Published : 21 Oct 2025, 06:19 PM
ব্যক্তি যেমন ভাল বা মন্দ হতে পারে, একটি রাষ্ট্রও তেমন হতে পারে। উন্নত, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র ছাড়াও হতে পারে একনায়কতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক, সন্ত্রাসী বা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সংস্কৃতিবিদ্বেষী বা সংস্কৃতিবান্ধব, জাতিবিদ্বেষী বা বহু জাতির মিলনকেন্দ্র, এমনকি ব্যর্থ বা সফল। রাষ্ট্রগুলো নিয়ে কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক ও অনেকক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক নানারকম মূল্যায়ন বিশ্বব্যাপী প্রচলিত আছে। এসব মূল্যায়ন একেকজন একেকভাবে করে থাকে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের মত করে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকা করে থাকে। অনেকে আবার যুক্তরাষ্ট্রকেই সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসের মদতদাতা বলে মনে করে। আবার অনেকক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কিছু মূল্যায়নও আছে।
এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র ও তার কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যেসব মূল্যায়ন আছে তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পারফরম্যান্স। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত জিডিপি বা মোট জাতীয় উৎপাদন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই সূচক দেশে দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু একটি দেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণ পরিমাপে এর ব্যর্থতা ক্রমে পরিস্ফুট হতে থাকে। ১৯৯০ সালে পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক জাতিসংঘে মানব উন্নয়নের ধারণা প্রবর্তন করেন যা তার বন্ধু অমর্ত্য সেনের উন্নয়নে মানবসক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারণার প্রতিফলন ঘটায়। এই সূচকে পণ্য ও সেবার বাজারমূল্যের পরিবর্তে ব্যক্তি মানুষের প্রকৃত উন্নয়নকে কেন্দ্রীয় বলে বিবেচনা করা হয়। এই সূচক থেকে কোনো দেশের মানুষের প্রকৃত অবস্থা জিডিপির চেয়ে ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়।
আবার সুখ নিয়েও একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। একসময় ব্যক্তিগত সুখ লাভকেই মানুষের পরম আরাধ্য মনে করা হতো। এ নিয়ে এখন সমালোচনা আছে। কেননা মানুষ ব্যক্তিমাত্র নয়, সে পারিবারিক, সামাজিক, নাগরিক ও বৈশ্বিক সত্তাও। অতএব অনেক মানুষ স্বেচ্ছায় সংগ্রামী জীবন ও দুঃখকষ্টকে বরণ করে পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের কল্যাণের স্বার্থে। অনেকে নৈতিক জীবনযাপন করার লক্ষ্যেও দুঃখকষ্টকে বরণ করে নেয়। বৃহত্তর অর্থে এসবের মাঝেও সুখ বিদ্যমান। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৫-এর মূল বিষয় তাই অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও সুখদুঃখ ভাগাভাগি (কেয়ারিং অ্যন্ড শেয়ারিং)। সুখ প্রতিবেদনে দেখা হয়েছে একটি দেশের মানুষ কতটা খাবার ভাগাভাগি করে খায়, একজন আরেকজনকে কতখানি বিশ্বাস করে, মানুষ বিপদে কতখানি অন্যের ওপর নির্ভর করতে পারে ইত্যাদি। একটি রাষ্ট্রের সার্বিক বিকাশের জন্য এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও ২০১৪ সাল থেকে সাইমন আনহোল্টের উদ্যোগে বিশ্বের ভাল দেশগুলোর একটি র্যাংকিং প্রকাশ করা হয়। এই তালিকার উদ্দেশ্য অন্যগুলো থেকে ভিন্ন। গুড কান্ট্রি ইনডেক্সের উদ্দেশ্য কোনো দেশ আন্তর্জাতিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখছে তা মূল্যায়ন করা। