Published : 01 Feb 2026, 05:34 PM
২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমেরিকা যে কোনো দেশে ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।’
কথাটার আগে-পিছে আরও কথা ছিল, যা এখানে আলোচনার খুব দরকার নেই। মনে করিয়ে দিতে চাই ওই বক্তব্যের বছর দেড়েকের মাথায় অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। এমন বক্তব্যও শোনা গেছে যে এই অভ্যুত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল। যদিও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূচনা, তবু পরে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই স্বীকার করেছেন যে এটি ছিল সুপরিকল্পিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কীভাবে এই আন্দোলনে সহায়তা করেছে—সে বিষয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সেগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।
এরই মধ্যে ওয়াশিংটন পোস্টের একটি খবরের সূত্র ধরে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতায় আনতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। গত পয়লা ডিসেম্বর ঢাকায় কর্মরত কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের এক বৈঠকের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, একসময়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের যোগাযোগ বাড়ানো ও সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। খবরে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের ভোটের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে ভালো ফল’ করতে পারে বলে ধারণা করছেন ঢাকায় দায়িত্বরত মার্কিন কূটনীতিকরা। ভোট ঘিরে তাদের এ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ‘বন্ধুত্বের পথে’ হাঁটতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর দুদিন পরে ২৫ জানুয়ারি বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সুলতান আহমেদ জনসভায় দাবি করেন, ‘বাংলাদেশে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করতে জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্ভর করেই অগ্রসর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।’ যদিও ২৮ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র বাংলাদেশের জনগণের। বাংলাদেশের জনগণ যাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করবেন, আমরা সেই সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত এবং তিনি এর ফলাফল দেখতে আগ্রহী।
এর আগে ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, ‘বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে না। কারচুপি হলে তারা (জামায়াত) ক্ষমতায় আসতে পারে। দলটির ভোটের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ, তাও আবার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায়।’ প্রশ্ন হলো, শ্রিংলা কি এবারের নির্বাচনে কারচুপির সন্দেহ করছেন বা কারচুপি করে জামায়াত ক্ষমতায় আসবে বলে ধারণা করছেন?
এই প্রশ্ন অতীতেও ছিল যে, আমেরিকা বা ভারত চাইলেই কি বাংলাদেশে সরকার ফেলে দিতে পারে বা তাদের পছন্দ মতো কাউকে সরকারে বসাতে পারে? ভারতের প্রসঙ্গে আমরা ২০২২ সালের ১৯ অগাস্টে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের একটি বক্তব্য মনে করতে পারি। চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, আমি ভারত সরকারকে সেটা করার অনুরোধ করেছি।’ তার এই বক্তব্যের অর্থ কি এই যে, বাংলাদেশের নির্বাচনে কারা জিতবে, সেটি ভারত নির্ধারণ করে?
ভারত পারে কি পারে না, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও আমেরিকা যে এটা পারে, অন্তত আমেরিকার চেয়ে শক্তিতে দুর্বল এবং কৌশলগত কারণে আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষাকৃত ছোট দেশের সরকার যে আমেরিকা চাইলেই ফেলে দিতে পারে, তার সবশেষ উদাহরণ ভেনেজুয়েলা। জানুয়ারি মাসের শুরুতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মধ্যরাতে বোমা হামলা ও বিশেষ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে তুলে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। ডনাল্ড ট্রাম্প একে ‘অসাধারণ’ সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন।
তার মানে শুধু আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে বা মেটিক্যুলাস ডিজাইনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটানো নয়, বরং খোদ সেই দেশে গিয়ে প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে এসেছে আমেরিকা। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি শুধু একটি বিরল ঘটনাই নয়, বরং আমেরিকার শক্তিমত্তা, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বেপরোয়া মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চাইলেন যে, তিনি সব পারেন।
সুতরাং যে দেশ আরেকটি দেশের সরকার প্রধানকে তুলে নিয়ে আসতে পারে, তারা আরেকটি দেশে নিজেদের পছন্দের দল ও ব্যক্তিকে যে ক্ষমতায় বসাতেও পারে, তাতে হয়তো আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। যদি তাই হয়, তাহলে সেই দেশের মানুষের ভূমিকা কী? বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের নাগরিকরা তার নিজের দেশের রাজনীতি ও সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে কি কোনো ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রাখে না? এখানে কে সরকারে থাকবে আর কে উৎখাত হবে, সেটি বিদেশি শক্তিগুলো নির্ধারণ করবে? তাহলে সংবিধান যে বলছে, ‘রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’—এই কথার কী অর্থ হয়? আমেরিকা-ভারত-চীনই যদি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঠিক করে, তাহলে এই দেশের জনগণ কী করবে?
