Published : 24 Jan 2026, 09:30 PM
তারেক রহমান সিলেটে যেদিন প্রথম নির্বাচনি জনসভায় জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বললেন যে, তারা বেহেশতের টিকেট বিক্রি করে শিরক করছে—তার পরদিনই খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় নির্বাচনি সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু দেখি যে উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। এটা বলার তার কোনো অধিকার নেই। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সৌজন্যতা, শিষ্টাচারবোধের জায়গা থেকেও এই কথা বলা যায় না।’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে ধর্ম বরাবরই বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে ভোটের মাঠে। অধিকাংশ দলই মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভোট বাড়াতে চায়। যে কারণে এই সময়ে নেতা ও প্রার্থীদের পোশাকেও পরিবর্তন আসে। অনেক পুরুষ প্রার্থী মাথায় টুপি পরেন। নারীরা হিজাব। বলা হয়, নেতাদের মাথায় যখন টুপি বেড়ে যায়, তখন বুঝতে হয় যে ভোট এসে গেছে। তারা এই লেবাসের মধ্য দিয়ে জনগণকে বোঝাতে চান যে, তারা ইসলামের সেবক। তারা প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় এলে তারা কোরান সুন্নাহর আলোকে দেশ পরিচালনা করবেন।
এবারের নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগে থেকেই জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে যে, তারা মূলত নারী ভোটারদের টার্গেট করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদেরকে বেহেশতের লোভ দেখিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চাচ্ছে। এই কাজে প্রধানত ব্যবহার করা হচ্ছে জামায়াতের নারী কর্মীদের।
প্রতিটি দলের এবং প্রার্থীর ভিন্ন ভিন্ন নির্বাচনি কৌশল থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ যদি ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে, সেটি অপরাধ। অনৈতিক। যদিও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দাবি, তাদের দল বেহেশতের লোভ দেখিয়ে কারো কাছে ভোট চাচ্ছে না। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিনে সিলেট অঞ্চলের একাধিক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘বেহেশত-দোজখের মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেব, ওই দেব বলছে।’ এরপর তারেক রহমান সমবেতদের জিজ্ঞেস করেন, ‘টিকিট দেব বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না, সেটার কথা যদি সে বলে, শিরক করা হচ্ছে। হচ্ছে না? কাজেই আগেই তো আপনাদেরকে ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকাবে আপনাদেরকে—বোঝেন এবার।’
এদিন সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে তারেক রহমান ভোটারদের প্রতি এ আহ্বান জানান, তারা যেন ১২ ফেব্রুয়ারি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে বাসা বের থেকে হন এবং ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যান। তারেক রহমান বলেন, ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে জামায়াতে ফজরের নামাজ পড়ে তারপর ৭টায় গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে। মনে রাখতে হবে—এবারের ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রশ্ন হলো, তিনি কেন ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়েই ভোটের লাইনে দাঁড়াতে বললেন? বিগত দিনে এই দেশে রাতে ভোট হয়েছে—এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেজন্য? তারেক রহমান যেদিন এই বক্তব্য দিলেন, সেদিনই বিএনপির সিনিয়র নেতা এবং ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবারের নির্বাচনে প্রশাসনিক ক্যু বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জামায়াত ও এনসিপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সরকার দুটি দলকে জেতানোর জন্য প্রশাসনকে ব্যবহারের ষড়যন্ত্র করছে। এ অবস্থায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র তথা প্রতিটি বুথে সতর্ক পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ভোটকেন্দ্র পাহারা দিতে মির্জা আব্বাসের আহ্বান এবং তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য তারেক রহমানের পরামর্শের মধ্যে মিল রয়েছে। উভয়ের কথার মধ্যে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, তাদের এই আশঙ্কার বাস্তবতা কতটুকু? নাকি এটা বিএনপির দুর্বলতাজনিত ভয়ের বহিঃপ্রকাশ?
তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে হতে যাওয়া এবারের নির্বাচনে সত্যিই প্রশাসনিক ক্যু বা কোনো মেটিক্যুলাস প্ল্যান আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও এবারের নির্বাচনে ধর্ম যে একটা বড় ফ্যাক্টর তাতে সন্দেহ নেই।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের অনুভূতি কাজে লাগানোর জন্য এবার শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল যে, ইসলামপন্থি সব দলের ভোট এবার একটি বাক্সে পড়বে। সেই লক্ষ্যে ১১ দলীয় জোটও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বেরিয়ে গেলে ইসলামপন্থিদের এই জোট বড় ধরনের ধাক্কা খায়। উপরন্তু জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জোটবদ্ধ হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। ফলে ইসলামপন্থি সকল দলের ভোট একটি বাক্সে পড়ার সুযোগ নেই। বিএনপি হয়তো এর সুবিধা নেবে।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পর থেকেই ১৯৭১ ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন বয়ান সামনে আনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে ইসলামিকরণ; নারীদের খেলা ও গানের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া; বাউলদের ওপর আক্রমণ; মাজারে ভাঙচুর ও আগুন এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ভাঙার মতো ঘটনার পেছনে যে কোনো না কোনো ইসলামিক দল ও গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সমর্থন আছে, সেটি স্পষ্ট। এসব ঘটনায় ইসলামপন্থিদের ভোট বেড়েছে না কমেছে তা বলা কঠিন। আবার দেশের কম শিক্ষিত, অসেচতন ও প্রান্তিক মানুষদের অনেকে হয়তো এসব ঘটনায় খুশি। কিন্তু সেই সংখ্যাটা কত তা নিশ্চিত নয়।
একটু পেছনে ফেরা যাক। উনিশশো সাতচল্লিশে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার ২৩ বছর পরে সেই ধর্মের দোহাই দিয়ে এই বাংলার লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে এই যুদ্ধকে ‘ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব’ এবং এই মুক্তিসংগ্রামকে ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মুসলমানদের বিভক্ত করার দোহাই দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বলা হয়েছে ‘ভারতের চর’। মুক্তিযুদ্ধের এই বয়ান বিগত ৫৪ বছর ধরে দিয়েছে যে দলটি, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে তারা নতুন করে সেই বয়ান সামনে এনেছে। এখন তাদের বিরুদ্ধেই নির্বাচনে ধর্মকে কার্ড হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা নির্বাচনে ধর্মের কার্ড ব্যবহার করছে না। শুক্রবার পঞ্চগড়ে জামায়াতের সমাবেশে একজন জামায়াত নেতা বলেন, ‘একাত্তরের পুরোনো ভাঙ্গা ঢোল বাজাবার চেষ্টা করছেন। আমরা বলতে চাই না ৭১ সালে আপনার বাবার ভূমিকা কী ছিল?’ তিনি এখানে ‘আপনার বাবা’ বলতে কি তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমানকে ইঙ্গিত করলেন? মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের কী ভূমিকা ছিল, তা জামায়াতের নেতারা জানেন না?
অবশ্য ১৯৭১ সালে ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার আগেই এই দেশের মানুষ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কালজয়ী উপন্যাস ‘লালসালু’ (১৯৪৮) পড়েছে—যার কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদ ধর্মকে পুঁজি করে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। মহব্বতনগর গ্রামে অচেনা একটি পরিত্যক্ত কবরকে ‘মোদাচ্ছের পীরের মাজার’ বলে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে, লাল কাপড় (লালসালু) দিয়ে ঢেকে নিজের স্বার্থসিদ্ধি ও জীবিকা নির্বাহ করতেন মজিদ। এই ধুরন্ধর ও স্বার্থান্বেষী লোক গ্রামের অশিক্ষিত ও সহজ-সরল মানুষকে পরকালের ভয় দেখিয়ে ধর্মের নামে মানুষকে প্রতারিত করতেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যে সময়ের কথা লিখেছেন, তারপরে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষের শিক্ষার হার বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ এখন সারা পৃথিবীর খবর জানে। মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছে। কিন্তু সমাজে মজিদদের দৌরাত্ম্য কমেনি। বাংলাদেশের সমাজ থেকে মজিদ প্রবণতা দূর হয়নি। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেও ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধত্ব বেড়েছে—যার পালে হাওয়া দিচ্ছে রাজনীতি। অর্থাৎ লালসালুর মজিদ যুগের অবসান হলেও কার্যত আমরা এখনও মজিদ যুগেই আছি। অশিক্ষা-কুশিক্ষা-ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ছিল যে রাজনীতিবিদদের—তারাই এখন মজিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।