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, বৈশ্বিক শৃঙ্খলা, গ্রহ ও জলবায়ু, সমৃদ্ধি ও সমতা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ ইত্যাদিতে দেশগুলোর অবদানকে বিবেচনা করা হয়। আনহোল্ট সে সময় তার এক টেড (TED) বক্তৃতায় বলেন, বিশ্বায়ন আমাদেরকে বাধ্য করছে কেবল নিজের নয়, অন্যের কথাও ভাবতে। যদি প্রতিটি দেশ প্রতিবেশীসহ অন্য দেশের মানুষের স্বার্থের কথা না ভাবে তবে প্রজাতি হিসেবে মানুষ টিকতে পারবে না। তিনি বলেন, মানুষ সেই দেশকে পছন্দ করে যে দেশ ভালো, সেই দেশ নয় যা শক্তিশালী কিংবা ধনী। কোন দেশ ভালো? যে দেশ বিশ্বমানবতার কল্যাণ করে। সেই ভালো দেশগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসার পাত্র, ফলে তারা ব্যাবসাবাণিজ্যেও অগ্রসর থাকে। ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী এসব ভালো দেশের মধ্যে শীর্ষে আছে ফিনল্যান্ড, সুইডেন, জার্মানি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স ইত্যাদি। বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম।
এমন নয় যে, এসব আন্তর্জাতিক র্যাংকিং আমাদের সবাইকে মানতে বা স্বীকার করতে হবে। তবে এগুলো যে একটা সাধারণ ধারণা দেয় তা সত্য। লক্ষণীয়, সুখি দেশের তালিকায় ইসরায়েলের অবস্থান অষ্টম হলেও ভালত্বের সূচকে ইসরায়েলের অবস্থান ৬৪তম। অন্যদিকে সুখি দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ২৪তম হলেও ভালত্বের সূচকে ৫০তম। সুখি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ১৩৪তম অবস্থানে। আবার ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস প্রতিবেদনে অপরিচিত লোককে সহযোগিতা করার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ওপরে। এছাড়া ভালো দেশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায়ও বাংলাদেশ এগিয়ে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মিয়ানমার অনেক পিছিয়ে। ভালত্বের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যান্য দিক থেকে খুবই পিছিয়ে যা তার সার্বিক অবস্থানকে পিছিয়ে দেয়। সুখি দেশের তালিকায়ও একই কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে।
স্পষ্টতই এসব সূচককে বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে। এইসব সূচকে কোনো দেশের অবস্থান বৈশ্বিক মর্যাদা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বিবেচনা করার বিষয় আমাদের দেশ কোথায় কোথায় ও কী কী কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে। লক্ষণীয় যে, বিশ্ব যখন মানব উন্নয়ন সূচকের দিকে মনোযোগ দিয়েছে আমরা তখন থেকে কেবল জিডিপির সূচকে উন্নয়নের মরীচিকার পিছনে ছুটেছি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের পর থেকে দেশ যে উন্নয়নের ঘোড়ায় চড়েছে তা লাগামহীন। একদিকে দালানকোঠা, রাস্তাঘাট, শপিং মলে দেশ ভরে যাচ্ছে, অন্যদিকে নদনদী, বনবনানী, পশুপাখি-মাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। একদিকে স্কুলকলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে শিক্ষার মান ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। এবার এইচএসসিতে যে ফল বিপর্যয় সেটি একটা প্রমাণ। অথচ এই ফল বিপর্যয় নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার কর্ণধারদের কোনো লজ্জা নেই, ছেলেমেয়েদের অকৃতকার্য করানোর মধ্য দিয়ে তারা তাদের কৃতিত্বের বড়াই করছেন। কেউ বলছেন না যে, শিক্ষার্থী প্রায় অর্ধেক ফেল করেছে যার অর্থ শিক্ষাব্যবস্থা ও এর কর্ণধাররা পুরাই ফেল করেছেন। কিন্তু নিজের কিংবা নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকারের সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় জীবনে নেই বললেই চলে।
