Published : 07 Jun 2026, 09:38 PM
পরিবারের স্বচ্ছলতা আর সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে হাজার মাইল দূরের লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শফিকুল ইসলাম। স্বপ্ন ছিল নিজের ঘরটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার আর মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে স্বাবলম্বী করার।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না শফিকুলের। রোববার সকালে উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন তিনি। তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দি নিথর দেহ হয়ে।
কফিন দেখে স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠে পুরো এলাকা। উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের মধ্যে ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় ড্রোন হামলায় নিহত হন শফিকুল ইসলাম (৪০)। একই দিন ড্রোন হামলায় নিহত হন আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলামও (২০)।
প্রায় এক মাস পর শনিবার গভীর রাতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় তাদের মরদেহ দেশে আনা হয়। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। রোববার ভোরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে তাদের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মরদেহ দুটি বহনকারী কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটটি শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে বৈরুত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে আসে। এরপর দোহা থেকে আরেকটি ফ্লাইটে শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ঢাকায় এসে পৌঁছায়।
শফিকুল ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলী এবং আজেয়া খাতুনের সন্তান। আর নাহিদুল আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি ইউনিয়নের মো. আব্দুল কাদের ও নূরনাহার খাতুনের ছেলে। উভয়েই দীর্ঘদিন ধরে লেবাননে কর্মরত ছিলেন।

দুপুরে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কফিনের পাশে বসে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন তার স্ত্রী রুমা খাতুন।
স্বামীর ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিদেশ যাওয়ার আগে বলেছিল, আর কষ্ট করতে হবে না, মেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াবে। প্রতিদিন ফোন করে মেয়েদের খোঁজ নিত। আজ সেই মানুষটা কাঠের বাক্সে করে ফিরে এসেছে। আমি এখন মেয়েদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব?”
বড় মেয়ে মৌ আক্তার বাবার কফিনের দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলে, “বাবা সব সময় বলতেন, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব। পরীক্ষার ফল ভালো হলে খুব খুশি হতেন। এখন আমার ফলাফল দেখার জন্য বাবা আর নেই। বাবাকে ছাড়া আমরা কীভাবে থাকব?”
ছোট মেয়েটিও বাবার জন্য কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও সে বারবার বাবাকে একবার দেখার আকুতি জানাতে থাকে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “শফিকুল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের উচিত পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান বলেন, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে দাফন-কাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে তিন লাখ টাকা এবং জীবনবিমা বাবদ ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
জোহরের নামাজ শেষে নিজ নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের দাফন সম্পন্ন হয়।
ঋণ করে লেবাননে শফিকুল-নাহিদুল, ইসরায়েলি ড্রোনে ‘স্বপ্ন’ শেষ
লেবাননে ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার আরেক যুবক নিহত, মৃত্যু বেড়ে ৩