদের ৩৪০ বিলিয়ন ডলার আটকে রেখেছে। যুদ্ধে তাদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, চার বছরে তাদের ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ থেকে ৬০০ বিলিয়ন ডলার। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে হাজির হয়েছে। যদি এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এটি রাশিয়ার অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
ইরানও যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিতে তাৎক্ষণিকভাবে ৬৭২ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় করেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে তেল-গ্যাস বাণিজ্যে রাশিয়া একচেটিয়া বাজার পাবে। শুধু তাই নয়, অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও প্রযুক্তি বিক্রিতেও তারা মুনাফা করবে এবং তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়বে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তা বলেছেন, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে রাশিয়া ইউক্রেইন যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য নতুন সম্পদ পাবে। একইসঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইউক্রেইনের প্রতি সামরিক মনোযোগ কমে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বাড়বে, ফলে ইউক্রেইন যুদ্ধে রাশিয়া কৌশলগত সুবিধা পাবে। লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলেছেন, ইরান সংঘাত যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয় তবে প্রভাব কম হবে। কিন্তু মাসের পর মাস চলতে থাকলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধরনের অর্থপ্রবাহ ঘটবে।
নিষেধাজ্ঞা-ছাড় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ালেও এটি পশ্চিমা দেশগুলোর রাশিয়াবিরোধী প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেইন যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য রাশিয়ার আয়ের উৎস কমানো। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মধ্যে মতবিরোধও বাড়াতে পারে। কারণ ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন গত বুধবার জি-৭ নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপের পর বলেছেন, এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সময় নয়।
সামরিক কৌশলবিদ কার্ল ফন ক্লজভিৎস তার বিখ্যাত ‘অন ওয়ার’ বইয়ে বলেছেন, যুদ্ধ মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের আরেকটি উপায়। ফলে কোনো পক্ষ জয়ী হলে তার রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণ হয়, আর পরাজিত পক্ষকে মূল্য দিতে হয়। ইরান এ যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে কৌশলগতভাবে বিপদে ফেলতে ও দুর্বল করতে তার নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করেছে; যে প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন হয়। এর ফলে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে এবং পরাশক্তিকে ব্যাপক চাপে রাখতে পারবে।
তেলের দাম বৃদ্ধিতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ের মতো দেশ বেশ লাভবান হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে এসব দেশ উচ্চ দামে তেল বিক্রি করতে পারবে, ফলে তাদের রপ্তানি আয় বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল শিল্পও লাভবান হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে বাজারে প্রভাব বাড়াতে পারবে।
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল-গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি হয়েছে, যা ইউরোপের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম ১০ দিনেই ইউরোপকে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরো এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ইউরো অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইউরোপে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে, কারণ ইউরোপের অধিকাংশ দেশ তেল-গ্যাস আমদানিকারক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির এই ধাক্কা ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা দুর্বল করতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ইতালি, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড প্রমুখ।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এসব দেশের জ্বালানি আমদানিতে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ফলে শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় মার্কিন ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হোয়াইট হাউজ উদ্বিগ্ন। কারণ এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে ভোটার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে ট্রাম্পের কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ও রয়েছে। তাই শত্রুরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর থেকে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা তুলে ডনাল্ড ট্রাম্প বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছেন।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম তার ‘দ্য এজ অব এক্সট্রিমস’ বইয়ে লিখেছেন, বিংশ শতাব্দীর বড় যুদ্ধগুলো অনেক সময় শিল্প-পুঁজিবাদী শক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। তার মতে, যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়; এটি অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসও ঘটায়—কিছু রাষ্ট্র ও শিল্পখাত লাভবান হয়, আবার অনেক দেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে। এর তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের পরপরই সামরিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার লাফিয়ে বেড়েছে।
লন্ডনভিত্তিক সামরিক উৎপাদন ও সরবরাহকারী ‘বে সিস্টেমস’-এর শেয়ার যুদ্ধের প্রথম দিনেই ৬ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প কিছু অস্ত্রের উৎপাদন চারগুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটে লকহিড মার্টিন, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং আরটিএক্স করপোরেশনের শেয়ার প্রথম দিনে ৪ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মাত্র একদিনে এই তিন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের সম্মিলিত লাভ হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল মেলমান তার ‘দ্য পার্মানেন্ট ওয়ার ইকোনমি’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রে একটি ‘স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে। তার মতে, যুদ্ধ বা যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলে অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি, সামরিক শিল্প ও প্রতিরক্ষা ঠিকাদাররা বিপুল লাভ করে। ফলে অনেক সময় এই শিল্পগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মধ্যেই অর্থনৈতিক সুবিধা দেখে। যুক্তরাষ্ট্র-প্ররোচিত এ যুদ্ধ সামরিক শিল্পে পুষ্টি জোগাবে না স্থিতিশীলতা আনবে, তা সময়ই বলে দেবে।