সামগ্রিকভাবে দেশের মানসসম্পদের একটা ধস নেমেছে। মানুষের জীবনে নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা, হতাশা ইত্যাদি বেড়েছে। মানুষে মানুষে সহমর্মিতা আগের চেয়ে কমে গেছে। বাঙালি সমাজের যে স্বাভাবিক বেশিষ্ট্য পরস্পরের প্রতি আত্মীয়তার বোধ তা ভেঙে পড়ছে। যেভাবে পানি দূষণ, মাটি দূষণ ও শব্দ দূষণ তারচেয়ে বেশি দ্রুততার সঙ্গে ঘটছে মানসদূষণ। তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সমাজের সর্বত্র। লাশ উঠিয়ে পোড়ানো, জোরপূর্বক কোনো লোকশিল্পীর চুলদাড়ি কেটে ফেলা, গাননাটক ও শিল্পসংস্কৃতির প্রতি প্রকাশ্য বিদ্বেষ, পাঠাগারে আক্রমণ ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যায়। এছাড়াও আছে ভিন্নপোশাক, ভিন্ন খ্যাদ্যাভ্যাস কিংবা ভিন্নভাষাভাষী মানুষকে ‘ক্ষুদ্র’ পরিচয়ে চিহ্নিত করে তাদেরকে হাড়েমাংসে তা বুঝিয়ে দেওয়া। এসব কখনো দেশকে কোনো সূচকেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে না।
আমরা নিজেরা কোন পরিচয়ে কত বেশি গর্ব অনুভব করি তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বদরবারে অন্যান্য জাতির মানুষের চোখে আমাদের অবস্থান কী। কবিতায় আছে, ’আপনাকে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।’ আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণাবলিতে আমরা কতখানি সমৃদ্ধ। আমরা কি অন্যকে ‘ক্ষুদ্র’, ‘সংখ্যালঘু’ ইত্যাদি নাম দিয়ে নীচজাতীয় সুখ অনুভব করি, নাকি সব মানুষের সমমর্যাদায় বিশ্বাস করি। আমরা নিজেরা যখন অন্য দেশে অভিবাসী হই, সেখানে আমি একজন ‘ক্ষুদ্র’ বা ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে জীবন যাপন করতে চাই কিনা, না চাইলে নিজ দেশে আমরা অন্যকেও সেই মর্যাদা যা আমি অন্য দেশে নিজের জন্য প্রত্যাশা করি তা দিতে প্রস্তুত কিনা–এসব গুরুত্বপূর্ণ। এইসব সূচক আমাদের সম্পর্কে সেই অন্য লোকদের মূল্যায়ন।
বড় হবার সমস্ত গুণ বাঙালির আছে, কিন্তু তারপরও কেন আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ থেকে একটু উদ্ধৃত করি: ’একে অপরের সঙ্গে সুখদুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অনেক উপায় আছে। সম্ভবত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খাবার ভাগ করে খাওয়া। ... যেসব লোক অন্যের সঙ্গে একত্রে খাবার খায় তারা অন্যদের চেয়ে বেশি সুখি। ... তরুণদের মাঝে ক্রমবর্ধমান একাকীত্ব লক্ষণীয়। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ১৯ শতাংশ তরুণ জানায় সামাজিক নির্ভরতার জন্য তাদের কেউ নেই, যে হার ২০০৬ সাল থেকে ৩৯ শতাংশ বেশি। ... সুখের বিপরীতে থাকে হতাশা, যা কাউকে মাদকাসক্তি বা আত্মহত্যায় ঠেলে দিতে পারে যা ‘হতাশায় মৃত্যু’ বলে পরিচিত। ... হতাশায় মৃত্যু সেইসব দেশে যথেষ্ট কম যেখানে মানুষের মাঝে দানশীলতা, স্বেচ্ছাসেবকের মনোভাব ও অপরিচিত হলেও কাউকে সহযোগিতার চর্চা বিদ্যমান। একটি দেশে হিতৈষিতার পরিমাণ তার রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলে। অসুখি হওয়া থেকেই মূলত জনপ্রিয়তাবাদের জন্ম। কিন্তু জনপ্রিয়তাবাদীরা বামে না ডানে ঝুঁকবে তা বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।’
সমাজে ও রাষ্ট্রে মানুষের ওপর মানুষের বিশ্বাস এক বিরাট সম্পদ। বন ধ্বংস হয়ে গেলে আরেকটা বন তৈরি, নদী ধ্বংস হলে আরেকটা নদী তৈরি, পাহাড় ধ্বংস হলে আরেকটা পাহাড় তৈরি যতখানি কঠিন, সমাজে বিশ্বাসসহ মূল্যবোধগুলো ধ্বংস হলে সেসব পুনরুদ্ধার তারচেয়েও বেশি কঠিন। আমাদের মানসসম্পদ এখন প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়েও দ্রুত গতিতে হারিয়ে যাচ্ছে। তার বিনিময়ে আমরা জাতি হিসেবে ধনী বা শক্তিশালী হতে পারি কিংবা নাও পারি। তবে ভালো দেশ হিসেবে আগামী বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমাদের সাংস্কৃতিক ও মানসসম্পদগুলি সংরক্ষণ ও বিকশিত করার কোনো বিকল্প নেই। তবেই কেবল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, বাণিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে আমাদের যে উন্নতি তা হবে প্রকৃত ও টেকসই।