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিদেশিদের প্রভাব ও হস্তক্ষেপ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে দেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা ইত্যাদি ইস্যুতে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা নানা সময়ে মন্তব্য করেন বা তাদের মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রসমূহ যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ কী বলছে—সেগুলোকে নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক দলের তরফেও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিরুদ্ধে বিদেশিদের সঙ্গে আঁতাত করে বা মুচলেকা দিয়ে ক্ষমতায় আসার অভিযোগ ওঠে। অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের তরফে অভিযোগ করা হয় যে, বিরোধী দল বিদেশিদের সহায়তায় সরকার ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। অনেক সময়ই দেখা যায় যে বিভিন্ন দলের নেতারা বিদেশি কূটনীতিকদের বাসায় যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, আরেকটি দেশ চাইলেই বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়ে যায় বা সেই দেশের পছন্দের দল ও ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে পারে? তাহলে আর নির্বাচনে কী দরকার?
বাস্তবতা হলো, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া আর বাংলাদেশে জামায়াত বা অন্য কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানো এক কথা নয়। দুটি দুই ধরনের অ্যাকশন। প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যাওয়া ডাইরেক্ট অ্যাকশন বা এটা সরাসরি আক্রমণ। যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার মতো। কিন্তু কোনো দেশের সরকার ফেলে দেওয়া বা পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসানো ইনডিরেক্ট বা পরোক্ষ অ্যাকশন। এর জন্য নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করা হয়। যেমন পছন্দের দলের নির্বাচনি খরচ জোগানো; সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানিপুলেট করা; সমাজের একটি বড় অংশের মানুষের মনোজগতে পরিবর্তনে সোশ্যাল মিডিয়া কাজে লাগানো; বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনকে অর্থ দিয়ে ওই দলের পক্ষে গোপনে বা সরাসরি কাজ করানো ইত্যাদি। একই সঙ্গে যে দলকে তারা ক্ষমতায় দেখতে চায় না তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে নানা খাতে অর্থায়নও একটা বড় হাতিয়ার।
জামায়াতকে ক্ষমতায় আনতে চাইলে আমেরিকাকে এর কোনো না কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। কেননা, সরাসরি আমেরিকা থেকে লোক এসে জামায়াতকে ভোট দেবে না। তবে আদৌ তারা বাংলাদেশে জামায়াতের মতো একটি ধর্মীয় দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় কি না—সেটি নিশ্চিত নয়। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই তার স্বার্থ আছে যেসব দেশে, সেসব দেশের সক্রিয় সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেই বৈঠক করে। যোগাযোগ রাখে। এমনকি তুলনামূলক অনেক ছোট দলের নেতাদের সঙ্গেও মার্কিন কূটনীতিকরা বৈঠক করেন। এর মধ্য দিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে চান। সেইসঙ্গে তাদের নিজস্ব এজেন্ডার বিষয়ে দলগুলোর অবস্থান বুঝতে চান। কোন দল তাদের ব্যবসায়িক এজেন্ডা এবং ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করবে, সেটি বোঝার চেষ্টা করেন। কখনো তারা বিশেষ কোনো দলকে টার্গেট করে কৌশল ঠিক করেন। অর্থাৎ কোনো একটি দলকে ক্ষমতায় আনা বা কোনো দলকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেওয়ার কাজটি করতে হয় অনেকগুলোর জটিল অঙ্কের মধ্য দিয়ে। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, বরং এই কাজে তারা প্রধানত কাজে লাগায় দেশের গোয়েন্দা বাহিনীর একটি অংশকে। যারাই মূলত মাঠ পর্যায়ের কাজগুলো বাস্তবায়ন করে।
যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের তৎপরতা বেশি চালায় এমন সব দেশে, যেসব দেশ চীনের প্রভাব আছে। মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার নীতি ও কৌশল নির্ধারিত হয় চীনকে প্রতিহত করার বিষয়টি মাথায় রেখে। কেননা চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা আছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ তথা বাজারে তার নিয়ন্ত্রণও বড় চিন্তার বিষয়। উপরন্তু খনিজসম্পদে পূর্ণ কোনো দুর্বল দেশকে যুক্তরাষ্ট্র টার্গেট করে মূলত লুটপাটের জন্য। অর্থাৎ ওইসব দেশে যাতে কখনো দেশপ্রেমিক লোক সরকার প্রধান হতে না পারে, সে বিষয়ে তারা সতর্ক থাকে। কেননা দেশপ্রেমিক সরকারগুলো খনিজসম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করে। কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চায় ওইসব খনিজসম্পদের ওপর তার দেশের কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। অর্থাৎ এসব দেশের সম্পদই আমেরিকার টার্গেটে পরিণত হওয়ার মূল কারণ।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ওইসব দেশের ওপর মানবাধিকার, নির্বাচন, গণতন্ত্র ইত্যাদি ইস্যুতে চাপ প্রয়োগ করে। সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন এনজিওকে এই ইস্যুতে জনমত গড়ে তুলতে আর্থিক সহযোগিতা দেয়। আর এই সহযোগিতা আসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশকে চাপে রাখতে চায় বা তার অপছন্দের লোককে হটিয়ে পছন্দের কাউকে ক্ষমতায় বসাতে চায় সেজন্য ওই দেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওই দেশের পণ্যের ওপর অধিক হারে শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপও গ্রহণ করে। বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে অনেক প্রশ্নের উত্তর সহজ হবে।