Published : 09 Feb 2026, 08:00 PM
অনিশ্চয়তার দোলাচল পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ভোটের মাঠে গড়িয়েছে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত বিএনপি ও জামায়াত জোট সমর্থিত প্রার্থীরা। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই নেতাকর্মীদের মধ্যে ভোটের উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেলেও ভোটারদের মাঝে তেমন প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গ্রামে খানিকটা আমেজ তৈরি হলেও তা গ্রামীণ গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনৈতিক চাপসৃষ্ট বলেই অনুমেয়। কেননা, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় এখনও জ্ঞাতি সম্পর্কের ভিত্তিতে ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। একটি গ্রামের মানুষ তার জ্ঞাতি–গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত একজন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।একই সঙ্গে পুরো একটি গ্রামকে ওই গ্রামের প্রভাবশালী পরিবার ভোটদানে প্রভাবক হিসেবে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এসব কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ভোট নিয়ে বেশ চাপেই থাকে। ফলে ভোটদানে বিরত থাকা তাদের জন্য বেশ কঠিন। সে তুলনায় শহরবাসীর মাঝে ভোট নিয়ে আগ্রহ কিংবা চাপ সেভাবে লক্ষ্যণীয় নয়। ফলে গ্রামীণ ভোটারদের চাইতে অনেকটা স্বাধীনভাবেই নির্বাচনি সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা। এ বিবেচনায় শহরের তুলনায় গ্রামের ভোট কেন্দ্রগুলোতে সংগৃহীত ভোটের হার বেশি হতে পারে।
ভোট নিয়ে লোকমনে এখনও সন্দেহ-সংশয় থাকলেও সরকার ও প্রশাসনের নির্বাচনি প্রস্তুতি জোরেশোরেই চলছে।এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকা তো বটেই, দুর্গম পাহাড়েও ভোটের সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হয়ে গেছে। একই সঙ্গে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা দমনে সামরিক ও বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। নির্বাচন ব্যাহত করতে পারে এমন অভিযোগে কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ থাকা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থক এমনকি তাদের অতি উৎসাহী ভোটারদেরকেও গ্রেপ্তার করছে যৌথবাহিনী। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারেও অভিযান চালানো হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে গ্রাম ও শহরে পুলিশের টহলও বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিমান বাহিনীকেও ভোটের মাঠের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নিয়োজিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ থেকেই বোঝা যায় একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে ব্যতিব্যস্ত মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন।
দেশের উত্তরাঞ্চলে দেখতে পাচ্ছি, একদিকে গ্রেপ্তার অন্যদিকে ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির টানাটানিতে বিপর্যস্ত আওয়ামীপন্থিরা। অধিকাংশ নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকার বাইরে থাকলেও তাদেরকে ভোটের মাঠে টানার চেষ্টা করছে দলগুলো। পরিবারগুলোতে চাপ তৈরি করার অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী সমর্থকদের ভোট কার ভাগে পড়বে এ নিয়েও নানা সমীকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠী সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমানে উভয় সংকটে। ভোটদানে বিরত থাকার দলীয় নির্দেশনা, অন্যদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর চাপ এবং সরকারের গ্রেপ্তার অভিযান তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। যারা চাপ কাটিয়ে উঠতে পারছেন না, তাদের অনেককেই নানা জায়গায় বিএনপি কিংবা জামায়াতজোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে জাতীয় পার্টির প্রভাব কিছুটা বেশি থাকায় আওয়ামী লীগের কেউ কেউ সরাসরি তাদের হয়ে নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্ত।
চাপমুক্ত থাকার প্রত্যাশায় আওয়ামীপন্থিদের যারা ভোটের মাঠে সরব, তারা ঠিক কতটুকু চিন্তামুক্ত ও নিরাপদ, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা রয়েছে। দল থেকে বহিষ্কার এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক দলাদলিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয়ের সংঘর্ষে টার্গেটে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিএনপির পক্ষে ভোট চাওয়ায় আওয়ামীলাগারদের গ্রেপ্তার দাবিতে জামায়াতকে থানায় বিক্ষোভ করতে দেখা গিয়েছে। আবার জামায়াত বা তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ায় বিএনপির আক্রোশের শিকার হচ্ছে তারা। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি সঙ্গী হওয়ায় জাতীয় পার্টি বিশেষভাবে আক্রান্ত। এই নির্বাচনে আওয়ামী সমর্থকদের কিছুসংখ্যক নেতাকর্মী তাদের হয়ে মাঠে নেমেছে, যা নিয়ে ‘ফ্যাসিবাদের আশ্রয়দাতা’র প্রধান তকমাও জুটেছে।
