Published : 21 Aug 2025, 06:01 PM
কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি বাক্য—‘কোচিং না করলে মিস আদর করে না’, যা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এক গভীর সমস্যার মুখোশ উন্মোচন করেছে। এই অভিযোগ উঠেছে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে, যেখানে অভিভাবকরা দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের জোর করে কোচিংয়ে পড়তে বাধ্য করে এবং যারা কোচিং করে না, তাদের প্রতি শিক্ষকরা বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। যদিও মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, এই প্রবণতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লুকিয়ে থাকা একটি সাধারণ ও গুরুতর সমস্যা।
দুই দশক ধরে শিশু শিক্ষা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই অভিযোগগুলো কোনো কল্পকথা নয়। দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, অনেক শিক্ষক ক্লাসে পূর্ণাঙ্গ পাঠদান না করে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের পথ বেছে নিয়েছেন। এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করছে। অনেক শিক্ষক সচেতনভাবে ক্লাসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ান না, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে টিউশন করতে বাধ্য হয়। যারা প্রাইভেট পড়ে, তাদের ক্লাসে সহজ প্রশ্ন করে প্রশংসা করা হয় আর যারা পড়ে না, তাদের জটিল প্রশ্ন করে বিব্রত করা হয়। এই বৈষম্যমূলক আচরণ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আঘাত করে, তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে এবং শিক্ষকের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয়।
এই সমস্যা এতটাই গভীর যে, কোচিং বাণিজ্য বন্ধের জন্য সরকার ২০১২ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ প্রণয়ন করেছিল। এই নীতিমালায় স্পষ্ট বলা হয়েছিল, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না; শুধু প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন এবং তাদের তালিকা প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে জমা দিতে হবে। নীতিমালার লক্ষ্য ছিল শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষকের পেশাগত নৈতিকতা রক্ষা করা। কিন্তু এই নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের তদারকি দুর্বল ছিল, ফলে এটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
২০১৯ সালে এই নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় এবং ২০২২ সালে নতুন শিক্ষা আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। নতুন খসড়ায় বলা হয়েছে, কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করা বা পরিচালনা করা অপরাধ নয়, তবে শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং বা প্রাইভেটে পড়াতে পারবেন না। এছাড়া, অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হলে তা সরকার নির্ধারিত ফি এবং অভিভাবকের সম্মতিতে করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এই নির্দেশনা কোথাও মানা হয় না। বরং শিক্ষকরা ক্রমশ প্রাইভেট ও কোচিংয়ের দিকে আরও বেশি ঝুঁকছেন।
এই প্রবণতার কারণে শিশুরা বহুমুখী ক্ষতির শিকার হচ্ছে। প্রথমত, শারীরিক ও মানসিক চাপ; সকালে স্কুল, তারপর কোচিং—এভাবে সারাদিন ব্যস্ত থাকায় শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। খেলাধুলা, বিশ্রাম বা সৃজনশীল কার্যক্রমের সুযোগ কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিশুদের শারীরিক বিকাশে বাধা দেয় এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যা হতাশা, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাস হ্রাসের দিকে নিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, সৃজনশীলতা হ্রাস; অতিরিক্ত কোচিংয়ের কারণে শিশুরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শেখার সুযোগ পায় না, যা তাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে দমিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, বৈষম্য; যেসব অভিভাবক অর্থনৈতিক কারণে কোচিংয়ে সন্তান পাঠাতে পারেন না, তাদের সন্তানরা ক্লাসে উপেক্ষিত হয় এবং শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে ধনী-গরিব বিভাজন আরও তীব্র হয়।
শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কোচিং সেন্টার শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে বাণিজ্যিক লক্ষ্যে রূপান্তরিত করছে। অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ের নিয়মিত ক্লাসকে অবহেলা করে কোচিং সেন্টারে বেশি সময় দেন, কারণ এটি তাদের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। এর ফলে স্কুলের পাঠদান দুর্বল হয় এবং শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
অভিভাবকরাও এই সমস্যার একটি অংশ। কিছু অভিভাবক সন্তানের ভালো ফলাফলের আশায় নিজেরাই কোচিংয়ে পাঠাতে উৎসাহী হন, আবার অনেকে শিক্ষকের চাপ বা সামাজিক প্রত্যাশার কারণে বাধ্য হন। এর ফলে কোচিং ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয়। তবে অনেক শিক্ষিত ও স্বচ্ছল অভিভাবক সন্তানকে বাড়িতে পড়াতে চান, কিন্তু শিক্ষকের অবহেলার কারণে তারা সন্তানের ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোচিং সেন্টার থাকতে পারে, তবে তা শুধু বহিরাগত শিক্ষার্থীদের জন্য। নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। এই আইন প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া, সরকারি পর্যায়ে শক্তিশালী মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে, যারা অকস্মাৎ পরিদর্শন করে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহ ও শাস্তি নিশ্চিত করবে।
এছাড়া, শিক্ষকদের নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের আয়ের কাঠামো এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে তারা বিদ্যালয়ের ক্লাসেই শিক্ষার্থীদের উচ্চমানের শিক্ষা দিতে উৎসাহিত হন এবং কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অভিভাবক ও সমাজকে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে কোচিংয়ে পড়ানো ভালো ফলাফলের একমাত্র পথ নয়—এই বোধ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিশ্রামের সুযোগ সমানভাবে প্রয়োজনীয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোচিং ও প্রাইভেট বাণিজ্য নির্মূল করা শুধু শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য নয়, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও অপরিহার্য। আজ যদি আমরা এই সংস্কার না করি, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ের বোঝা বহন করতে করতে সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা হারাবে। শিক্ষা ব্যবসায় পরিণত হবে, শিক্ষক ব্যবসায়ী হয়ে উঠবেন, আর শিক্ষার্থী হবে একটি অবিরাম প্রতিযোগিতার যন্ত্র—যেখানে মানবিকতা, আনন্দ ও প্রকৃত শিক্ষার কোনো স্থান থাকবে না।
তাই এখনই সময় কঠোর আইন, সুষ্ঠু প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে কোচিং বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরার। শিশুদের জন্য, শিক্ষার জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য।