অন্যদিকে নির্বাচনের দিন ও নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার দায় আওয়ামী লীগের ওপর বর্তাবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং ভোটের মাঠে থাকা আওয়ামীঅংশই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা। কেননা, নির্বাচন পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহে যেসব বিশৃঙ্খলা ও সহিংস ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার অনেকগুলোতে বিএনপি ও জামায়াত জোট উভয়েই আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। সব মিলিয়ে আওয়ামীপন্থিদের জন্য এই নির্বাচনি সময় পার করা কঠিন বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সংঘাত ও গ্রেপ্তার এড়াতে আওয়ামী লীগ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা না দিয়ে বর্জন ও ভোট প্রদানে বিরত থাকার আহ্বান করেছে।নিজ দলের ক্ষেত্রে এই আহ্বান কতটুকু কার্যকর হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই সাধারণ ভোটারদের বর্জনের আহ্বান কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতভেদ রয়েছে। কেউ বলছেন, আওয়ামীপন্থিরা ভোট দিতে যাবে না এবং কারো কারো মতে আওয়ামী লীগের একটা অংশ ভোট প্রদান করবে। তবে সাধারণ ভোটারদের হার বেশি হবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ সবারই। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা সংঘাত ও সংঘর্ষের আশঙ্কাকে দায়ী করছেন। শান্তিপূর্ণ উপায় হিসেবে আওয়ামী লীগের ভোট বর্জন বা ভোট প্রদান না করার কর্মসূচি স্বস্তিদায়ক হলেও প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জন্য সুখকর নয়, তা উপরোক্ত আলোচনা থেকে উপলব্ধি করা যায়।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিততে প্রধান দুই দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া বিএনপি ও জামায়াত বর্তমানে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। পূর্বের এই দুই জোটসঙ্গীর সম্পর্ক এখন সাপে-নেউলের মতো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের সময় যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের পক্ষে অবস্থান নিলেও, বিএনপি এখন ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতকে ঘায়েল করতে মুক্তিযুদ্ধকেই ইস্যু করছে। যাকে কেন্দ্র করে তির্যক বাক্যবান বিনিময়ের চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়তই জামায়াত ও বিএনপির সংঘর্ষের খবরে সরগরম সংবাদমাধ্যম। ইতোমধ্যে বগুড়া, পাবনা, যশোরসহ দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিএনপি কর্তৃক জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখম, হত্যা ও জামায়াত নেতাদের বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। জামায়াত কর্তৃক বিএনপির নেতাদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও। আধিপত্য বিস্তারে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার কিছু এলাকায় বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণেও সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জামায়াত, এনসিপি ও বিএনপির সংঘর্ষও হয়েছে ইতোপূর্বে। সার্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সংঘর্ষ ও সংঘাত ভোটের মাঠে আর বাড়বে না, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
নির্বাচনের দিন যতই সন্নিকটে আসছে, উৎকণ্ঠা উদ্বেগ ততই বাড়ছে। নির্বাচনি সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির উত্থানও বাড়ছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। তাদের মতে নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণের ঝুঁকিও রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে ভোটদানে সময় মতো উপস্থিত হবেন কিনা তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। ভোটদান করে তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নজিরবিহীন অবনতি মানুষকে আস্থাহীন করে তুলেছে। এরা মাঝে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার কথা বলছে ‘অধিকার’সহ বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন। এমন বাস্তবতায় সরকার ও ভোটে অংশগ্রহণকারী দলগুলো ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে কতটুকু টানতে পারে তা এখন বড় বিষয়।